Place for Advertisement

Please Contact: spbjouralbd@gmail.com

আমাদের সব মাতৃভাষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে

সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী
অমর একুশে, আমাদের গর্ব, আমাদের স্বাধীনতার প্রথম সোপান। একুশের চেতনার পথ ধরে আমরা অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। আমাদের ভাষা শহীদদের চরম আত্মত্যাগ সমকালীন ইতিহাসে একটা বিরল ঘটনা। তাঁরা রক্ত দিয়ে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা রক্ষা করে গেছেন। আজকের এই দিনে তাঁদের জানাই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। আমাদের গর্ব, আজকের এই দিনটি সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। আমাদের ভাষা শহীদদের মতো আজ সারা পৃথিবীর সব দেশের নাগরিকরা তাঁদের নিজ নিজ মাতৃভাষা রক্ষার্থে নতুন করে অঙ্গীকার করছেন। সারা জাতির জন্য এটা একটি বিশাল অর্জন।


আজ গৌরবের দিন। একই সঙ্গে আজ আত্মবিশ্লেষণের দিন। আমরা কি আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও চেতনা সারা বিশ্বে তুলে ধরতে পেরেছি? আমরা কি আমাদের মাতৃভাষার সমৃদ্ধকরণ ও পরিবর্ধন করতে পেরেছি? আজ থেকে ১৪ বছর আগে অর্থাৎ ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে বহু দেন-দরবার ও কূটনৈতিক কলা-কৌশল খাটিয়ে আমাদের প্রস্তাবটি অনুমোদন করিয়ে নিয়েছিলাম। ফলে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০০ দিনটি উদযাপিত হয়েছিল। তদানীন্তন মহাপরিচালক কাইচুরা মাৎসুরা দিনটির শুভ উদ্বোধন বা লঞ্চিং করেছিলেন।
প্রস্তাবের প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের সব মাতৃভাষা রক্ষার্থে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার অঙ্গীকারও করেছিল। কতটুকু পালন করতে পারলাম সেই অঙ্গীকার? অনেক টানাপড়েনের পর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আজ থেকে তিন বছর আগে স্থাপিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভাষা রক্ষা করার জন্য তাদের যে পরিমাণ সামর্থ্য ও পারদর্শিতা দরকার তা অর্জন করতে তাদের আরো অনেক সময় লাগবে। তবে এই প্রাথমিক পর্যায়ে তারা আমাদের দেশের মাতৃভাষাগুলো সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে পারে।
বাংলা আমাদের প্রধান মাতৃভাষা। কিন্তু এ ছাড়া প্রায় ৩০টিরও বেশি আঞ্চলিক ও উপজাতীয় ভাষা আছে। তাদের সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এদের মধ্যে চাকমা একটি প্রধান ভাষা। প্রায় দুই লাখ উপজাতি এই ভাষায় কথা বলে। ইন্দো-ইউরোপীয় সমৃদ্ধ এই চাকমা ভাষার বর্ণে ১৮৬০ সালে প্রথম বাইবেল প্রকাশিত হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনকালে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের যে এলাকায় চাকমারা ও মারমারা বাস করত, সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই ভাষাগুলো শেখানো হতো। পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটা চালু করা আবার প্রয়োজন। তঞ্চঘ্যা আরেকটা ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারভুক্ত উপজাতীয় ভাষা। এ ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে, আছে তাদের নিজেদের সাহিত্য। রাঙামাটি ও বান্দরবান অঞ্চলে ব্যবহৃত খিয়াং আরেকটি উপজাতীয় ভাষা। তাদের নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই, তবে সিনে-টিবেটান ভাষাটি মিয়ানমারেও প্রচলিত আছে। এ ছাড়া খিয়াং, মারমা, বম, খুমি, চাক, কোচ, খাড়িয়া, হাজং, গারো, সাঁওতাল ও অন্যান্য উপজাতীয় ভাষা আছে।
গবেষকরা মনে করেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বাংলাসহ প্রায় ৪২টি ভাষা আছে। এদের বেশির ভাগই দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের সংরক্ষণার্থে এসব অঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে ভাষাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। উপজাতীয় ভাষায় প্রকাশিত বইগুলো যত্নসহকারে সংরক্ষণ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবর্তন করা যেতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন, একটি ভাষার মৃত্যু একটি মানবগোষ্ঠীর সঞ্চিত জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিলুপ্তি।
শুধু উপজাতীয়দের ভাষা নয়, আমাদের বিভিন্ন জেলায় ব্যবহৃত Dialect বা কথিত ভাষা আজ অনেকটা বিপদাপন্ন। হারিয়ে যাবে আমাদের পালাগান, জারিগান, বারোমাসিগান, পই-প্রবাদ, ডাক ও ডিঠান। বর্তমান ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দাপটে তারা সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আজ দেশের প্রায় দুই ডজন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে আমাদের অন্যান্য ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রায় অনুপস্থিত। এ ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, সিলেট বিভাগে বর্তমানে অবলুপ্ত 'সিলেট নাগরী' নামে একটি ভাষা ছিল। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রয়েছে। দেবনাগরী থেকে সম্পন্ন ভিন্ন এ ভাষা শুধু মুসলমানদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। হজরত শাহজালালের সঙ্গে ৩৬০ জন আউলিয়া সিলেটে আসেন। তাঁরা মূলত বিভিন্ন দেশ ও এই উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসেন। তাঁদের ভাষা বাংলা ছিল না। তাঁরা সম্ভবত তখন আরবি অক্ষরে তাঁদের নিজ নিজ ভাষায় চর্চা করতেন দেবনাগরী অক্ষরে। তার ভিত্তিতেই সিলেট নাগরী ভাষা গড়ে ওঠে। পরে ফারসি, আরবি, হিন্দি ও উর্দু ভাষা রূপান্তরিত হয়ে সিলেটে আসে। কিন্তু গরিব মুসলমানরা হিন্দি, ফারসি ও আরবির দাপট থেকে দূরে থাকার জন্য তাদের নাগরী ভাষা চালাতে লাগলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই নগরী শুধু গরিব মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে এই নাগরী অক্ষরে লেখা পুঁথিসাহিত্য সংরক্ষণে বেসরকারিভাবে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমাদের মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পারে। আমাদের মূল মাতৃভাষা বাংলার সমৃদ্ধিকরণ ও আন্তর্জাতিকীকরণ প্রক্রিয়া আরো জোরদার করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আমরা ইংরেজি ভাষার সমৃদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার দিকে নজর দিতে পারি। পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ফরাসির তুলনায় ইংরেজি ভাষীরা অনেক উদার মনোভাব দেখিয়েছিল ও বিভিন্ন সাহিত্য থেকে সব ধরনের বইপত্র অনুবাদ করে ও নতুন নতুন শব্দ আহরণ করেছিল। তবে তারা কাজটা অত্যন্ত সুচারুভাবে করেছিল। তাদের মূলনীতি ছিল যে শব্দ ইংরেজি ভাষায় নেই সেই বিদেশি শব্দ ইংরেজিতে বসানো যেতে পারে।
বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজির বিকল্প নেই। কাজেই আমাদের বাংলা ও ইংরেজিতে সমান পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে। মানবসম্পদ আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের ইংরেজি ভাষা শেখাতে হবে, যেন তারা বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। আমি মধ্যপ্রাচ্যে শুধু ইংরেজি না জানার কারণে আমাদের শ্রমিকদের পিছিয়ে পড়তে দেখেছি। ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইনের নাগরিকরা শুধু ইংরেজি জানার কারণে বেশি উপার্জন করছেন। ইংরেজি না জানার কারণে আমাদের আন্তর্জাতিক কল সেন্টারগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমরা বছরে পাঁচ বিলিয়ন ডলার হারাচ্ছি। এখানে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিরাট দাপট। তারা পৃথিবীর শীর্ষে আছে। অতীতে আমরা দুটি ভাষাই শিখতাম, বাংলা ও ইংরেজি। নিশ্চয়ই চেষ্টা করলে আবার পারব। আজকের এই দিনে আমাদের ব্রত হওয়া উচিত : মাতৃভাষা বাংলাকে সুদৃঢ়, সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক করব; অন্য সব মাতৃভাষা সংরক্ষণ করব ও একই সঙ্গে ইংরেজি ও বিদেশি ভাষা শিখব। প্রথমে বাংলা ভাষাকে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী করব, তাহলে পৃথিবী আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির দিকে আরো আগ্রহ দেখাবে। মহান একুশে অমর হোক।
 
লেখক : সাবেক পররাষ্ট্রসচিব, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা প্রস্তাবটি তিনি ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের পক্ষে উত্থাপন করেন এবং তার অনুমোদন প্রাপ্তিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।Source: http://www.kalerkantho.com/?view=details&type=gold&data=news&pub_no=1160&cat_id=3&menu_id=211&news_type_id=1&index=5&archiev=yes&arch_date=21-02-2013*******************************************************************************************
Share on Google Plus

About Tudu Marandy and all

0 comments:

Post a Comment