Sunday, February 17, 2013

ভাষা তাদের, সিন্ধান্তও তাদের : হায়রে বাঙ্গালী মাতৃভাষার গুরুত্বই যদি বুঝিস, তাহলে আরেকজনের মাতৃভাষা নিয়ে কেন এমন খেলিস…?



আমাদের পূর্ব পুরুষরা ১৯৫২ সালে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার জন্য আন্দোলন করেছেন। তাঁরা চেয়েছেন আমরা যেন বাংলায় সহজে নিজের মনোভাব কে প্রকাশ করতে পারি। আর সেই জন্যই এই বাংলা ভাষাটা কে আমাদের মুখের ভাষাতে পরিণত করার জন্য পাকিস্তানিদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন।
আমার জানামতে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যারা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। অন্য কোন দেশে ভাষার জন্য এরকম ঘটনা ঘটেছে আমি জানি না। তাহলে কি দাঁড়াল…? বাংলাদেশ জানে মাতৃভাষার গুরুত্ব কতখানি। আর আজ সেই দেশেই আরেকটি জাতির ভাষা নিয়ে মেতে উঠেছে বাঙালি। একজন বলে এটা তাদের বর্ণমালা, তো আরেকজন বলে ওটা তাদের বর্ণমালা। হায়রে বাঙ্গালী মাতৃভাষার গুরুত্বই যদি বুঝিস, তাহলে আরেকজনের মাতৃভাষা নিয়ে কেন এমন খেলিস…?


শুনলাম পাভেল পার্থ নামের এক লেখক সান্তালী ভাষা নিয়ে এক জনমত প্রকাশ করেছেন। এবং এটাও শুনলাম তিনি তার লেখাকে একটু তথ্যনির্ভর করে গড়ে তোলার জন্য কিছু মনগড়া তথ্য উল্লেখ করেছেন তার লেখায়। তার লেখাটি নিন্মরুপঃ

 
কোনো জাতির ভাষা কি বর্ণমালা সেই জাতির ধারাবাহিক বিকাশ ও বিরাজমানতার সঙ্গেই জড়িত। বাংলাদেশে আদিবাসী সমাজে মাতৃভাষার চর্চা থাকলেও অধিকাংশ ভাষার নিজস্ব লিপি না থাকায় অনেকেই বাংলা হরফ ব্যবহার করেই ভাষাচর্চা চালিয়ে আসছেন। চাকমা, মারমা, রাখাইন, ত্রিপুরা, মৈতৈ মণিপুরিরা নিজস্ব বর্ণমালায় নিজেদের ভেতর কিছুটা মাতৃভাষার চর্চা করেন। মান্দিদের আচিক ভাষার প্রায় পাঁচ ধরনের ‘আচিক থোকবিরিম (বর্ণমালা)’ প্রস্তাবিত হলেও তা চালু নয়। লেঙ্গাম ভাষার একটি বর্ণমালাও তৈরি করেছেন নেত্রকোনার কলমাকান্দার সুরেশ নংমিন। মেনলে ম্রো উদ্ভাবিত বর্ণমালা দিয়ে ম্রো আদিবাসীদের ক্রামা ধর্মাবলম্বীরা কিছুটা চর্চা করছেন। খাসি, বম, লুসাই, মাহালি, মান্দিদের ভেতর রোমান হরফে নিজস্ব ভাষায় খ্রিষ্টধর্মের কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে সম্পূর্ণ চাকমা ভাষা ও বর্ণমালায় প্রকাশিত হয় দেবাশীষ চাকমার উপন্যাস ফেবো। রাজশাহীতে শুরু হয় সাঁওতালি ভাষার প্রথম বেসরকারি বিদ্যালয়। ভারতে সাঁওতালি ভাষা ও অলচিকি বর্ণমালার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিললেও বাংলাদেশে এখনো আদিবাসী জনগণের সাংবিধানিক স্বীকৃতিই মেলেনি। সাঁওতালি ভাষা কোন্ লিপি বা হরফে লেখা হবে, তা নিয়ে বাংলাদেশে আবারও বিচ্ছিন্ন কিছু প্রশ্ন উঠেছে। অলচিকি, রোমান না বাংলা? বাংলাদিশোম সান্তাল বাইসি, আদিবাসী মুক্তি মোর্চা, সান্তাল ল্যাংগুয়েজ ডেভেলপমেন্ট কমিটি ও মাহালে ল্যাংগুয়েজ ডেভেলপমেন্ট কমিটি সম্প্রতি রাজশাহী ও দিনাজপুরে কর্মশালা ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রোমান হরফে সাঁওতালি ভাষার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবি তুলেছে (সূত্র: প্রথম আলো, ২৩.১২.২০১২)। বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত সাঁওতাল সম্প্রদায় সাঁওতালি ভাষা রোমান হরফে লেখার পক্ষে নয়।
পণ্ডিত রঘুনাথ মুরমু কেবল অলচিকি আবিষ্কার নয়, সাঁওতালি ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য সূচনা করেন এক সংগ্রামী অধ্যায়। ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আদিবাসী সোসিও-এডুকেশনাল অ্যান্ড কালচারাল অ্যাসোসিয়েন’ বা অ্যাসেকা। ১৯৭০-৭১ সালে রোমান লিপিতে সাঁওতালি ভাষা লেখার রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অ্যাসেকা কলকাতায় হাজার হাজার সাঁওতাল জনগণের মিছিল সংগঠিত করেন। ১৯৭৯ সালে ভারতে সাঁওতালি ভাষার একমাত্র লিপি হিসেবে অলচিকিকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৮০-৯০ দশকে অলচিকি বর্ণমালায় প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক রচনার কাজ শুরু হয়। ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে সাঁওতালি ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি ২০০০ সালের ১ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
বাংলাদেশে যারা রোমান হরফে সাঁওতালি ভাষা লেখার দাবি তুলেছেন, তা নতুন নয়। নিপীড়িতের ভাষা ও বর্ণমালার ওপর অধিপতি ক্ষমতা বারবার যেমন চেপে বসে, এটি তারই সাম্প্রতিক ধারাবাহিকতা। ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে শুরু করে অনেক খ্রিষ্টান মিশনারিদের কাজেও এই বর্ণ-বলপ্রয়োগ দেখতে পাই। রোমান হরফে সাঁওতালি ভাষা লেখার ব্যাকরণ ও উচ্চারণগত জটিলতা এবং সীমাবদ্ধতাও প্রমাণিত হয়েছে। রোমান হরফে সাঁওতালি ভাষার স্বরধ্বনিগুলো ঠিকমতো লেখা যায় না (সূত্র: হেরাল্ড, গোয়া, ভারত, ২২/৯/১২)। সাঁওতালি ভাষার ব্যাকরণে চারটি অবদমিত ধ্বনি আছে। মিশনারি পণ্ডিত রেভারেন্ড স্ক্রেফসরুড ও পি. ও. বোডিং এ ধ্বনিগুলোকে অঘোষ ব্যঞ্জনধ্বনির অবদমিত রূপ মনে করে, এগুলোকে যথাক্রমে রোমান হরফের ‘কে’, ‘সি’, ‘টি’ এবং ‘পি’ চিহ্নের সাহায্যে প্রকাশ করেন। কিন্তু ফাদার হফম্যানের মতে, এই ধ্বনিগুলো ঘোষ ধ্বনির অবদমিত রূপ। তিনি এ ধ্বনিগুলোকে ঘোষ বর্ণ যথাক্রমে স্বর অবদমিত, জ্, দ্, এবং ব্ এর অবদমিত ধ্বনি হিসেবে যথাক্রমে স্বর-অবদমন ‘ডি’, ‘জে’ এবং ‘বি’ চিহ্নের সাহায্যে লেখার প্রস্তাব দেন। মিশনারি পণ্ডিতদের এই বিতর্ক ১৯২৫ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় (সূত্র: রঘুনাথ মুরমু: সাঁওতালি সাহিত্য ও অলচিকি আন্দোলন, ড. শান্তি সিংহ, কলকাতা, ২০০৪, পৃ. ৩৬)। ১৯২৫ সালেই পণ্ডিত রঘুনাথ মুরমু অলচিকি নামে সাঁওতালি বর্ণমালা উদ্ভাবন করে এসব বিতর্ক ও সমস্যার বৈজ্ঞানিক নজির হাজির করেন।
ব্রিটিশ উপনিবেশের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে যে সাঁওতাল জনগণ ১৮৫৫ সালে সংগঠিত করেছেন দুনিয়া কাঁপানো বিদ্রোহ, ১৫৭ বছর পর সেই জনগণের পক্ষে নিজ মাতৃভাষাকে রোমান হরফে লেখা কি সম্ভব? তা ছাড়া সাঁওতালি ভাষা যখন রোমান হরফে লেখা হচ্ছে তখন এটির বেশ কিছু বর্ণের পরিবর্তন ঘটছে। রোমান হরফে সাঁওতালি ভাষা শেখার মানে তাই কোনোভাবেই রোমান লিপি শেখা হয়ে যাচ্ছে না। আজকের করপোরেট দুনিয়ার বাস্তবতায় যদি ইংরেজি কি অন্যান্য ভাষা জানতেই হয়, তবে সেটি সাঁওতাল শিশুদের জন্য রাষ্ট্রই নিশ্চিত করবে। কিন্তু নিজ মাতৃভাষা নিজ ভাষায় বা জনগণের নিজস্ব সিদ্ধান্তে গৃহীত হরফের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি। সামাজিক রূপান্তরের ধারাবাহিকতাই ঠিক করবে কোনো ভাষা কী হরফ কী আদলে টিকে থাকবে। দুনিয়ার সব হরফেরই একটি রাজনৈতিক ইতিহাস আছে। অলচিকি হরফে বাংলাদেশের সাঁওতাল জনগণ অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি, অধিকাংশেরই বর্ণ অভিজ্ঞতা হয়েছে বাংলায়। কৃষক, দিনমজুর থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী কি চাকরিজীবী—সবাই নিজ জাতির বাইরে বাংলা ভাষাতেই নিত্যদিনের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। রপ্ত করেছেন বাংলা বর্ণমালা। বাংলা হরফে সাঁওতালি সাহিত্য চর্চা করছেন অনেকেই। বাংলা ভাষাও কখনো কখনো সাঁওতালি ভাষার ওপর আধিপত্য বিস্তার করলেও নিজ দেশের গরিষ্ঠ ভাগ জনগণের প্রচলিত এই বাংলা বর্ণমালাই চাইছেন অধিকাংশ সাঁওতাল জনগণ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব বাংলা হরফের সঙ্গে সাঁওতাল জনগণের এই ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ও বিকাশমানতা স্বীকৃতি দেওয়া।
স্মরণে রাখা জরুরি, বাংলা ভাষার জন্য কেবল বাঙালি নয়, দেশের আদিবাসী জনগণেরও রক্ত-ঘাম ঝরেছে। সাঁওতালি ভাষার অজস্র শব্দ ও ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজার বছর ধরে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে বাংলা ভাষা। কেবল বাংলা নয়, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার জন্য ১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ শহীদ হয়েছেন সুদেষ্ণা সিংহ। সাঁওতালি ভাষা ও অলচিকি বর্ণমালার সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য ভারতে সংগঠিত হয়েছে দীর্ঘ গণসংগ্রাম। আসন্ন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আগেই আশা করি, সরকার সাঁওতালি ভাষাসহ দেশের সব আদিবাসী জনগণের মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করবে। রোমান বা অন্য কোনো অপরিচিত হরফ নয়, অলচিকি না হলে বাংলা বর্ণমালার মাধ্যমেই নিশ্চিত হোক সাঁওতালি ভাষার ন্যায়বিচার।
প্রকাশিতঃ প্রথম আলো
তারিখ: ০৩-০২-২০১৩
পাভেল পার্থ: গবেষক ও লেখক।
অপরদিকে এই সংবাদ প্রকাশিত হতেই সান্তাল সমাজের কিছু ব্যক্তি কলম নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন। তাদের মধ্যেই একজন পিটার এস সরেন। এই সংবাদের ভিত্তিতে তিনি প্রথম আলো এবং আদিবাসী বাংলা ব্লগে একটি পাঠ পতিক্রিয়া লেখেনঃ
শ্রদ্ধেয়  পাভেল পার্থ,
সুদীর্ঘ প্রায় ১৫০ বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে সান্তালি ভাষা ও সাহিত্য ‘রোমান সান্তালি বর্ণমালায়’ চর্চা করা হয়েছে ও এখনও ব্যাপকভাবে হচ্ছে। এতে কারো কোন সন্দেহ থাকার কোন সুযোগই নেই । ভারতে রাজনৈতিক কারণেই ৱ রোমান সান্তালি বর্ণমালার’ পরিবর্তে অলচিকি দিয়ে ভাষা ও সাহিত্য চর্চা করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে ব্যাপকতা কোনভাবেই তেমন পায়নি ।

ভারতীয় উপমহাদেশের ভারত, বাংলাদেশে, নেপালে মালদ্বীপসহ অন্যান্য দেশে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ড. জে আর লেপসাস কর্তৃক সান্তালি ভাষার জন্য রোমান হরফকে স্টান্ডার্ড ‘রোমান সান্তালি হরফ’ তৈরির পর থেকেই সান্তালি ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে এবং এই বর্ণমালা, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বন্ধনেই তাদের মধ্যে সুদৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। এই রোমান সান্তালি বর্ণমালা এখন শুধু বাংলাদেশি সান্তালদের জন্য নয় বরং আন্তজার্তিকভাবে যোগাযোগেরও মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এই বর্ণমালার মাধ্যমেই সান্তালদের মধ্যে সুপরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী বিবেধ সৃষ্টির প্রয়াস চালানো হচ্ছে। এই জন্যই শুধু বাংলাদেশি সান্তালদের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ নয় বরং বিশ্বের সকল সান্তাল ভাষাভাষিদের মধ্যে একটি যোগাযোগেরও মাধ্যম বটে।
বাংলাদেশে বসবাসরত সান্তাল জাতিসত্ত্বাো ১৯২৫ খ্রিস্টোব্দের পূর্ব থেকে সান্তাল অধ্যুষিত অঞ্চলে মিশনারিদের কর্তৃক রোমান সান্তালি বর্ণমালার চর্চা করা হয়েছে । এখানে সকল স্বার্থান্বেষি মহল রোমান সান্তালি বর্ণমালার টিকে মিশনারি, খ্রিস্টান, ইংরেজি বলে প্রত্যাখানের খোড়া যুক্তি দিয়েই চলেছেন। কিন্তু এখানে বোঝার বিষয়টি হচ্ছে এ রোমান সান্তালি বর্ণমালাটিকে সান্তালি ভাষার জন্য তৈরি করা হয়েছে। এখানে খ্রিস্টান বা অখ্রিস্টান সান্তালদের আলাদা আলাদা কোন ভাষার জন্য তৈরি হয়নি, বরং এ ভাষাই যারা সাহিত্য চর্চা করেছেন তারাই লাভবান হয়েছেন। এখানে সান্তাল ভাষার কথা বলা হয়েছে ধর্মের কথা বলা হয়নি। আর পৃথিবীর কোন বর্ণমালায় ধর্মের কথা বলেনা। তবে, বাংলাদেশে এখন এ বিষয়টিকে এখন কিছু স্বার্থান্বেষী ( আর্থিকভাবে লাভবান হবে অর্থে ) ব্যাক্তি ও উন্নয়ন সংস্থা সান্তালদের শতবর্ষের উর্ধে ব্যবহৃত রোমান সান্তালি বর্ণমালা সরকারি পর্যায়ে নির্ধারনের ক্ষেত্রে চরমভাবে বির্তকিত করে তুলেছে এদের পরিচয় যেন মাননীয় সরকার সঠিকভাবে নথিভূক্ত করেন এটা আমার সবিনয় অনুরোধ। আমরা বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন অঞ্চলের সান্তালদের ভাষা বিষয়ক মিটিং এ সরকারের গৃহিত পদক্ষেপ (সান্তালি ভাষায় সান্তালি প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন) কে স্বাগত জানিয়েছি এবং মতামত ও আলোচনা করেছি যে, বাংলাদেশের কিছু স্বার্থানেষী মহল বাংলায় সান্তালি ভাষায় প্রাথমিক পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে অপতৎপরতাই লিপ্ত রয়েছে এবং জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি বাংলাদেশের সকল সান্তাল জীবন দিয়ে হলেও প্রতিরোধ করবে বলে অঙ্গিকারাবদ্ধ। এ বিষয়ে অনাকাঙ্খিত কোন ঘটনা ঘটলে যেন সেই স্বার্থান্বেষী মহলকেই ধরা হয়। এটা আমার মুখের বলি না বা কাউকে ধমকানো সুরও না এটা বাস্তব মিটিং এর প্রতিফলন। স্বার্থান্বেষী মহল যে সাইন বোর্ডের (জাতীয় আদিবাসী পরিষদ) এর কথা বলছে এটা শুধু জাতীয় আদিবাসী পরিষদ সংশ্লিষ্ট আত্বীয় স্বজন ছাড়া বাংলাদেশে কেউই বাংলা বর্ণমালাকে সান্তালি ভাষার বর্ণমালা হিসেবে গ্রহণ করতেই চায়না।
সম্পাদকীয়তে নিজেকে গবেষক ও লেখক পরিচয় দিয়ে পাভেল পার্থ যে কথা উল্লেখ করেছেন যে “রাজশাহীতে শুরু হয় সাঁওতালি ভাষার প্রথম বেসরকারি বিদ্যালয়।“ এটা সত্য নয় বরং সত্য এটিই যে, এটি ছিল বাংলা বর্ণমালায় সান্তালদের প্রথম বেসরকারি বিদ্যালয়। এপ্রসঙ্গে বিদ্যালয়টির প্রথম শিক্ষক পরি টুডু সাক্ষাৎকারে এস.সি আলবার্ট সরেনকে বলেছিলেন- স্কুল প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িতরা বলতেন যে, -“তোমাদের ভাষার মৃত্যু হয়েছিল এখন জীবিত হয়েছে এইটা দিয়েই চালান, নাই মামার চেয়ে কানা মামাই ভালো’। ঐ স্কুলের প্রথম সেক্রেটারী প্রয়াত বরীন মার্ডি আমাকে জানিয়েছিলিন যে, ‘তারা বলছেন (প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গ) সান্তালি হরফ এখন পাওয়া যাচ্ছে না, পাওয়ার চেষ্টা চলছে, পাওয়া গেলেই আমরা ঐ হরফ দিয়ে শুরু করব, আপাতত এই হরফ দিয়েই চলুক।‘
এই হলো স্বার্থান্বেষী মহলদের নাম কাওয়াস্তে সান্তালদের বর্ণমালা বিষয়ে শ্রদ্ধা ও পাঠ্যপুস্তক বিষয়ে শক্ত যুক্তি।
ভারতে সাঁওতালি ভাষা ও অলচিকি বর্ণমালার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিললেও বাংলাদেশে এখনো আদিবাসী জনগণের সাংবিধানিক স্বীকৃতিই মেলেনি। এজন্যই ভারতীয় উপমহাদেশিয় সান্তালদের মধ্যে ব্যাপক শতবর্ষের উর্ধ্বে ব্যাপক প্রচলিত ও জনপ্রিয় রোমান সান্তালি বর্ণমালা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন।
নিজেকে গবেষক ও লেখক পরিচয় দিয়ে পাভেল পার্থ উল্লেখ করেছেন- বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত সাঁওতাল সম্প্রদায় সাঁওতালি ভাষা রোমান হরফে লেখার পক্ষে নয়। বরং এটি হবে সাইন বোর্ড (জাতীয় আদিবাসী পরিষদ) সংশ্লিষ্ট আত্বীয় স্বজনদের বাংলা বর্ণমালা সান্তালদের বর্ণমালা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা মাত্র। কারণ সাইন বোর্ডের অধিনেই স্বার্থান্বেষী মহল কাজ করে চলেছেন। গবেষক মাঠের অবস্থা জানেন না।
ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়ার পর উপমহাদেশের সকল মানুষ, দেশ ও রাজনৈতিক মহলের মধ্যে ব্রিটিশ বিরোধি চেতনা গড়ে উঠে এবং ধিরে ধিরে ব্রিটিশদের প্রত্যাখান করার চেষ্টাও চলতে থাকে। এরই সূত্র ধরে খ্রিস্টান খ্রিস্টান রব তুলে খ্রিস্টান তৈরি অনেক কিছু (সংগঠন, কাঠামো, দ্রব্যাদি) ত্যাগ করা হয়। সান্তাল প্রেমি
পণ্ডিত রঘুনাথ মুরমু অলচিকি আবিষ্কার করেন। দেখুন রোমান সান্তালি বর্ণমালা আবিস্কার ও ব্যবহার শুরু হয়েছে ১৮৬৩ সালে এবং ১৯৭০-৭১ সালে রোমান লিপিতে সাঁওতালি ভাষা লেখার রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে অ্যাসেকা কলকাতায় হাজার হাজার সাঁওতাল জনগণের মিছিল সংগঠিত করেন। ১৯৭৯ সালে ভারতে সাঁওতালি ভাষার একমাত্র লিপি হিসেবে অলচিকিকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ‌‘অলচিকি’ শুধু ভারতীয় রাষ্ট্রের স্বীকৃত এবং তাদের মত করে তৈরি। শত বর্ষের শিক্ষা দলিল দস্তাবেজ প্রচলন এখন নষ্ট ধ্বংস করলে জাতি কতটা পিছিয়ে যাবে এটুকু উপলব্ধি যদি আপনার থাকে তবে, আপনি যে সব কথা উল্লেখ করেছেন তা নিয়ে একান্তে বসে চিন্তা করবেন এবং অন্য জাতিকে নির্দেশনা দেয়ার কথা ভাববেন।
আচ্ছা, সান্তালদের ভাষা ও বর্ণমালার বিষয়ে আপনার মাথা ব্যথার কারণ কি!!! আপনি কি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় চাকুরি করেন না ভাষা বিষয়ক পণ্ডিত‍!!!???…
ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে সাঁওতালি ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি ২০০০ সালের ১ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। বাংলাদেশেও অচিরেই এটি শুরু হোক এটা আমরা চাই। আমরাও ভোটের রাজনীতি শুরু করব। সাইন বোর্ডের আন্ডারে কেউ সফল হতে পারবে না।
একজন নরয়েজিয়ান সান্তালি ভাষার জন্য সান্তাল বর্ণ তৈরি করেছেন ব্রিটিশদের ও মিশনারিদের উপনিবেশ বার বার টেনে আনেন কেন? ভাষার ধ্বণিতে ব্যাকরণগত কোন সীমাবদ্ধতা থাকলে এটি আর আমাদের কাছে সীমাবদ্ধ নয়। এটা আমরা নিজেরাই সমাধান করতে পারি। সে রকম প্রযুক্তিও আমাদের রয়েছে।
গবেষক আপনি যে বলেছেন- “ব্রিটিশ উপনিবেশের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে যে সাঁওতাল জনগণ ১৮৫৫ সালে সংগঠিত করেছেন দুনিয়া কাঁপানো বিদ্রোহ, ১৫৭ বছর পর সেই জনগণের পক্ষে নিজ মাতৃভাষাকে রোমান হরফে লেখা কি সম্ভব?” পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি নিয়েই পৃথিবী চলছে। আপনি কোন দেশ বা জাতির কথা কখনই বিবেকবান লোক হিসেবে বলতে পারেন না। আপনার এ লেখা যারা পড়েছেন তারা আপনার জ্ঞানের গভীরতা সহজেই বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। এখানে ব্রিটিশ উপনিবেশ ও সান্তালদের গর্বের সান্তাল বিদ্রোহ করা মানেই আপনি আমাদের অর্থাৎ সান্তালদের অপমান করেছেন। এবং বুঝাতে চাচ্ছেন ব্রিটিশ বলেই তাদের তৈরি জিনিস ছাড়তে হবে এবং রোমান সান্তাল বর্ণমালার পরিবর্তে বাংলা নিতে হবে। আপনার জ্ঞানের গভীরতা নিয়ে তারিফ করতে হয়…..।
আমি বা বাংলাদেশের সান্তাল জনগণ কোন লিপি বা বর্ণমালায় পড়াশুনা করব আপনি ভাববার আশে পাশের কেউই না। হতে পারেন কোন বেসরকারি সংস্থার চাকুরিজীবি। আপনার লেখার ধরন দেখে এটি পরিস্কারাই বুঝা যায়। আপনার জেনে রাখা দরকার বিশ্বের মুসলিমরাও রোমান অক্ষর ব্যবহার করেন এটা আপনি জেনে নেন আমি বলব না। আর এটিও জেনে রাখেন শতকরা ২৫% ইংরেজি সান্তালি দিয়ে পড়া যায়। এখনও যারা ইংরেজি শিখেননি সেই গ্রামের বয়বৃদ্ধ যে কোন ইংরেজি পত্রিকা ধরিয়ে দিলে ২৫% ভাগ সঠিক উচ্চারণ করতে সক্ষম হবেন। আপনি কিভাবে বলেন-
“রোমান হরফে সাঁওতালি ভাষা শেখার মানে তাই কোনোভাবেই রোমান লিপি শেখা হয়ে যাচ্ছে না।“ আজকের করপোরেট দুনিয়ার বাস্তবতায় যদি ইংরেজি কি অন্যান্য ভাষা জানতেই হয়, তবে সেটি সাঁওতাল শিশুদের জন্য সান্তাল এবং রাষ্ট্রই নিশ্চিত করবে। আপনাদের মত স্বার্থান্বেষী মহল না।
আপনি যে বলেছেন- “অলচিকি হরফে বাংলাদেশের সাঁওতাল জনগণ অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি, অধিকাংশেরই বর্ণ অভিজ্ঞতা হয়েছে বাংলায়। কৃষক, দিনমজুর থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী কি চাকরিজীবী—সবাই নিজ জাতির বাইরে বাংলা ভাষাতেই নিত্যদিনের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন।“ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে যে বাংলা বর্ণমালা মানবে না সেতো রাষ্ট্রদ্রোহী এটা রাষ্ট্রের ভাষা। বাংলাদেশে বসবাসরত সকল জাতিকে এটা মানতে হয়। ‘অলচিকি’ কেন বাংলাদেশে প্রচলন হবে তার দুরভিসন্ধি আপনার কাছেই থাকতে পারে।
আপনি কিভাবে নির্দেশনা দেন যে, “রাষ্ট্রের দায়িত্ব বাংলা হরফের সঙ্গে সাঁওতাল জনগণের এই ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ও বিকাশমানতা স্বীকৃতি দেওয়া।“? আপনি কি জাতীয় আদিবাসী পরিষদে সাঁওতাল হতে চলেছেন, না কি পিছনে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছেন???
পূর্বেই উল্লেখ করেছি ভাষা বিষয়ে যদি কোন আন্দোলনে নামতে হয় তাহলে যারা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছেন সরকার তাদের নাম লিপিবদ্ধ করবেন এবং অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্য দায়ী করবেন। এ বিষয়ে আপনার দায়িত্ব কোন পর্যায়ে আপনিই নিশ্চিত করুন।
পরিশেষে ভাষা বিষয়ে অনর্থক অনাঙ্খিত ব্যক্তিদের না জড়িয়ে পড়ার অনুরোধ করছি। এবং যেকোন জাতির কোন বিষয়ে সিদ্ধান্তের ব্যাপারে অনাকাঙ্খিত হস্তক্ষেপ না করার অনুরোধ করছি। উপরে উল্লেখিত আপনার কোন যু্ক্তিই সঠিক বলে প্রতীয়মান নয়। বাংলাদেশে সান্তালদের মধ্যে যতজন পেশাজীবি, গ্রাজুয়েট এবং চিন্তাশীল ব্যক্তি রয়েছেন সমাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের মতামত ও জ্ঞানকে শ্রদ্ধা করবেন। এটুকু বিবেকবোধ আপনার মধ্যে জাগ্রত হবে।
আন্তর্জাকিত মাতৃভাষা এই মহান মাসে আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং অন্যের ভাষাকে শ্রদ্ধাভরে সম্মান করবেন এটাই আপনার জন্য প্রার্থনা।
সমর এম সরেন এর মতেঃ বাংলাদেশে রোমান বর্ণমালায় সাঁওতালি ভাষা চর্চার ইতিহাস প্রায় ৯০ বছরের। বাংলাদেশে সাঁওতালি ভাষার সাহিত্যচর্চা হয়েছে রোমান দ্বারাই। মিশনারি ও এনজিও সহযোগিতা ব্যতীতই এ বর্ণমালায় বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত অসংখ্য বই রয়েছে। এ দেশে প্রকাশিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বইয়ের উদাহরণ দিতে পারি, যেগুলো শুধু বাংলাদেশেই নয়, অন্যান্য দেশেও সাড়া জাগিয়েছে। যেমন হাড়মাওয়াক আতো (উপন্যাস), মারে হাপড়ামকোয়াক কাথা (সাঁওতাল সমাজব্যবস্থা বিষয়ক), কাথা পাড়িয়ান (সাঁওতালি অভিধান), সান্তাল পারগানা ইত্যাদি। এ ছাড়া এ বর্ণমালায় সান্তালস সিভিল ল নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই এ দেশে সান্তালি ভাষার ম্যাগাজিন বের হতো এবং আজও সেই প্রকাশনার ধারা অব্যাহত রয়েছে। অপর দিকে বাংলাদেশে বাংলা বর্ণমালায় শিশুদের পড়ার বই এবং বর্ণমালা চর্চার বই ছাড়া অন্য কোনো সাহিত্য চর্চার প্রমাণ নেই বাংলাদেশের সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে। মাত্র চারটি বই বাংলা বর্ণমালায় রয়েছে। এনজিওর সহযোগিতায় শিশুদের জন্য লেখা এ বইগুলোর সাঁওতাল লেখকদের অনেকেই আজ রোমানের পক্ষে কথা বলছেন। প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। বাংলাদেশে বাংলা বর্ণমালায় সাঁওতালি কোনো তথ্যপ্রযুক্তির চর্চা করা হয়নি। আমার উদ্ভাবিত সাঁওতালি ইউনিকোড টাইপিং সফটওয়্যার হড়কাথাসহ সাঁওতালি উইকিপিডিয়া, সাঁওতালি ভাষার ফেসবুক অ্যাপ্লিকেশনসহ সবই করা হচ্ছে এই রোমান বর্ণমালায়।
তাই এ মুহূর্তে এ ধরনের ভাষাবিষয়ক স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সাঁওতাল জনগণ সর্বজনীন আদিবাসী সংগঠন ও কোনো বুদ্ধিজীবীর তুলনায় সাঁওতাল গোত্রপ্রধান এবং সাঁওতাল সংগঠনের সিদ্ধান্তগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের এই যুক্তি ও কর্মপন্থা অত্যন্ত যৌক্তিক। কেননা, ভাষা তাদের, সিদ্ধান্তও তাদের। ধর্মীয় বা রাজনৈতিক আবেগ দিয়ে নয়, বরং ব্যাকরণগত গ্রহণযোগ্যতা ও উচ্চারণগত যোগ্যতা বিচার করেই বর্ণমালা নির্বাচন করাটাই সঠিক বলে মনে করি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাঁওতাল শিশুদের ঝরে পড়ার হার বন্ধ করতে হলে সঠিক উচ্চারণসংবলিত বর্ণমালাই পড়ানো উচিত। সেদিক থেকে রোমানের যোগ্যতাই সবচেয়ে বেশি।

Source:http://diary.nawaze.info/detail/69
********************************************************************

No comments:

Post a Comment