প্রভাত টুডু
ইতালিয়ান ঔপন্যাসিক, দার্শনিক ও সমালোচক উমাবার্তো একো বলেছেন, 'ভাষা হচ্ছে একটি স্বচ্ছ হাতিয়ার যা থেকে আমরা বস্তুর প্রকৃতি বুঝতে পারি।' বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাতৃভাষাকে শিশুর জীবনে মাতৃদুগ্ধের স্থান দিয়েছেন। মাতৃদুগ্ধ ছাড়া যেমন শিশুর দেহের পুষ্টিসাধন সার্বিকভাবে হয় না, মাতৃভাষা ছাড়াও শিশুর চিন্তা-চেতনা, তার ভাবনার সঠিক বিকাশ হতে পারে না। ঈশ্বরের প্রথম সৃষ্টি আদমও কোন ভাষায় কথা বলেছেন তা আমরা যথাযথ সঠিকভাবে বলতে পারি না। পবিত্র বাইবেলের আদিপুস্তক ১১:১ পদে লেখা আছে, 'সমস্ত পৃথিবীতে এক ভাষা ও একরূপ ছিল।' তবে কালের আবর্তে মানুষের প্রয়োজনে তারই সৃষ্টি হচ্ছে এ ভাষা। বিশ্বের প্রতিটি ভাষায় সৃষ্টি হয়েছে নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীর সমাজ-সংস্কৃতি ও জীবনাচরণকে ঘিরে। সাঁওতালি ভাষার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশ সরকার বিগত কয়েক বছর থেকে সার্বজনীন শিক্ষার সেস্নাগান তুলেছে এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ মোতাবেক ২০১৪ সাল থেকে মাতৃভাষায় শিক্ষা বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করেছে। এ কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সাঁওতালি ভাষার বর্ণমালা কী হবে এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক, আলোচনা-পর্যালোচনা, কর্মশালা, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনের মতো বিভিন্ন কর্মসূচি বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের মধ্যে শুরু হয়েছে। এ সব ব্যক্তি বা সংগঠনের কেউ রোমান হরফ, কেউ বাংলা বা অলচিকি হরফে সাঁওতালি ভাষার পুস্তক রচনার জন্য দাবি তুলেছেন। বাংলাদিশোম সান্তাল বাইসি, আদিবাসী মুক্তি মোর্চা, সান্তাল ল্যাংগুয়েজ ডেভেলপমেন্ট কমিটি, মাহালে ল্যাংগুয়েজ ডেভেলপমেন্ট কমিটি সম্প্রতি রাজশাহী ও দিনাজপুরে কর্মশালা এবং সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রোমান হরফে সাঁওতালি ভাষার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবি তুলেছেন। পক্ষান্তরে, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও জাতীয় ছাত্র পরিষদ বাংলা হরফে সাঁওতালি পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছে। এদিকে রাজধানীর ঢাকায় অবস্থানরত সাঁওতালদের সংগঠন সাঁওতাল ফেলোসিফের নেতারা শুধু গুটিকয়েক ব্যক্তির মতামত নয় বরং দেশের তৃণমূল থেকে শুরু করে সব জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সাঁওতালি ভাষার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার মাতৃভাষা কলামে বিজ্ঞ লেখক পাভেল পার্থর লিখিত দু'একটি বিষয়ে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করছি। লেখার শেষ অংশে তিনি যে মতামত তুলে ধরেছেন তা আমার কাছে মনে হয়েছে_ তিনি গুটিকয়েক স্বার্থবাজ লোকের কথায় অথবা তার এখানে বৃহৎ কোন স্বার্থ জড়িত রয়েছে বলে তিনি তার এ মতামত ব্যক্ত করেছেন। তিনি শেষ অংশে লিখেছেন_ রোমান বা অন্য কোন অপরিচিত হরফ নয়, অলচিকি বা বাংলা বর্ণমালার মাধ্যমেই নিশ্চিত হোক সাঁওতালি ভাষার ন্যায়বিচার। তার এ মতামত লেখার পূর্বে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর বৃহৎ অংশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে মতামতটি যদি লিখতেন তা হলে মনে হয় ভালো হতো। কারণ তার এ লেখায় সাঁওতাল জনগোষ্ঠী মর্মাহত। তাছাড়া আমার মনে হয়_ তিনি বর্তমান সাঁওতালদের চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ ও মনের মধ্যে জমে থাকা অসংখ্য বেদনাদায়ক কথা সম্পর্কে অবগত নন। তিনি রোমান হরফকে এমনভাবে উপস্থাপন বা মূল্যায়ন করেছেন, তা হয়ত সাঁওতালি ভাষা রক্ষার ক্ষেত্রে কোন অবদানই রাখেনি। তিনি রোমান হরফের সাঁওতালি ভাষা লেখার ব্যাকরণ ও উচ্চারণগত জটিলতা এবং সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন লেখকের উদাহরণ উদ্ধৃতি দিয়ে।
এটা ঠিক, রোমান হরফে সম্পূর্ণরূপে সাঁওতালি ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ সম্ভব নয়। তবে তিনি হয়তবা অবগত আছেন, যখন ১৮৪৫ সালে রেভারেন্ড জে. ফিলিপস এই বর্ণমালা দ্বারা সাঁওতালি লেখার প্রচলন করেন এর পরবর্তী সময়ে তার শুদ্ধ উচ্চারণের জন্য ১৮৬৩ সালে ড. সিআর লেপলাস এই বর্ণমালাটি সংশোধন করেন। পরবর্তীতে আবারও সান্তাল লিটারেরি সোসাইটি এটিকে আইপিএর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দীর্ঘ স্বরধ্বনিগুলো সংশোধন করে। ফলে এটি মূল রোমান থেকে আলাদা হওয়াতে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর অনেকেই এটিকে সাঁওতালি হরফ হিসেবে গ্রহণ করেছে।
সাঁওতালি ভাষা রক্ষা ও লিখিত রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে রেভারেন্ড এলও স্ক্রেফসরুড বারানসী থেকে রোমান হরফে সাঁওতালি ভাষার ব্যাকরণ (অ এৎধসসবৎ ড়ভ ঃযব ঝধহঃধষর খধহমঁধমব) গ্রন্থের প্রকাশ করেন। আরেকজন বিদেশি নাগরিক পিও বোডিং ১৮৯০ সালে ভারতে এসে দীর্ঘ ৪৪ বছর সাঁওতালি ভাষা-সাহিত্যের উন্নতির জন্য অপরিসীম পরিশ্রম করেন। তার সংগৃহীত পা-ুলিপির অংশ বিশেষ কলকাতার ঝধহঃধষর খরঃবৎধৎু ধহফ ঈঁষঃঁৎধষ ঝড়পরবঃু-এর প্রচেষ্টায় ১৯৮৮ সালে মাইক্রো ফিল্মস (গরপৎড় ঋরষসং) আকারে তৈরি করে মোট ১৩ খ-ে অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালা থেকে আনা হয়। যা বিশ্ববিদ্যালয়, রাচি বিশ্ববিদ্যালয় ও আনথ্রোপোলোজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া এর কর্তৃপক্ষের কাছে দানস্বরূপ দেয়া হয় যাতে পরবর্তীকালে বিভিন্ন ভাষা-ভাষির লোকেরা গবেষণার কাজে লাগাতে পারেন।
পিও বোডিং-এর সব থেকে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে সাঁওতালি ভাষায় ৩০ হাজারেরও বেশি শব্দের পাঁচ খ-ের অভিধান তৈরি। এতেই সাঁওতালি ভাষার মেরুদ- যে কতখানি মজবুত হয়েছে তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমরা তো তাদের এ স্মরণীয় অবদান অস্বীকার করতে পারি না। লেখক ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের কথা উল্লেখ করে ১৫৭ বছর পর সেই জনগণের পক্ষে নিজ মাতৃভাষাকে রোমান হরফে লেখা নিয়ে প্রশ্ন রেখেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি, ইতিহাস থেকে সবারই জানা আছে, মুসলিম সমাজে কিছু কুসংস্কার বিদ্যমান ছিল বলে এ উপমহাদেশের মুসলিমরা ইংরেজি ভাষা শিক্ষা না নেয়ার কারণে শিক্ষা-দীক্ষা থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়েছিল। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে রোমান হরফে সাঁওতালি ভাষা লেখা মানে রোমান ভাষা শেখা নয়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেও আবার অনেক ছাত্রছাত্রীর মুখেই শুনেছি রোমান হরফ জানার ফলে ইংরেজি ভাষার বর্ণ ও শব্দের সঙ্গে পরিচিত এবং উচ্চারণে পারদর্শিতা আয়ত্ব করা সহজেই সম্ভব হয়।
লেখক এখানে আর একটি বিষয় উল্লেখ করেছেন, অলচিকি হরফে বাংলাদেশের সাঁওতাল জনগণ অভ্যস্ত হয়ে ওঠেননি, অধিকাংশের বর্ণ অভিজ্ঞতা হয়েছে বাংলায়। কৃষক, দিনমজুর থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী কি চাকরিজীবী সবাই নিজ জাতির বাইরে বাংলা ভাষাতেই নিত্যদিনের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। রপ্ত করেছেন বাংলা বর্ণমালা। কথাটি মিথ্যা নয়। কিন্তু সাঁওতালরা বাংলা বর্ণমালা রপ্ত করেও যে সাঁওতালি সাহিত্য চর্চা করেন তা নয় বরং বাংলা ভাষার সাহিত্যই চর্চা করেন। বাংলাদেশে অলচিকি বর্ণমালা সম্পর্কে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর হাজারে ১০ জন লোককে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে। তাহলে কোন্ যুক্তিতে অলচিকি হরফের কথা বলা হচ্ছে?
অলচিকি ভারতে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে বটে কিন্তু সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেটির গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে আমাদের খতিয়ে দেখা উচিত। আর যদি অলচিকি হরফ দিয়েই পাঠ্যপুস্তক রচনা করতেই হয় তাহলে হরফটিকে রাখার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার ব্যবস্থা গ্রহণ না করতেই কেন এ দাবি! তাছাড়া সাঁওতাল জনগোষ্ঠী এ ভাষা নতুনভাবে রপ্ত করার জন্য আরও একধাপ পিছিয়ে যাবে। আর বাংলা হরফে যদি সাঁওতালি পুস্তক লেখা হয় তাহলে শুদ্ধ উচ্চারণের প্রেক্ষিতে বাংলা বর্ণমালারও কিছু পরিবর্তন আনয়ন প্রয়োজন। কারণ দেখা গেছে ১৯৯৯ সালে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার বর্ষাপাড়া গ্রামে গ্রামীণ ট্রাস্টের সহায়তায় জাতীয় আদিবাসী পরিষদ বাংলা বর্ণমালায় একটি পাইলট স্কুলে সাঁওতালি ভাষার কার্যক্রম শুরু করে। কিন্তু বাংলা ভাষার বর্ণমালায় সাঁওতালি ভাষা বিকৃতি হওয়ার ফলে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী তা মেনে নিতে পারেনি। যদি বাংলা বর্ণমালায় সাঁওতালি পাঠ্যপুস্তক রচিত হয় তাহলে বাংলা ভাষার বর্ণমালারও কিছু পরিবর্তন ও পরিমার্জন প্রয়োজন। তাছাড়া আমরা দেখেছি, ১৯৫২ সালে পাকিস্তানিরা যখন উর্দু হরফে বাংলা সাহিত্য রচনার অপচেষ্টা চালায় তখন বাংলা ভাষা-ভাষি জনগণও তা মেনে নেয়নি। তাহলে বাংলা বর্ণমালার এ পরিবর্তন কী বাংলা ভাষাভাষিরা মেনে নিবেন! আমার তো সন্দেহ রয়েছে। কারণ পৃথিবীর মধ্যে বাঙালিরাই মায়ের ভাষার জন্য জীবন দিয়েছেন। বাংলা ভাষার বর্ণমালা পরিবর্তনে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হোক তা আমরা চাই না। তাই পরিশেষে বলতে চাই, সাঁওতাল ভাষার বর্ণমালা নিয়ে যৎসামান্য স্বার্থ হাসিলের জন্য কেউ রাজনীতি করবেন না। বাংলাদেশের এ বৃহৎ আদিবাসী সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সাঁওতালি ভাষার পাঠ্যপুস্তক সবার মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত হোক এটাই প্রত্যাশা করি।
[লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সাঁওতাল লেখক ফোরাম, ঢাকা।]
Source:http://www.thedailysangbad.com/?view=details&type=gold&data=Career&pub_no=1320&menu_id=20&news_type_id=1&val=122893
****************************************************************************
No comments:
Post a Comment