Online Santal Resource Page: the Santals identity, clans, living places, culture,rituals, customs, using of herbal medicine, education, traditions ...etc and present status.

The Santal Resource Page: these are all online published sources

Santal Gãota reaḱ onolko ńam lạgit́ SRP khon thoṛ̣a gõṛ̃o ńamoḱa mente ińaḱ pạtiạu ar kạṭić kurumuṭu...

Monday, June 24, 2013

রানা প্লাজায় নিখোঁজ তিন ও আহত এক আদিবাসী নারীর কথা

খোকন সুইটেন মুরমু


বাংলাদেশের তৈরি পোশাকরপ্তানি আয়েরমধ্যে অন্যতম।এই শিল্পেরসঙ্গে সংশ্লিষ্টশ্রমিকরা আজওমালিক রাষ্ট্রপক্ষের কাছ থেকে যথাযথ মূল্যায়নপায়নি। পোশাকশিল্পের কারখানাকেযদি মানবশরীরের সঙ্গেতুলনা করাহয় তাহলেশ্রমিকরা হবেশরীরের রক্ত।রক্ত শরীরেরঅপরিহার্য উপাদান এটি ছাড়া মানুষমারা যায়।শ্রমিকরাও তেমনি কারখানার প্রাণ, শরীরেরক্ত চলাচলেরমতো তারাকারখানাকে গতিশীল রাখে। শ্রমিক ছাড়াকারখানা চলতেপারে না।শ্রমিক অসন্তোষএর ফলেযে কোনসময় ঘটেযেতে পারেশ্রম বিপ্লব।বন্ধ হয়েযেতে পারেকারখানা, ধ্বংসহয়ে যেতেপারে শিল্প।ফলে বাড়বেবেকারত্ব এরপ্রভাব পড়বেদেশের সামগ্রিকঅর্থনীতিতে। সাম্প্রতিককালে দেশে ঘটে যাওয়াতাজরীন গার্মেন্টেরঅগি্নকা- সাভারের রানাপ্লাজায় ভবনধসবিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পেরধস নামিয়েদিয়েছে। পোশাকশিল্পকে অবহেলারকারণে আজবহির্বিশ্বে বাংলাদেশের বাজার সংকুচিত হয়েআসছে। গত২৪ এপ্রিলরান প্লাজারভবনধস দেশেরতৈরি পোশাকশিল্পের ভবিষ্যতকেওনড়বড়ে করেদিয়েছে।

বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরবাণিজ্য বিনিয়োগ সহযোগিতাসংক্রান্ত কাঠামোগত (টিকফা) চুক্তি সাম্প্রতিকএই ভয়াবহদুর্ঘটনার কারণে দোদুল্যমান হয়ে পড়েছে।পোশাক শিল্পমার্কিন বাজারেঅগ্রাধিকারমূলক বাজার (জিএসপি) সুবিধা থেকেআজ বঞ্চিতহওয়ার পথে।বাংলাদেশের বেশিরভাগ পোশাক কারখানা বিশ্বমান নিয়ন্ত্রণকারীপ্রতিষ্ঠান (আইএসও) কর্তৃক নির্ধারিত কোডঅনুসরণ করেনা। ফলেঘটছে তাজরীন রানাপ্লাজার মতোমর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এক্ষেত্রে শুধু পোশাকমালিকদের একতরফাভাবেদোষারোপ করা যায় না। আইএসওকর্তৃক নির্ধারিতকোড অনুসরণকরে নাএসব কোম্পানিকেইকাজ দিচ্ছেঅনেক বিদেশিক্রেতা। পোশাকশিল্পে ঘটেযাওয়া এইদুর্ঘটনার দায় কোন মতেই এড়িয়েযেতে পারেনা সুযোগসন্ধানী বিদেশিক্রেতারা। বিশ্ববাজার দখলে রাখা ওয়ালমার্টেরমতো কোম্পানিরঅর্ডার ছিলএসব গার্মেন্টসে।তৃতীয় বিশ্বেমেধাস্বত্ব (ট্রিপস) আইন অমান্য বাপাইরেসি যেখানেটিকফা চুক্তিরপ্রধান অন্তরায়।সেখানে ওয়ালমার্টেরমতো প্রতিষ্ঠিতকোম্পানি আইএসও স্ট্যান্ডার্ডের নিচে থাকাগার্মেন্টসকে কাজ দেয়াও অযৌক্তিক। ওয়ালমার্টএই দুর্ঘটনায়শিকার নিহতশ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের দায় এড়াতে পারেনা। পোশাকশিল্পে দুর্ঘটনারএই দায়শিল্প মালিক, সরকার বিদেশি ক্রেতাদের।



পোশাক শিল্পবাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটাপ্রধান খাত।এই শিল্পকেজনগণের সুবিধার্থেপ্রসারের জন্যরাষ্ট্র তেমনকোন সুদূরপ্রসারীচিন্তা আজওকরেনি। বাংলাদেশেরপোশাক শিল্পবিজিএমই বিকেএমই দুইসংগঠনের কাছেআজ জিম্মি।এই দুইসংগঠন মূলতমালিক কর্তৃকনিয়ন্ত্রিত পরিচালিত। শ্রমিকদের জন্যপোশাক শিল্পেসৃষ্টি হয়নিকোন আদর্শশ্রমিক ইউনিয়ন।যে শ্রমিকইউনিয়ন শ্রমিকদেরস্বার্থে রাষ্ট্র মালিকপক্ষের সঙ্গেসমঝোতা করতেপারে। কিন্তুশ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার্থে শ্রমিক নেতাদেরপোশক শিল্পেভালো কোনঅর্জন নেই।

রানা প্লাজারতৃতীয় থেকেঅষ্টম তলাপর্যন্ত পাঁচটিপোশাক কারখানাছিল। পেতেতুয়া, শেফালি শিখা নামেরতিন আদিবাসীনারী রানাপ্লাজার পঞ্চমতলায় ফ্যান্টমটেকলিমিটেড গার্মেন্টসেকাজ করত।পরিবার আজঅবধি খুঁজেপায়নি তাদেরলাশ। বিভিন্নসূত্র মতেরানা প্লাজারভবন ধসেরঘটনায় নিহতহয়েছে ১১২৭জন। এইতালিকায় নিহততিন আদিবাসীনারী শ্রমিকঅন্তর্ভুক্ত কি না তা নিহতপরিবার অজ্ঞাত।

রানা প্লাজারপঞ্চম তলায়কাজ করতনিহত পেতেতুয়ারস্বামী আলবার্টমুরমু। সেদিনেরদুর্ঘটনা থেকেরক্ষা পাওয়াআলবার্ট বলেন, 'সকালে কাজকরার সময়হঠাএকটা বিকটশব্দ শোনামাত্রইসবাই সিঁড়িরদিকে দৌড়াতেশুরু করে।আমার স্ত্রীপেতেতুয়া শেফালিকে সিঁড়িরদিকে দৌড়াতেদেখি। কিন্তুআমি আরও দুজনকিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কাজের জায়গায় পড়েথাকি। সেকেন্ডেরমধ্যেই সবকিছুখান খানহয়ে ভেঙেপড়ে। জ্ঞানফেরার পরধ্বংসস্তূপের ফোকরে আমরা তিনজন নিজেদেরদেখতে পাই।অনেক চেষ্টাকরার পরলোহার রডদিয়ে আমরাদেয়ালে একটুফুটো করেবাইরের লোকদেরহাতের ইশারাইডাকতে থাকি।উদ্ধার কর্মীরাসেখানে পৌঁছেদেয়াল কেটেআমাদের বাইরেবের করেনিয়ে আসে।' আলবার্ট মুরমুরতথ্য মতেপঞ্চম তলারফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করতপেতেতুয়া, শেফালি, শিখা, মেরিনা, মনিকা, খ্রিস্টানা, তেরেজাসহ ১০ জন আদিবাসীপোশাক শ্রমিক।এদের মধ্যেতিনজনকে দুর্ঘটনারপর থেকেআজও খুঁজেপাওয়া যায়নি।সহকর্মী পরিবারের মতেতারা নিহতহয়েছে। মনিকানামে একজনকেউদ্ধার করাহয়েছে তিনিএখন সিআরপিহাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর অন্যশ্রমিকরা গুরুতরআহত হয়েছে।

পেতেতুয়া হাঁসদা

শাখইডাঙা গ্রামেরবিরল থানারদিনাজপুর জেলারসান্তাল সমপ্রদায়েরঅধিবাসী পেতেতুয়াহাঁসদা (২২) পিতারাফায়েল হাঁসদা মাতাচিচিলিয়া মুরমু।তিন বোনেরমধ্যে সেছিল সবারছোট। দু'বোনের বিয়েহয়েছে অনেকআগে। স্বামীআলবার্ট মুরমুরসঙ্গে সংসারপেতেছিল বছরখানেক আগে।সে সংসারেরসব খরচবহন করত।রানা প্লাজারপঞ্চম তলারফ্যান্টমটেক লিমিটেড গামেন্র্টসে কাজ করতেনমেশিন সুইংঅপারেটর হিসেবে, তার অপারেটরআইডি নাম্বার১২০৭। দুর্ঘটনারদিন স্বামী-স্ত্রী দুজনেকাজে যোগদিয়েছিল। স্বামীআলবার্ট মুরমুপ্রাণে বেঁচেগেলেও পেতেতুয়ারএখন পর্যন্তকোন খোঁজমেলেনি। দুর্ঘটনারদিন সেপরেছিল খয়েরিরঙের সেলোয়ারকামিজ গলায় রুপারমালার সঙ্গেক্রস। ইউএনও' কাছেনিহত তালিকায়নাম অন্তর্ভুক্তকরণেরআবেদনে নাম্বার৮৮। তাকেখুঁজে নাপেয়ে পিতারাফায়েল হাঁসদাসাভার মডেলথানায় একটিসাধারণ ডায়েরিকরেন। জিডিনং-০১৩৮, ক্রমিক নং-৮৮, তারিখ: ২১/০৫/২০১৩। তারপিতার ডিএনএপরীক্ষার নাম্বার: আইডি--১৩-বিএল-৩০৯ যোগাযোগ নাম্বার: ০১৭৪০২২৯১৩৫।

শেফালি মার্ডী

দিনাজপুর সদররেরভাটপাড়া গ্রামেরসান্তাল সমপ্রদায়েরঅধিবাসী শেফালিমার্ডী (২৬) পিতাস্যামুয়েল মার্ডী মাতা আগ্নেশহাঁসদা। তিনবোন এক ভাইয়েরসংসারে সেছিল দ্বিতীয়উপার্জনকারী। রানা প্লাজার পঞ্চম তলারফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করতেনহেলপার হিসেবে।ইউএনও'কাছে নিহততালিকায় নামঅন্তর্ভুক্তকরণের জন্য আবেদনেনাম্বার ৪৬।তাকে খুঁজেনা পেয়েতার পিতাস্যামুয়েল মার্ডী সাভার মডেল থানায়একটি সাধারণডায়েরি করেন।জিডি নং-১১২৬, ক্রমিকনং-১৮৪, তারিখ : ২২/০৫/২০১৩।ডিএনএ পরীক্ষারনাম্বার : আইডি--১৩-বি১-৪২০। যোগাযোগনাম্বার : ০১৭২১৫৪৭৫৫৬।

শিখা হাঁসদাক

রাজশাহী জেলাসদর কলিমনগরের মাহালিসমপ্রদায়ের অধিবাসী শিখা মার্থা হাঁসদাক(২৫)পিতা রেনাতুসহাঁসদা মাতা কসতান্তিনাবাস্কে। দুইভাই এক বোনেরমধ্যে সেছিল পরিবারেরদ্বিতীয় উপার্জনকারী।রানা প্লাজারপঞ্চম তলারফ্যান্টমটেক লিমিটেড গামেন্র্টসে জুনিয়র সুইংঅপারেটর হিসেবেকাজ করতেন।তার অপারেটরআইডি নাম্বারছিল ১২০৩।ইউএনও'কাছে নিহততালিকায় নামঅন্তর্ভুক্তকরণের আবেদনের নাম্বার৪৬। তাকেখুঁজে নাপেয়ে তারপিতা সাভারমডেল থানায়সাধারণ ডায়েরিকরেন, জিডিনাম্বার-১০৩৪।যোগাযোগ নাম্বার : ০১১৯৭০৯৩৭৩০।

বাংলাদেশে পর্যবেক্ষণে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরগণতন্ত্র, মানবাধিকার শ্রম বিষয়কডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্টসেক্রেটারি ক্যারেন হানরান ইতোমধ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে শ্রমিকদের সংগঠনকরার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা কারখানায় কাজের সুষ্ঠুপরিবেশ বজায়রাখা গুরুত্বপূর্ণবিষয়। কিন্তুবাংলাদেশের পোশাক শিল্পে মালিক পক্ষনিরাপত্তা কাজের সুষ্ঠুতার ব্যাপারেআজও আন্তরিকনয়। বাংলাদেশেরতৈরি পোশাকশিল্পের অন্যতমক্রেতা মার্কিনযুক্তরাষ্ট্র আজ জিএসপি সুবিধা বাতিলেরজন্য চোখরাঙাচ্ছে। বর্তমান সরকার এই শিল্পকেটিকফা চুক্তিরফলে জিএসপিসুবিধার আওতায়নিয়ে আসারচেষ্টা করছে।কিন্তু মার্কিনযুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যেরতালিকায় তৈরিপোশাক খাতকতটুকু শুল্কমুক্তসুবিধা পাবেতা সরকারেরবিবেচনায় রাখারবিষয়।

রানা প্লাজারদুর্ঘটনায় মহিউদ্দিন খন্দকারকে প্রধান করেগঠিত তদন্তকমিটি ইতোমধ্যেজমি বিক্রিকরে তানিহত আহতদের সহায়তাকরার ব্যাপারেমত দিয়েছেন।ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেতিন দফায়নিহতদের পরিবারকেআর্থিক ক্ষতিপূরণপ্রদান করাহয়েছে। কিন্তুনিহত আদিবাসীনারী শ্রমিকদেরপরিবার আজওপর্যন্ত কোনক্ষতিপূরণ পায়নি। নিহত তিন আদিবাসীনারী শ্রমিকেরপরিবার চলততাদের আয়েরঅর্থ দিয়ে।কিন্তু তাদেরপরিবার আজপর্যন্ত জানেনা যে, নিহতদের নামরানা প্লাজায়দুর্ঘটনায় নিখোঁজ নিহত শ্রমিকদের তালিকায়অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না। সরকারকর্তৃক নিহতদেরজন্য প্রদেয়আর্থিক অনুদানতারা কিপাবে? বিজিএমইএকি পশ্চাৎপদ এসবআদিবাসী নিহতনারী শ্রমিকদেরপরিবারের পাশেদাঁড়াবে? সমতলআদিবাসীদের জন্য কাজ করে এমনসংগঠন জাতীয়আদিবাসী পরিষদেরসভাপতি রবীন্দ্রনাথসরেন বলেন, 'সমতলের আদিবাসীরাভূমি সমস্যারকারণে আজঅনেকে কাজেরসন্ধানে শহরমুখীহচ্ছে। রানাপ্লাজায় নিহতআদিবাসী এসবনারী শ্রমিকেরপারিশ্রমিকে তাদের পরিবার চলত। নিহত আহতদেরশনাক্তকরণের মাধ্যমে তাদের নাম সরকারকর্তৃক গৃহীততালিকায় অন্তর্ভুক্তকরার জোরদাবি জানাচ্ছি।সরকার বিজিএমইএ ঘোষিতআর্থিক ক্ষতিপূরণেরক্ষেত্রে এসবআদিবাসী শ্রমিকদেরপরিবার যাতেবাদ নাযায় সেব্যাপারে আন্তরিকভাবেসরকারের নজরদেয়া উচিত।'

[লেখক : সাবেকসাংগঠনিক সম্পাদকসান্তাল স্টুডেন্টসইউনিয়ন (সাসু)]
 Source:http://www.thedailysangbad.com/index.php?ref=MjBfMDZfMjBfMTNfMl8yM18xXzEzNDk2MA==
*******************************************************************
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের মধ্যে অন্যতম। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা আজও মালিক ও রাষ্ট্রপক্ষের কাছ থেকে যথাযথ মূল্যায়ন পায়নি। পোশাক শিল্পের কারখানাকে যদি মানব শরীরের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে শ্রমিকরা হবে শরীরের রক্ত। রক্ত শরীরের অপরিহার্য উপাদান এটি ছাড়া মানুষ মারা যায়। শ্রমিকরাও তেমনি কারখানার প্রাণ, শরীরে রক্ত চলাচলের মতো তারা কারখানাকে গতিশীল রাখে। শ্রমিক ছাড়া কারখানা চলতে পারে না। শ্রমিক অসন্তোষ এর ফলে যে কোন সময় ঘটে যেতে পারে শ্রম বিপ্লব। বন্ধ হয়ে যেতে পারে কারখানা, ধ্বংস হয়ে যেতে পারে শিল্প। ফলে বাড়বে বেকারত্ব এর প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিককালে দেশে ঘটে যাওয়া তাজরীন গার্মেন্টের অগি্নকা- ও সাভারের রানা প্লাজায় ভবনধস বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ধস নামিয়ে দিয়েছে। পোশাক শিল্পকে অবহেলার কারণে আজ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। গত ২৪ এপ্রিল রান প্লাজার ভবনধস দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যতকেও নড়বড়ে করে দিয়েছে।

বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সংক্রান্ত কাঠামোগত (টিকফা) চুক্তি সাম্প্রতিক এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণে দোদুল্যমান হয়ে পড়েছে। পোশাক শিল্প মার্কিন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাজার (জিএসপি) সুবিধা থেকে আজ বঞ্চিত হওয়ার পথে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পোশাক কারখানা বিশ্ব মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান (আইএসও) কর্তৃক নির্ধারিত কোড অনুসরণ করে না। ফলে ঘটছে তাজরীন ও রানা প্লাজার মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এক্ষেত্রে শুধু পোশাক মালিকদের একতরফাভাবে দোষারোপ করা যায় না। আইএসও কর্তৃক নির্ধারিত কোড অনুসরণ করে না এসব কোম্পানিকেই কাজ দিচ্ছে অনেক বিদেশি ক্রেতা। পোশাক শিল্পে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনার দায় কোন মতেই এড়িয়ে যেতে পারে না সুযোগ সন্ধানী বিদেশি ক্রেতারা। বিশ্ববাজার দখলে রাখা ওয়ালমার্টের মতো কোম্পানির অর্ডার ছিল এসব গার্মেন্টসে। তৃতীয় বিশ্বে মেধাস্বত্ব (ট্রিপস) আইন অমান্য বা পাইরেসি যেখানে টিকফা চুক্তির প্রধান অন্তরায়। সেখানে ওয়ালমার্টের মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি আইএসও স্ট্যান্ডার্ডের নিচে থাকা গার্মেন্টসকে কাজ দেয়াও অযৌক্তিক। ওয়ালমার্ট এই দুর্ঘটনায় শিকার নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের দায় এড়াতে পারে না। পোশাক শিল্পে দুর্ঘটনার এই দায় শিল্প মালিক, সরকার ও বিদেশি ক্রেতাদের।

পোশাক শিল্প বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটা প্রধান খাত। এই শিল্পকে জনগণের সুবিধার্থে প্রসারের জন্য রাষ্ট্র তেমন কোন সুদূরপ্রসারী চিন্তা আজও করেনি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিজিএমই ও বিকেএমই দুই সংগঠনের কাছে আজ জিম্মি। এই দুই সংগঠন মূলত মালিক কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত। শ্রমিকদের জন্য পোশাক শিল্পে সৃষ্টি হয়নি কোন আদর্শ শ্রমিক ইউনিয়ন। যে শ্রমিক ইউনিয়ন শ্রমিকদের স্বার্থে রাষ্ট্র ও মালিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারে। কিন্তু শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার্থে শ্রমিক নেতাদের পোশক শিল্পে ভালো কোন অর্জন নেই।

রানা প্লাজার তৃতীয় থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত পাঁচটি পোশাক কারখানা ছিল। পেতেতুয়া, শেফালি ও শিখা নামের তিন আদিবাসী নারী রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করত। পরিবার আজ অবধি খুঁজে পায়নি তাদের লাশ। বিভিন্ন সূত্র মতে রানা প্লাজার ভবন ধসের ঘটনায় নিহত হয়েছে ১১২৭ জন। এই তালিকায় নিহত তিন আদিবাসী নারী শ্রমিক অন্তর্ভুক্ত কি না তা নিহত পরিবার অজ্ঞাত।

রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় কাজ করত নিহত পেতেতুয়ার স্বামী আলবার্ট মুরমু। সেদিনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া আলবার্ট বলেন, 'সকালে কাজ করার সময় হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শোনামাত্রই সবাই সিঁড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করে। আমার স্ত্রী পেতেতুয়া ও শেফালিকে সিঁড়ির দিকে দৌড়াতে দেখি। কিন্তু আমি ও আরও দুজন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কাজের জায়গায় পড়ে থাকি। সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে। জ্ঞান ফেরার পর ধ্বংসস্তূপের ফোকরে আমরা তিনজন নিজেদের দেখতে পাই। অনেক চেষ্টা করার পর লোহার রড দিয়ে আমরা দেয়ালে একটু ফুটো করে বাইরের লোকদের হাতের ইশারাই ডাকতে থাকি। উদ্ধার কর্মীরা সেখানে পৌঁছে দেয়াল কেটে আমাদের বাইরে বের করে নিয়ে আসে।' আলবার্ট মুরমুর তথ্য মতে পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করত পেতেতুয়া, শেফালি, শিখা, মেরিনা, মনিকা, খ্রিস্টানা, তেরেজাসহ ১০ জন আদিবাসী পোশাক শ্রমিক। এদের মধ্যে তিনজনকে দুর্ঘটনার পর থেকে আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সহকর্মী ও পরিবারের মতে তারা নিহত হয়েছে। মনিকা নামে একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে তিনি এখন সিআরপি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর অন্য শ্রমিকরা গুরুতর আহত হয়েছে।

পেতেতুয়া হাঁসদা

শাখইডাঙা গ্রামের বিরল থানার দিনাজপুর জেলার সান্তাল সমপ্রদায়ের অধিবাসী পেতেতুয়া হাঁসদা (২২)। পিতা রাফায়েল হাঁসদা ও মাতা চিচিলিয়া মুরমু। তিন বোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট। দু'বোনের বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। স্বামী আলবার্ট মুরমুর সঙ্গে সংসার পেতেছিল বছর খানেক আগে। সে সংসারের সব খরচ বহন করত। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গামেন্র্টসে কাজ করতেন মেশিন সুইং অপারেটর হিসেবে, তার অপারেটর আইডি নাম্বার ১২০৭। দুর্ঘটনার দিন স্বামী-স্ত্রী দুজনে কাজে যোগ দিয়েছিল। স্বামী আলবার্ট মুরমু প্রাণে বেঁচে গেলেও পেতেতুয়ার এখন পর্যন্ত কোন খোঁজ মেলেনি। দুর্ঘটনার দিন সে পরেছিল খয়েরি রঙের সেলোয়ার কামিজ ও গলায় রুপার মালার সঙ্গে ক্রস। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের আবেদনে নাম্বার ৮৮। তাকে খুঁজে না পেয়ে পিতা রাফায়েল হাঁসদা সাভার মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নং-০১৩৮, ক্রমিক নং-৮৮, তারিখ : ২১/০৫/২০১৩। তার পিতার ডিএনএ পরীক্ষার নাম্বার : আইডি-৬-১৩-বিএল-৩০৯। যোগাযোগ নাম্বার : ০১৭৪০২২৯১৩৫।

শেফালি মার্ডী

দিনাজপুর সদররের ভাটপাড়া গ্রামের সান্তাল সমপ্রদায়ের অধিবাসী শেফালি মার্ডী (২৬)। পিতা স্যামুয়েল মার্ডী ও মাতা আগ্নেশ হাঁসদা। তিন বোন ও এক ভাইয়ের সংসারে সে ছিল দ্বিতীয় উপার্জনকারী। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করতেন হেলপার হিসেবে। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের জন্য আবেদনে নাম্বার ৪৬। তাকে খুঁজে না পেয়ে তার পিতা স্যামুয়েল মার্ডী সাভার মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নং-১১২৬, ক্রমিক নং-১৮৪, তারিখ : ২২/০৫/২০১৩। ডিএনএ পরীক্ষার নাম্বার : আইডি-৬-১৩-বি১-৪২০। যোগাযোগ নাম্বার : ০১৭২১৫৪৭৫৫৬।

শিখা হাঁসদাক

রাজশাহী জেলা সদর কলিম নগরের মাহালি সমপ্রদায়ের অধিবাসী শিখা মার্থা হাঁসদাক (২৫)। পিতা রেনাতুস হাঁসদা ও মাতা কসতান্তিনা বাস্কে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ছিল পরিবারের দ্বিতীয় উপার্জনকারী। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গামেন্র্টসে জুনিয়র সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। তার অপারেটর আইডি নাম্বার ছিল ১২০৩। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের আবেদনের নাম্বার ৪৬। তাকে খুঁজে না পেয়ে তার পিতা সাভার মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন, জিডি নাম্বার-১০৩৪। যোগাযোগ নাম্বার : ০১১৯৭০৯৩৭৩০।

বাংলাদেশে পর্যবেক্ষণে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম বিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ক্যারেন হানরান ইতোমধ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও কারখানায় কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে মালিক পক্ষ নিরাপত্তা ও কাজের সুষ্ঠুতার ব্যাপারে আজও আন্তরিক নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম ক্রেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ জিএসপি সুবিধা বাতিলের জন্য চোখ রাঙাচ্ছে। বর্তমান সরকার এই শিল্পকে টিকফা চুক্তির ফলে জিএসপি সুবিধার আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় তৈরি পোশাক খাত কতটুকু শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে তা সরকারের বিবেচনায় রাখার বিষয়।

রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় মহিউদ্দিন খন্দকারকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে জমি বিক্রি করে তা নিহত ও আহতদের সহায়তা করার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তিন দফায় নিহতদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু নিহত আদিবাসী নারী শ্রমিকদের পরিবার আজও পর্যন্ত কোন ক্ষতিপূরণ পায়নি। নিহত তিন আদিবাসী নারী শ্রমিকের পরিবার চলত তাদের আয়ের অর্থ দিয়ে। কিন্তু তাদের পরিবার আজ পর্যন্ত জানে না যে, নিহতদের নাম রানা প্লাজায় দুর্ঘটনায় নিখোঁজ নিহত শ্রমিকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না। সরকার কর্তৃক নিহতদের জন্য প্রদেয় আর্থিক অনুদান তারা কি পাবে? বিজিএমইএ কি পশ্চাৎপদ এসব আদিবাসী নিহত নারী শ্রমিকদের পরিবারের পাশে দাঁড়াবে? সমতল আদিবাসীদের জন্য কাজ করে এমন সংগঠন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, 'সমতলের আদিবাসীরা ভূমি সমস্যার কারণে আজ অনেকে কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। রানা প্লাজায় নিহত আদিবাসী এসব নারী শ্রমিকের পারিশ্রমিকে তাদের পরিবার চলত। নিহত ও আহতদের শনাক্তকরণের মাধ্যমে তাদের নাম সরকার কর্তৃক গৃহীত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি। সরকার ও বিজিএমইএ ঘোষিত আর্থিক ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে এসব আদিবাসী শ্রমিকদের পরিবার যাতে বাদ না যায় সে ব্যাপারে আন্তরিকভাবে সরকারের নজর দেয়া উচিত।'

[লেখক : সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সান্তাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (সাসু)।] - See more at: http://www.thedailysangbad.com/index.php?ref=MjBfMDZfMjBfMTNfMl8yM18xXzEzNDk2MA==#sthash.yxG2wc2T.Vy05X9i7.dpuf

[লেখক : সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সান্তাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (সাসু)।] - See more at: http://www.thedailysangbad.com/index.php?ref=MjBfMDZfMjBfMTNfMl8yM18xXzEzNDk2MA==#sthash.yxG2wc2T.Vy05X9i7.dpuf
[লেখক : সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সান্তাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (সাসু)।] - See more at: http://www.thedailysangbad.com/index.php?ref=MjBfMDZfMjBfMTNfMl8yM18xXzEzNDk2MA==#sthash.yxG2wc2T.Vy05X9i7.dpuf

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের মধ্যে অন্যতম। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা আজও মালিক ও রাষ্ট্রপক্ষের কাছ থেকে যথাযথ মূল্যায়ন পায়নি। পোশাক শিল্পের কারখানাকে যদি মানব শরীরের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে শ্রমিকরা হবে শরীরের রক্ত। রক্ত শরীরের অপরিহার্য উপাদান এটি ছাড়া মানুষ মারা যায়। শ্রমিকরাও তেমনি কারখানার প্রাণ, শরীরে রক্ত চলাচলের মতো তারা কারখানাকে গতিশীল রাখে। শ্রমিক ছাড়া কারখানা চলতে পারে না। শ্রমিক অসন্তোষ এর ফলে যে কোন সময় ঘটে যেতে পারে শ্রম বিপ্লব। বন্ধ হয়ে যেতে পারে কারখানা, ধ্বংস হয়ে যেতে পারে শিল্প। ফলে বাড়বে বেকারত্ব এর প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিককালে দেশে ঘটে যাওয়া তাজরীন গার্মেন্টের অগি্নকা- ও সাভারের রানা প্লাজায় ভবনধস বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ধস নামিয়ে দিয়েছে। পোশাক শিল্পকে অবহেলার কারণে আজ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। গত ২৪ এপ্রিল রান প্লাজার ভবনধস দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যতকেও নড়বড়ে করে দিয়েছে।

বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সংক্রান্ত কাঠামোগত (টিকফা) চুক্তি সাম্প্রতিক এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণে দোদুল্যমান হয়ে পড়েছে। পোশাক শিল্প মার্কিন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাজার (জিএসপি) সুবিধা থেকে আজ বঞ্চিত হওয়ার পথে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পোশাক কারখানা বিশ্ব মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান (আইএসও) কর্তৃক নির্ধারিত কোড অনুসরণ করে না। ফলে ঘটছে তাজরীন ও রানা প্লাজার মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এক্ষেত্রে শুধু পোশাক মালিকদের একতরফাভাবে দোষারোপ করা যায় না। আইএসও কর্তৃক নির্ধারিত কোড অনুসরণ করে না এসব কোম্পানিকেই কাজ দিচ্ছে অনেক বিদেশি ক্রেতা। পোশাক শিল্পে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনার দায় কোন মতেই এড়িয়ে যেতে পারে না সুযোগ সন্ধানী বিদেশি ক্রেতারা। বিশ্ববাজার দখলে রাখা ওয়ালমার্টের মতো কোম্পানির অর্ডার ছিল এসব গার্মেন্টসে। তৃতীয় বিশ্বে মেধাস্বত্ব (ট্রিপস) আইন অমান্য বা পাইরেসি যেখানে টিকফা চুক্তির প্রধান অন্তরায়। সেখানে ওয়ালমার্টের মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি আইএসও স্ট্যান্ডার্ডের নিচে থাকা গার্মেন্টসকে কাজ দেয়াও অযৌক্তিক। ওয়ালমার্ট এই দুর্ঘটনায় শিকার নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের দায় এড়াতে পারে না। পোশাক শিল্পে দুর্ঘটনার এই দায় শিল্প মালিক, সরকার ও বিদেশি ক্রেতাদের।

পোশাক শিল্প বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটা প্রধান খাত। এই শিল্পকে জনগণের সুবিধার্থে প্রসারের জন্য রাষ্ট্র তেমন কোন সুদূরপ্রসারী চিন্তা আজও করেনি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিজিএমই ও বিকেএমই দুই সংগঠনের কাছে আজ জিম্মি। এই দুই সংগঠন মূলত মালিক কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত। শ্রমিকদের জন্য পোশাক শিল্পে সৃষ্টি হয়নি কোন আদর্শ শ্রমিক ইউনিয়ন। যে শ্রমিক ইউনিয়ন শ্রমিকদের স্বার্থে রাষ্ট্র ও মালিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারে। কিন্তু শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার্থে শ্রমিক নেতাদের পোশক শিল্পে ভালো কোন অর্জন নেই।

রানা প্লাজার তৃতীয় থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত পাঁচটি পোশাক কারখানা ছিল। পেতেতুয়া, শেফালি ও শিখা নামের তিন আদিবাসী নারী রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করত। পরিবার আজ অবধি খুঁজে পায়নি তাদের লাশ। বিভিন্ন সূত্র মতে রানা প্লাজার ভবন ধসের ঘটনায় নিহত হয়েছে ১১২৭ জন। এই তালিকায় নিহত তিন আদিবাসী নারী শ্রমিক অন্তর্ভুক্ত কি না তা নিহত পরিবার অজ্ঞাত।

রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় কাজ করত নিহত পেতেতুয়ার স্বামী আলবার্ট মুরমু। সেদিনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া আলবার্ট বলেন, 'সকালে কাজ করার সময় হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শোনামাত্রই সবাই সিঁড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করে। আমার স্ত্রী পেতেতুয়া ও শেফালিকে সিঁড়ির দিকে দৌড়াতে দেখি। কিন্তু আমি ও আরও দুজন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কাজের জায়গায় পড়ে থাকি। সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে। জ্ঞান ফেরার পর ধ্বংসস্তূপের ফোকরে আমরা তিনজন নিজেদের দেখতে পাই। অনেক চেষ্টা করার পর লোহার রড দিয়ে আমরা দেয়ালে একটু ফুটো করে বাইরের লোকদের হাতের ইশারাই ডাকতে থাকি। উদ্ধার কর্মীরা সেখানে পৌঁছে দেয়াল কেটে আমাদের বাইরে বের করে নিয়ে আসে।' আলবার্ট মুরমুর তথ্য মতে পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করত পেতেতুয়া, শেফালি, শিখা, মেরিনা, মনিকা, খ্রিস্টানা, তেরেজাসহ ১০ জন আদিবাসী পোশাক শ্রমিক। এদের মধ্যে তিনজনকে দুর্ঘটনার পর থেকে আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সহকর্মী ও পরিবারের মতে তারা নিহত হয়েছে। মনিকা নামে একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে তিনি এখন সিআরপি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর অন্য শ্রমিকরা গুরুতর আহত হয়েছে।

পেতেতুয়া হাঁসদা

শাখইডাঙা গ্রামের বিরল থানার দিনাজপুর জেলার সান্তাল সমপ্রদায়ের অধিবাসী পেতেতুয়া হাঁসদা (২২)। পিতা রাফায়েল হাঁসদা ও মাতা চিচিলিয়া মুরমু। তিন বোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট। দু'বোনের বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। স্বামী আলবার্ট মুরমুর সঙ্গে সংসার পেতেছিল বছর খানেক আগে। সে সংসারের সব খরচ বহন করত। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গামেন্র্টসে কাজ করতেন মেশিন সুইং অপারেটর হিসেবে, তার অপারেটর আইডি নাম্বার ১২০৭। দুর্ঘটনার দিন স্বামী-স্ত্রী দুজনে কাজে যোগ দিয়েছিল। স্বামী আলবার্ট মুরমু প্রাণে বেঁচে গেলেও পেতেতুয়ার এখন পর্যন্ত কোন খোঁজ মেলেনি। দুর্ঘটনার দিন সে পরেছিল খয়েরি রঙের সেলোয়ার কামিজ ও গলায় রুপার মালার সঙ্গে ক্রস। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের আবেদনে নাম্বার ৮৮। তাকে খুঁজে না পেয়ে পিতা রাফায়েল হাঁসদা সাভার মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নং-০১৩৮, ক্রমিক নং-৮৮, তারিখ : ২১/০৫/২০১৩। তার পিতার ডিএনএ পরীক্ষার নাম্বার : আইডি-৬-১৩-বিএল-৩০৯। যোগাযোগ নাম্বার : ০১৭৪০২২৯১৩৫।

শেফালি মার্ডী

দিনাজপুর সদররের ভাটপাড়া গ্রামের সান্তাল সমপ্রদায়ের অধিবাসী শেফালি মার্ডী (২৬)। পিতা স্যামুয়েল মার্ডী ও মাতা আগ্নেশ হাঁসদা। তিন বোন ও এক ভাইয়ের সংসারে সে ছিল দ্বিতীয় উপার্জনকারী। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করতেন হেলপার হিসেবে। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের জন্য আবেদনে নাম্বার ৪৬। তাকে খুঁজে না পেয়ে তার পিতা স্যামুয়েল মার্ডী সাভার মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নং-১১২৬, ক্রমিক নং-১৮৪, তারিখ : ২২/০৫/২০১৩। ডিএনএ পরীক্ষার নাম্বার : আইডি-৬-১৩-বি১-৪২০। যোগাযোগ নাম্বার : ০১৭২১৫৪৭৫৫৬।

শিখা হাঁসদাক

রাজশাহী জেলা সদর কলিম নগরের মাহালি সমপ্রদায়ের অধিবাসী শিখা মার্থা হাঁসদাক (২৫)। পিতা রেনাতুস হাঁসদা ও মাতা কসতান্তিনা বাস্কে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ছিল পরিবারের দ্বিতীয় উপার্জনকারী। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গামেন্র্টসে জুনিয়র সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। তার অপারেটর আইডি নাম্বার ছিল ১২০৩। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের আবেদনের নাম্বার ৪৬। তাকে খুঁজে না পেয়ে তার পিতা সাভার মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন, জিডি নাম্বার-১০৩৪। যোগাযোগ নাম্বার : ০১১৯৭০৯৩৭৩০।

বাংলাদেশে পর্যবেক্ষণে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম বিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ক্যারেন হানরান ইতোমধ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও কারখানায় কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে মালিক পক্ষ নিরাপত্তা ও কাজের সুষ্ঠুতার ব্যাপারে আজও আন্তরিক নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম ক্রেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ জিএসপি সুবিধা বাতিলের জন্য চোখ রাঙাচ্ছে। বর্তমান সরকার এই শিল্পকে টিকফা চুক্তির ফলে জিএসপি সুবিধার আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় তৈরি পোশাক খাত কতটুকু শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে তা সরকারের বিবেচনায় রাখার বিষয়।

রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় মহিউদ্দিন খন্দকারকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে জমি বিক্রি করে তা নিহত ও আহতদের সহায়তা করার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তিন দফায় নিহতদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু নিহত আদিবাসী নারী শ্রমিকদের পরিবার আজও পর্যন্ত কোন ক্ষতিপূরণ পায়নি। নিহত তিন আদিবাসী নারী শ্রমিকের পরিবার চলত তাদের আয়ের অর্থ দিয়ে। কিন্তু তাদের পরিবার আজ পর্যন্ত জানে না যে, নিহতদের নাম রানা প্লাজায় দুর্ঘটনায় নিখোঁজ নিহত শ্রমিকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না। সরকার কর্তৃক নিহতদের জন্য প্রদেয় আর্থিক অনুদান তারা কি পাবে? বিজিএমইএ কি পশ্চাৎপদ এসব আদিবাসী নিহত নারী শ্রমিকদের পরিবারের পাশে দাঁড়াবে? সমতল আদিবাসীদের জন্য কাজ করে এমন সংগঠন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, 'সমতলের আদিবাসীরা ভূমি সমস্যার কারণে আজ অনেকে কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। রানা প্লাজায় নিহত আদিবাসী এসব নারী শ্রমিকের পারিশ্রমিকে তাদের পরিবার চলত। নিহত ও আহতদের শনাক্তকরণের মাধ্যমে তাদের নাম সরকার কর্তৃক গৃহীত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি। সরকার ও বিজিএমইএ ঘোষিত আর্থিক ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে এসব আদিবাসী শ্রমিকদের পরিবার যাতে বাদ না যায় সে ব্যাপারে আন্তরিকভাবে সরকারের নজর দেয়া উচিত।'

[লেখক : সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সান্তাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (সাসু)।] - See more at: http://www.thedailysangbad.com/index.php?ref=MjBfMDZfMjBfMTNfMl8yM18xXzEzNDk2MA==#sthash.yxG2wc2T.Vy05X9i7.dpuf
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের মধ্যে অন্যতম। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা আজও মালিক ও রাষ্ট্রপক্ষের কাছ থেকে যথাযথ মূল্যায়ন পায়নি। পোশাক শিল্পের কারখানাকে যদি মানব শরীরের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে শ্রমিকরা হবে শরীরের রক্ত। রক্ত শরীরের অপরিহার্য উপাদান এটি ছাড়া মানুষ মারা যায়। শ্রমিকরাও তেমনি কারখানার প্রাণ, শরীরে রক্ত চলাচলের মতো তারা কারখানাকে গতিশীল রাখে। শ্রমিক ছাড়া কারখানা চলতে পারে না। শ্রমিক অসন্তোষ এর ফলে যে কোন সময় ঘটে যেতে পারে শ্রম বিপ্লব। বন্ধ হয়ে যেতে পারে কারখানা, ধ্বংস হয়ে যেতে পারে শিল্প। ফলে বাড়বে বেকারত্ব এর প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিককালে দেশে ঘটে যাওয়া তাজরীন গার্মেন্টের অগি্নকা- ও সাভারের রানা প্লাজায় ভবনধস বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ধস নামিয়ে দিয়েছে। পোশাক শিল্পকে অবহেলার কারণে আজ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। গত ২৪ এপ্রিল রান প্লাজার ভবনধস দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যতকেও নড়বড়ে করে দিয়েছে।

বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সংক্রান্ত কাঠামোগত (টিকফা) চুক্তি সাম্প্রতিক এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণে দোদুল্যমান হয়ে পড়েছে। পোশাক শিল্প মার্কিন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাজার (জিএসপি) সুবিধা থেকে আজ বঞ্চিত হওয়ার পথে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পোশাক কারখানা বিশ্ব মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান (আইএসও) কর্তৃক নির্ধারিত কোড অনুসরণ করে না। ফলে ঘটছে তাজরীন ও রানা প্লাজার মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এক্ষেত্রে শুধু পোশাক মালিকদের একতরফাভাবে দোষারোপ করা যায় না। আইএসও কর্তৃক নির্ধারিত কোড অনুসরণ করে না এসব কোম্পানিকেই কাজ দিচ্ছে অনেক বিদেশি ক্রেতা। পোশাক শিল্পে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনার দায় কোন মতেই এড়িয়ে যেতে পারে না সুযোগ সন্ধানী বিদেশি ক্রেতারা। বিশ্ববাজার দখলে রাখা ওয়ালমার্টের মতো কোম্পানির অর্ডার ছিল এসব গার্মেন্টসে। তৃতীয় বিশ্বে মেধাস্বত্ব (ট্রিপস) আইন অমান্য বা পাইরেসি যেখানে টিকফা চুক্তির প্রধান অন্তরায়। সেখানে ওয়ালমার্টের মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি আইএসও স্ট্যান্ডার্ডের নিচে থাকা গার্মেন্টসকে কাজ দেয়াও অযৌক্তিক। ওয়ালমার্ট এই দুর্ঘটনায় শিকার নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের দায় এড়াতে পারে না। পোশাক শিল্পে দুর্ঘটনার এই দায় শিল্প মালিক, সরকার ও বিদেশি ক্রেতাদের।

পোশাক শিল্প বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটা প্রধান খাত। এই শিল্পকে জনগণের সুবিধার্থে প্রসারের জন্য রাষ্ট্র তেমন কোন সুদূরপ্রসারী চিন্তা আজও করেনি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিজিএমই ও বিকেএমই দুই সংগঠনের কাছে আজ জিম্মি। এই দুই সংগঠন মূলত মালিক কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত। শ্রমিকদের জন্য পোশাক শিল্পে সৃষ্টি হয়নি কোন আদর্শ শ্রমিক ইউনিয়ন। যে শ্রমিক ইউনিয়ন শ্রমিকদের স্বার্থে রাষ্ট্র ও মালিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারে। কিন্তু শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার্থে শ্রমিক নেতাদের পোশক শিল্পে ভালো কোন অর্জন নেই।

রানা প্লাজার তৃতীয় থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত পাঁচটি পোশাক কারখানা ছিল। পেতেতুয়া, শেফালি ও শিখা নামের তিন আদিবাসী নারী রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করত। পরিবার আজ অবধি খুঁজে পায়নি তাদের লাশ। বিভিন্ন সূত্র মতে রানা প্লাজার ভবন ধসের ঘটনায় নিহত হয়েছে ১১২৭ জন। এই তালিকায় নিহত তিন আদিবাসী নারী শ্রমিক অন্তর্ভুক্ত কি না তা নিহত পরিবার অজ্ঞাত।

রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় কাজ করত নিহত পেতেতুয়ার স্বামী আলবার্ট মুরমু। সেদিনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া আলবার্ট বলেন, 'সকালে কাজ করার সময় হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শোনামাত্রই সবাই সিঁড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করে। আমার স্ত্রী পেতেতুয়া ও শেফালিকে সিঁড়ির দিকে দৌড়াতে দেখি। কিন্তু আমি ও আরও দুজন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কাজের জায়গায় পড়ে থাকি। সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে। জ্ঞান ফেরার পর ধ্বংসস্তূপের ফোকরে আমরা তিনজন নিজেদের দেখতে পাই। অনেক চেষ্টা করার পর লোহার রড দিয়ে আমরা দেয়ালে একটু ফুটো করে বাইরের লোকদের হাতের ইশারাই ডাকতে থাকি। উদ্ধার কর্মীরা সেখানে পৌঁছে দেয়াল কেটে আমাদের বাইরে বের করে নিয়ে আসে।' আলবার্ট মুরমুর তথ্য মতে পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করত পেতেতুয়া, শেফালি, শিখা, মেরিনা, মনিকা, খ্রিস্টানা, তেরেজাসহ ১০ জন আদিবাসী পোশাক শ্রমিক। এদের মধ্যে তিনজনকে দুর্ঘটনার পর থেকে আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সহকর্মী ও পরিবারের মতে তারা নিহত হয়েছে। মনিকা নামে একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে তিনি এখন সিআরপি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর অন্য শ্রমিকরা গুরুতর আহত হয়েছে।

পেতেতুয়া হাঁসদা

শাখইডাঙা গ্রামের বিরল থানার দিনাজপুর জেলার সান্তাল সমপ্রদায়ের অধিবাসী পেতেতুয়া হাঁসদা (২২)। পিতা রাফায়েল হাঁসদা ও মাতা চিচিলিয়া মুরমু। তিন বোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট। দু'বোনের বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। স্বামী আলবার্ট মুরমুর সঙ্গে সংসার পেতেছিল বছর খানেক আগে। সে সংসারের সব খরচ বহন করত। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গামেন্র্টসে কাজ করতেন মেশিন সুইং অপারেটর হিসেবে, তার অপারেটর আইডি নাম্বার ১২০৭। দুর্ঘটনার দিন স্বামী-স্ত্রী দুজনে কাজে যোগ দিয়েছিল। স্বামী আলবার্ট মুরমু প্রাণে বেঁচে গেলেও পেতেতুয়ার এখন পর্যন্ত কোন খোঁজ মেলেনি। দুর্ঘটনার দিন সে পরেছিল খয়েরি রঙের সেলোয়ার কামিজ ও গলায় রুপার মালার সঙ্গে ক্রস। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের আবেদনে নাম্বার ৮৮। তাকে খুঁজে না পেয়ে পিতা রাফায়েল হাঁসদা সাভার মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নং-০১৩৮, ক্রমিক নং-৮৮, তারিখ : ২১/০৫/২০১৩। তার পিতার ডিএনএ পরীক্ষার নাম্বার : আইডি-৬-১৩-বিএল-৩০৯। যোগাযোগ নাম্বার : ০১৭৪০২২৯১৩৫।

শেফালি মার্ডী

দিনাজপুর সদররের ভাটপাড়া গ্রামের সান্তাল সমপ্রদায়ের অধিবাসী শেফালি মার্ডী (২৬)। পিতা স্যামুয়েল মার্ডী ও মাতা আগ্নেশ হাঁসদা। তিন বোন ও এক ভাইয়ের সংসারে সে ছিল দ্বিতীয় উপার্জনকারী। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করতেন হেলপার হিসেবে। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের জন্য আবেদনে নাম্বার ৪৬। তাকে খুঁজে না পেয়ে তার পিতা স্যামুয়েল মার্ডী সাভার মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নং-১১২৬, ক্রমিক নং-১৮৪, তারিখ : ২২/০৫/২০১৩। ডিএনএ পরীক্ষার নাম্বার : আইডি-৬-১৩-বি১-৪২০। যোগাযোগ নাম্বার : ০১৭২১৫৪৭৫৫৬।

শিখা হাঁসদাক

রাজশাহী জেলা সদর কলিম নগরের মাহালি সমপ্রদায়ের অধিবাসী শিখা মার্থা হাঁসদাক (২৫)। পিতা রেনাতুস হাঁসদা ও মাতা কসতান্তিনা বাস্কে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ছিল পরিবারের দ্বিতীয় উপার্জনকারী। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গামেন্র্টসে জুনিয়র সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। তার অপারেটর আইডি নাম্বার ছিল ১২০৩। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের আবেদনের নাম্বার ৪৬। তাকে খুঁজে না পেয়ে তার পিতা সাভার মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন, জিডি নাম্বার-১০৩৪। যোগাযোগ নাম্বার : ০১১৯৭০৯৩৭৩০।

বাংলাদেশে পর্যবেক্ষণে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম বিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ক্যারেন হানরান ইতোমধ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও কারখানায় কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে মালিক পক্ষ নিরাপত্তা ও কাজের সুষ্ঠুতার ব্যাপারে আজও আন্তরিক নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম ক্রেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ জিএসপি সুবিধা বাতিলের জন্য চোখ রাঙাচ্ছে। বর্তমান সরকার এই শিল্পকে টিকফা চুক্তির ফলে জিএসপি সুবিধার আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় তৈরি পোশাক খাত কতটুকু শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে তা সরকারের বিবেচনায় রাখার বিষয়।

রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় মহিউদ্দিন খন্দকারকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে জমি বিক্রি করে তা নিহত ও আহতদের সহায়তা করার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তিন দফায় নিহতদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু নিহত আদিবাসী নারী শ্রমিকদের পরিবার আজও পর্যন্ত কোন ক্ষতিপূরণ পায়নি। নিহত তিন আদিবাসী নারী শ্রমিকের পরিবার চলত তাদের আয়ের অর্থ দিয়ে। কিন্তু তাদের পরিবার আজ পর্যন্ত জানে না যে, নিহতদের নাম রানা প্লাজায় দুর্ঘটনায় নিখোঁজ নিহত শ্রমিকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না। সরকার কর্তৃক নিহতদের জন্য প্রদেয় আর্থিক অনুদান তারা কি পাবে? বিজিএমইএ কি পশ্চাৎপদ এসব আদিবাসী নিহত নারী শ্রমিকদের পরিবারের পাশে দাঁড়াবে? সমতল আদিবাসীদের জন্য কাজ করে এমন সংগঠন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, 'সমতলের আদিবাসীরা ভূমি সমস্যার কারণে আজ অনেকে কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। রানা প্লাজায় নিহত আদিবাসী এসব নারী শ্রমিকের পারিশ্রমিকে তাদের পরিবার চলত। নিহত ও আহতদের শনাক্তকরণের মাধ্যমে তাদের নাম সরকার কর্তৃক গৃহীত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি। সরকার ও বিজিএমইএ ঘোষিত আর্থিক ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে এসব আদিবাসী শ্রমিকদের পরিবার যাতে বাদ না যায় সে ব্যাপারে আন্তরিকভাবে সরকারের নজর দেয়া উচিত।'

[লেখক : সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সান্তাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (সাসু)।] - See more at: http://www.thedailysangbad.com/index.php?ref=MjBfMDZfMjBfMTNfMl8yM18xXzEzNDk2MA==#sthash.yxG2wc2T.Vy05X9i7.dpuf
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের মধ্যে অন্যতম। এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা আজও মালিক ও রাষ্ট্রপক্ষের কাছ থেকে যথাযথ মূল্যায়ন পায়নি। পোশাক শিল্পের কারখানাকে যদি মানব শরীরের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে শ্রমিকরা হবে শরীরের রক্ত। রক্ত শরীরের অপরিহার্য উপাদান এটি ছাড়া মানুষ মারা যায়। শ্রমিকরাও তেমনি কারখানার প্রাণ, শরীরে রক্ত চলাচলের মতো তারা কারখানাকে গতিশীল রাখে। শ্রমিক ছাড়া কারখানা চলতে পারে না। শ্রমিক অসন্তোষ এর ফলে যে কোন সময় ঘটে যেতে পারে শ্রম বিপ্লব। বন্ধ হয়ে যেতে পারে কারখানা, ধ্বংস হয়ে যেতে পারে শিল্প। ফলে বাড়বে বেকারত্ব এর প্রভাব পড়বে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিককালে দেশে ঘটে যাওয়া তাজরীন গার্মেন্টের অগি্নকা- ও সাভারের রানা প্লাজায় ভবনধস বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ধস নামিয়ে দিয়েছে। পোশাক শিল্পকে অবহেলার কারণে আজ বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের বাজার সংকুচিত হয়ে আসছে। গত ২৪ এপ্রিল রান প্লাজার ভবনধস দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ভবিষ্যতকেও নড়বড়ে করে দিয়েছে।

বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সংক্রান্ত কাঠামোগত (টিকফা) চুক্তি সাম্প্রতিক এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণে দোদুল্যমান হয়ে পড়েছে। পোশাক শিল্প মার্কিন বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাজার (জিএসপি) সুবিধা থেকে আজ বঞ্চিত হওয়ার পথে। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পোশাক কারখানা বিশ্ব মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান (আইএসও) কর্তৃক নির্ধারিত কোড অনুসরণ করে না। ফলে ঘটছে তাজরীন ও রানা প্লাজার মতো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এক্ষেত্রে শুধু পোশাক মালিকদের একতরফাভাবে দোষারোপ করা যায় না। আইএসও কর্তৃক নির্ধারিত কোড অনুসরণ করে না এসব কোম্পানিকেই কাজ দিচ্ছে অনেক বিদেশি ক্রেতা। পোশাক শিল্পে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনার দায় কোন মতেই এড়িয়ে যেতে পারে না সুযোগ সন্ধানী বিদেশি ক্রেতারা। বিশ্ববাজার দখলে রাখা ওয়ালমার্টের মতো কোম্পানির অর্ডার ছিল এসব গার্মেন্টসে। তৃতীয় বিশ্বে মেধাস্বত্ব (ট্রিপস) আইন অমান্য বা পাইরেসি যেখানে টিকফা চুক্তির প্রধান অন্তরায়। সেখানে ওয়ালমার্টের মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি আইএসও স্ট্যান্ডার্ডের নিচে থাকা গার্মেন্টসকে কাজ দেয়াও অযৌক্তিক। ওয়ালমার্ট এই দুর্ঘটনায় শিকার নিহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের দায় এড়াতে পারে না। পোশাক শিল্পে দুর্ঘটনার এই দায় শিল্প মালিক, সরকার ও বিদেশি ক্রেতাদের।

পোশাক শিল্প বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটা প্রধান খাত। এই শিল্পকে জনগণের সুবিধার্থে প্রসারের জন্য রাষ্ট্র তেমন কোন সুদূরপ্রসারী চিন্তা আজও করেনি। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বিজিএমই ও বিকেএমই দুই সংগঠনের কাছে আজ জিম্মি। এই দুই সংগঠন মূলত মালিক কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত। শ্রমিকদের জন্য পোশাক শিল্পে সৃষ্টি হয়নি কোন আদর্শ শ্রমিক ইউনিয়ন। যে শ্রমিক ইউনিয়ন শ্রমিকদের স্বার্থে রাষ্ট্র ও মালিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারে। কিন্তু শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার্থে শ্রমিক নেতাদের পোশক শিল্পে ভালো কোন অর্জন নেই।

রানা প্লাজার তৃতীয় থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত পাঁচটি পোশাক কারখানা ছিল। পেতেতুয়া, শেফালি ও শিখা নামের তিন আদিবাসী নারী রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করত। পরিবার আজ অবধি খুঁজে পায়নি তাদের লাশ। বিভিন্ন সূত্র মতে রানা প্লাজার ভবন ধসের ঘটনায় নিহত হয়েছে ১১২৭ জন। এই তালিকায় নিহত তিন আদিবাসী নারী শ্রমিক অন্তর্ভুক্ত কি না তা নিহত পরিবার অজ্ঞাত।

রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় কাজ করত নিহত পেতেতুয়ার স্বামী আলবার্ট মুরমু। সেদিনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া আলবার্ট বলেন, 'সকালে কাজ করার সময় হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শোনামাত্রই সবাই সিঁড়ির দিকে দৌড়াতে শুরু করে। আমার স্ত্রী পেতেতুয়া ও শেফালিকে সিঁড়ির দিকে দৌড়াতে দেখি। কিন্তু আমি ও আরও দুজন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কাজের জায়গায় পড়ে থাকি। সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে। জ্ঞান ফেরার পর ধ্বংসস্তূপের ফোকরে আমরা তিনজন নিজেদের দেখতে পাই। অনেক চেষ্টা করার পর লোহার রড দিয়ে আমরা দেয়ালে একটু ফুটো করে বাইরের লোকদের হাতের ইশারাই ডাকতে থাকি। উদ্ধার কর্মীরা সেখানে পৌঁছে দেয়াল কেটে আমাদের বাইরে বের করে নিয়ে আসে।' আলবার্ট মুরমুর তথ্য মতে পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করত পেতেতুয়া, শেফালি, শিখা, মেরিনা, মনিকা, খ্রিস্টানা, তেরেজাসহ ১০ জন আদিবাসী পোশাক শ্রমিক। এদের মধ্যে তিনজনকে দুর্ঘটনার পর থেকে আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সহকর্মী ও পরিবারের মতে তারা নিহত হয়েছে। মনিকা নামে একজনকে উদ্ধার করা হয়েছে তিনি এখন সিআরপি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর অন্য শ্রমিকরা গুরুতর আহত হয়েছে।

পেতেতুয়া হাঁসদা

শাখইডাঙা গ্রামের বিরল থানার দিনাজপুর জেলার সান্তাল সমপ্রদায়ের অধিবাসী পেতেতুয়া হাঁসদা (২২)। পিতা রাফায়েল হাঁসদা ও মাতা চিচিলিয়া মুরমু। তিন বোনের মধ্যে সে ছিল সবার ছোট। দু'বোনের বিয়ে হয়েছে অনেক আগে। স্বামী আলবার্ট মুরমুর সঙ্গে সংসার পেতেছিল বছর খানেক আগে। সে সংসারের সব খরচ বহন করত। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গামেন্র্টসে কাজ করতেন মেশিন সুইং অপারেটর হিসেবে, তার অপারেটর আইডি নাম্বার ১২০৭। দুর্ঘটনার দিন স্বামী-স্ত্রী দুজনে কাজে যোগ দিয়েছিল। স্বামী আলবার্ট মুরমু প্রাণে বেঁচে গেলেও পেতেতুয়ার এখন পর্যন্ত কোন খোঁজ মেলেনি। দুর্ঘটনার দিন সে পরেছিল খয়েরি রঙের সেলোয়ার কামিজ ও গলায় রুপার মালার সঙ্গে ক্রস। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের আবেদনে নাম্বার ৮৮। তাকে খুঁজে না পেয়ে পিতা রাফায়েল হাঁসদা সাভার মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নং-০১৩৮, ক্রমিক নং-৮৮, তারিখ : ২১/০৫/২০১৩। তার পিতার ডিএনএ পরীক্ষার নাম্বার : আইডি-৬-১৩-বিএল-৩০৯। যোগাযোগ নাম্বার : ০১৭৪০২২৯১৩৫।

শেফালি মার্ডী

দিনাজপুর সদররের ভাটপাড়া গ্রামের সান্তাল সমপ্রদায়ের অধিবাসী শেফালি মার্ডী (২৬)। পিতা স্যামুয়েল মার্ডী ও মাতা আগ্নেশ হাঁসদা। তিন বোন ও এক ভাইয়ের সংসারে সে ছিল দ্বিতীয় উপার্জনকারী। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গার্মেন্টসে কাজ করতেন হেলপার হিসেবে। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের জন্য আবেদনে নাম্বার ৪৬। তাকে খুঁজে না পেয়ে তার পিতা স্যামুয়েল মার্ডী সাভার মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নং-১১২৬, ক্রমিক নং-১৮৪, তারিখ : ২২/০৫/২০১৩। ডিএনএ পরীক্ষার নাম্বার : আইডি-৬-১৩-বি১-৪২০। যোগাযোগ নাম্বার : ০১৭২১৫৪৭৫৫৬।

শিখা হাঁসদাক

রাজশাহী জেলা সদর কলিম নগরের মাহালি সমপ্রদায়ের অধিবাসী শিখা মার্থা হাঁসদাক (২৫)। পিতা রেনাতুস হাঁসদা ও মাতা কসতান্তিনা বাস্কে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ছিল পরিবারের দ্বিতীয় উপার্জনকারী। রানা প্লাজার পঞ্চম তলার ফ্যান্টমটেক লিমিটেড গামেন্র্টসে জুনিয়র সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন। তার অপারেটর আইডি নাম্বার ছিল ১২০৩। ইউএনও'র কাছে নিহত তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের আবেদনের নাম্বার ৪৬। তাকে খুঁজে না পেয়ে তার পিতা সাভার মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন, জিডি নাম্বার-১০৩৪। যোগাযোগ নাম্বার : ০১১৯৭০৯৩৭৩০।

বাংলাদেশে পর্যবেক্ষণে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শ্রম বিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ক্যারেন হানরান ইতোমধ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে শ্রমিকদের সংগঠন করার স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও কারখানায় কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে মালিক পক্ষ নিরাপত্তা ও কাজের সুষ্ঠুতার ব্যাপারে আজও আন্তরিক নয়। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম ক্রেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজ জিএসপি সুবিধা বাতিলের জন্য চোখ রাঙাচ্ছে। বর্তমান সরকার এই শিল্পকে টিকফা চুক্তির ফলে জিএসপি সুবিধার আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় তৈরি পোশাক খাত কতটুকু শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে তা সরকারের বিবেচনায় রাখার বিষয়।

রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় মহিউদ্দিন খন্দকারকে প্রধান করে গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে জমি বিক্রি করে তা নিহত ও আহতদের সহায়তা করার ব্যাপারে মত দিয়েছেন। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে তিন দফায় নিহতদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু নিহত আদিবাসী নারী শ্রমিকদের পরিবার আজও পর্যন্ত কোন ক্ষতিপূরণ পায়নি। নিহত তিন আদিবাসী নারী শ্রমিকের পরিবার চলত তাদের আয়ের অর্থ দিয়ে। কিন্তু তাদের পরিবার আজ পর্যন্ত জানে না যে, নিহতদের নাম রানা প্লাজায় দুর্ঘটনায় নিখোঁজ নিহত শ্রমিকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না। সরকার কর্তৃক নিহতদের জন্য প্রদেয় আর্থিক অনুদান তারা কি পাবে? বিজিএমইএ কি পশ্চাৎপদ এসব আদিবাসী নিহত নারী শ্রমিকদের পরিবারের পাশে দাঁড়াবে? সমতল আদিবাসীদের জন্য কাজ করে এমন সংগঠন জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, 'সমতলের আদিবাসীরা ভূমি সমস্যার কারণে আজ অনেকে কাজের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। রানা প্লাজায় নিহত আদিবাসী এসব নারী শ্রমিকের পারিশ্রমিকে তাদের পরিবার চলত। নিহত ও আহতদের শনাক্তকরণের মাধ্যমে তাদের নাম সরকার কর্তৃক গৃহীত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবি জানাচ্ছি। সরকার ও বিজিএমইএ ঘোষিত আর্থিক ক্ষতিপূরণের ক্ষেত্রে এসব আদিবাসী শ্রমিকদের পরিবার যাতে বাদ না যায় সে ব্যাপারে আন্তরিকভাবে সরকারের নজর দেয়া উচিত।'

[লেখক : সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সান্তাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (সাসু)।] - See more at: http://www.thedailysangbad.com/index.php?ref=MjBfMDZfMjBfMTNfMl8yM18xXzEzNDk2MA==#sthash.yxG2wc2T.Vy05X9i7.dpuf
খোকন সুইটেন মুরমু
খোকন সুইটেন মুরমু
Share:

Sunday, June 23, 2013

সাঁওতালদের কারামপুরাণ

সালেক খোকন, সময়টা, শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার তিথি। কারামপূজার দিন। সন্ধ্যা হতেই সাঁওতাল পাড়াটিতে থেমে থেমেই বাজছিল ঢোল-মাদল। কারামগাছের ডাল কেটে এনে পুঁতে দেওয়া হয়েছে গ্রামপ্রধানের বাড়ির উঠানে। ডালের চারপাশে বাঁশের ঘের এবং তাতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে শাপলাফুল। ফুল ছিটিয়ে প্রণাম আর লাল মুরগি বলি দেওয়া হয়েছে এরই মধ্যে। অতঃপর শুরু হয় কারামপুরাণ পাঠের আসর।

দিনাজপুরের মহেশপুর গ্রাম। সাঁওতাল আদিবাসীদের বাস এখানটায়। আদিবাসী এ গ্রামের প্রধানের নাম বাঠু সরেন। সবাই ঘিরে বসে তাঁকে। কারাম গোঁসাইকে স্মরণের অংশ হিসেবে তিনি শোনান কারাম কাহিনিটি। কাহিনিতে কারাম গোঁসাইয়ের নাম উঠলেই সাঁওতাল নারীরা মুঠো মুঠো জুঁই ফুল ছুড়ে দেয় কারাম ডালের দিকে। সবার সঙ্গে আমরাও শুনি সাঁওতালদের কারামপুরাণের কাহিনিটি। ‘যমজ দুই ভাই কার্মু ও ধার্মু। কার্মু বড়। ধার্মু ছোট। তাদের বয়স যখন দশ তখন তাদের বাবা মারা যায়। ফলে চরম দারিদ্র্য নেমে আসে পরিবারটিতে। দুই ভাই তখন ভিক্ষা করে জীবন চালায়।


একদিন তারা ভিক্ষা করতে যায় চাম্পাগড় ও চায়নগরে। সে দিন প্রখর রোদ ছিল। ফলে দুই ভাই বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়ে। চাম্পাগড়ের খুব কাছেই ছিল একটি নদী। নদীর ধারে ছিল একটি কদমগাছ। ক্লান্ত ধার্মু গা এলিয়ে দিল সে গাছের ছায়াতলে। ঘুমের মধ্যে তাকে দেখা দেন ‘কারাম গোঁসাই’। বললেন, ‘ওহে ধার্মু, কত দিন আর এভাবে ভিক্ষা করবে। কারামগাছের ডাল পুঁতে কারামপাতার মাদল তৈরি কর, তিনবার গড় হয়ে তা প্রণাম কর এবং ওই ডালের চারদিকে ঘুরে ঘুরে নাচতে থাক।’ আরও বললেন, ‘কদমগাছের নিকট আছে একটি গাভি। পাথরের চাতালে বেনাঘাসের মাঠে আছে মাথায় বাঁধার একখানা কাপড়। আর নদীর ধারের ডুংরীতে বাঁশের ঝাড়ে রাখা আছে একটি বাঁশি। সেগুলো তুমি নিয়ে যাও আর প্রতিদিন নদীর ধারে এসে কারামডাল পুঁতে আমাকে পূজা দাও। তাহলে আমি তোমাদের অনেক বেশি বেশি ধন দেব।’ ঘুম ভাঙতেই ধার্মু দেখল, নদীর ধারে সত্যিই একটি কারামগাছ। স্বপ্নে পাওয়া নির্দেশমতোই সে ওই গাছের ডাল ভেঙে মাটিতে পুঁতে তিনবার গড় হয়ে প্রণাম ও নমস্কার করে। অতঃপর চারদিকে ঘুরে ঘুরে নাচতে থাকে। হঠাৎ সে দেখল তার কাছে চলে এসেছে একটি গাই গ রু। গাইটিকে সঙ্গে নিয়ে, ডুংরীর বাঁশের ঝাড় থেকে বাঁশি নামিয়ে, বেনাঘাসের ওপর থেকে পাওয়া কাপড় দিয়ে মাথায় পাগড়ি বেঁধে, সে ফিরল বাড়িতে। এভাবেই ধার্মু প্রতিদিন নদীর পাড়ে এসে কারামগাছের ডাল পুঁতে প্রণাম করে আর চারপাশে ঘুরে ঘুরে কারাম গোঁসাইকে স্মরণ করে। সঙ্গে থাকে ওই বাঁশি আর পাগড়ি। এতে দিনে দিনে তার গরু বাছুরের সংখ্যা যায় বেড়ে। সে হয়ে ওঠে সম্পদশালী। একবার ভাই কার্মু ছোট ভাইয়ের রাখালি দেখতে গেল মাঠে। আড়ালে দাঁড়িয়ে সে দেখল, ধার্মু নদীর ধারে কারামডাল পুঁতে কারামপাতার মাদল মাথায় নিয়ে ঘুরে ঘুরে নাচছে। আর তার দিকে তাকিয়ে আছে একটি গাই গরু। এ দৃশ্য দেখে কার্মুর হিংসে হলো। বাঁ হাত দিয়ে সে ওই কারামডালটি উপড়ে ফেলল। অতঃপর তা বাড়িতে এনে ফুটন্ত দুধে ডুবিয়ে নদীর জলে ডালটিকে নিক্ষেপ করল। ওই ঘটনার পর থেকে তাদের জমিতে ধান হলো না। গরু-বাছুরগুলোও গেল মরে। ফলে তারা ধীরে ধীরে আবারও দরিদ্র হয়ে পড়ল। সে সময় দুই ভাই গেল ধান রোপণের কাজে এক ধনীর বাড়িতে। কাজের ফাঁকে সবাইকে মুড়ি খেতে দেওয়া হলো। কিন্তু অন্যদের দিতে দিতেই মুড়ি শেষ হয়ে গেল। ফলে নাওয়া-খাওয়া ছাড়াই কার্মু ও ধার্মু দিনভর ধান রোপণ করল। শেষে গেল মজুরি আনতে। কিন্তু এবারও ঘটল একই ঘটনা। অন্যদের দিতে দিতেই টাকা গেল ফুরিয়ে। মালিক বললেন, ‘আজ টাকা শেষ, তোমরা টাকা পাবে কাল।’ কথা শুনে দুই ভাই বড়ই কষ্ট পেল। ‘মজুরি না পেলে আমাদের লাগানো চারা সব তুলে দেব’- এমন সিদ্ধান্ত নিয়েই তারা মাঠের দিকে ছুটল। সে সময় পথে তাদের দেখা হলো এক বৃদ্ধের সঙ্গে। বৃদ্ধ দুই ভাইকে থামালেন। সব শুনে তিনি বললেন, ‘কারাম গোঁসাইকে বাঁ হাত দিয়ে ভাসিয়ে দেওয়ার জন্যই তোমাদের এক কষ্ট।’ তিনি কার্মু ও ধার্মুকে নির্দেশ দিয়ে বললেন, ‘জালাপুরী দ্বীপের চন্দন জঙ্গলে পাবে কারাম গোঁসাইকে। আজই তাকে খুঁজে আন। নইলে সপরিবারে অনাহারে মরবে।’ কথাগুলো বলেই ওই বৃদ্ধ অদৃশ্য হয়ে গেল। দুই ভাই তখন নিজেদের ভুল বুঝতে পারল। পেটে খিদে নিয়ে তারা কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে পড়ল কারাম গোঁসাইয়ের খোঁজে। যেতে যেতে তারা পৌঁছাল উজারডি গ্রামে। সেখানকার এক কাঁঠালগাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিল কার্মু ও ধার্মু। হঠাৎ কাঁঠালগাছটি তাদের প্রশ্ন করল, ‘তোমরা কোথায় যাচ্ছ হে?’ জবাবে ধার্মু বলল, ‘আমরা কারাম গোঁসাইকে খুঁজতে যাচ্ছি।’ শুনে, কাঁঠালগাছ অনুরোধ করে বলল, ‘এ গাছের নিচে বহুদিন ধরে যে টাকা পোঁতা আছে, আমি আর সেই টাকা দেখাশোনা করতে পারব না। কারাম গোঁসাইয়ের দেখা পেলে আমার কথাটাও একটু বলো।’ সেখান থেকে দুই ভাই এলো ঝলদা গ্রামে। সে গ্রামে ছিল এক ধনী লোক। তিনি কার্মু ও ধার্মুকে জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা কোথায় যাও ভাই?’ উত্তরে তারা বলে, ‘আমরা কারাম গোঁসাইকে খুঁজতে বের হয়েছি।’ লোকটি বিনয়ের সঙ্গে বলল, ‘আমি আর ধন জমিয়ে রাখতে পারছি না। তোমরা আমার কথাটিও তাকে বলে দিয়ো।’ দুই ভাইয়ের পেটে খিতে। অথচ ওই গ্রামেও তারা পেল না কোনো খাবার। ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদতে কাঁদতে তারা এলো অযোদিয়া গ্রামে। এ গ্রামে ছিল এক ধনী গোয়াল। তার সঙ্গে দেখা হতেই তিনি প্রশ্ন করেন, ‘তোমরা কোথায় যাচ্ছ হে?’ কার্মু ও ধার্মুর জবাব শুনে তিনি অনুরোধ করে বলেন, ‘কারাম গোঁসাইকে বলে দিয়ো, আমি আর বেশি গরু গোয়ালে রাখতে পারছি না। তাদের গোবর ফেলতে ফেলতে আমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠছি। এত গরু পোষা আর সম্ভব নয়।’ গোয়ালের কথা শুনে দুই ভাই সামনে এগোতে থাকল। কিছুদূর যেতেই পথে পড়ল খর¯্রােতা এক নদী। নদীর নাম গাংনদী। সে নদীর একটি রাঘব বোয়াল মাছ কার্মু ও ধার্মুকে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাওয়া হচ্ছে ভাই।’ তারা আগের মতোই জবাব দিল। শুনে বোয়াল মাছ দুঃখ করে বলে, ‘এ জন্মে আমি অনেক কষ্ট পেয়েছি। আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না। আমার যেন তাড়াতাড়ি মরণ হয়। কারাম গোঁসাইয়ের দেখা পেলে তাকে আমার কথাটিও বলো।’ দুই ভাই সেখান থেকে এলো জালাপুরী সাগরের কাছে। বিশাল ও উত্তাল সাগর তারা কীভাবে পার হবে? এই ভেবে কার্মু ও ধার্মু সাগরপাড়ে বসেই কাঁদতে কাঁদতে গাইল: (যার ভাবার্থ) কারাম মাগো দয়া করো মাগো আমাদের কারাম মাগো তুমিই দিশা দাও আমাদের কারাম মাগো কারাম গোঁসাই কারাম মাগো এই জালাপুরী পার হতে না পারলে কারাম মাগো এই জলার জলেতে কারাম মাগো প্রাণ বিসর্জন দেবো আমরা। দুই ভাইয়ের কান্না শুনে সাগরপাড়ে আসে এক কুমির। সব শুনে কুমির তাদের জালাপুরী পার করিয়ে দিতে রাজি হয়। কার্মু ও ধার্মু তখন কুমিরের পিঠে চড়ে বসে। যেতে যেতে কুমির বলে তার দুঃখের কথাটি, ‘আমি কোনো কিছু ধরতে গেলেই তা পালিয়ে যায়। কারাম গোঁসাইকে একটু বলো, আমার শিকার যেন আর মুখ থেকে ফসকে যেতে না পারে।’ জালাপুরী পার হয়ে কার্মু ও ধার্মু পৌঁছে গেল চন্দন পাহাড়ের বনে। সেখানে সোনার সিংহাসনে বসে ছিলেন কারাম গোঁসাই। ক্ষুধার্ত দুই ভাইকে দেখে তার দয়া হলো। প্রথমেই কারাম গোঁসাই তাদের সুমিষ্ট ফল খেতে দিলেন। অতঃপর তিনি অবশ্যই তাদের কাছে ফিরে যাবেন- এমন প্রতিশ্রুতি দিলেন দুই ভাইকে। কারাম গোঁসাইয়ের উদ্দেশে কার্মু ও ধার্মু একে একে বলেন কাঁঠালগাছ, গোয়ালা, ধনী লোক, রাঘব বোয়াল ও কুমিরের মিনতিগুলো। সব শুনে কাঁঠালগাছের বিষয়ে কারাম গোঁসাই বলেন, ‘পুঁতে রাখা ওই টাকাগুলো তোমাদের। তোমরা সঙ্গে করে নিয়ে যেয়ো।’ গোয়ালার কথা উঠতেই বললেন, ‘তাকে বলে দিয়ো, আর একবার গরুর গোয়ালে ঝাঁটা দিয়ে পরিষ্কার করে সে যেন চলে যায়। ফেরার পথে ওই গরুগুলো তোমরাই নিয়ে যেয়ো।’ ধনী লোকের আকুতির উত্তরে কারাম গোঁসাই বলেন, ‘ওকে বলে দিয়ো, উনুনে ভাতের এঁটো ঢুকিয়ে আর ভাতের হাঁড়িতে ভাত বসিয়ে জ্বালানি কাঠ যেন পা দিয়ে ঠেলে দেয়। আর তার সব ধন তোমাদের দিলাম।’ রাঘব বোয়ালের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তোমরা তাকে বলে দিয়ো, সে শিগগিরই মাঝ নদীতে মারা যাবে। তার আর কোনো দুঃখ-কষ্ট থাকবে না।’ সব শেষে দুই ভাই জানালেন জালাপুরীর কুমিরের দুঃখের কথা। শুনে কারাম গোঁসাই কার্মু ও ধার্মুকে বলেন, ‘তাকে বলে দিয়ো, আজ থেকে কোনো কিছু সে ধরতে গেলে তা আর পালাতে পারবে না। সে হবে জালাপুরীর রাজা।’ কারাম গোঁসাইয়ের নির্দেশগুলো পথে পথে সবাইকে বলে, দুই ভাই ফিরল বাড়িতে। সঙ্গে আনলো টাকা-পয়সা, ধনসম্পদ আর গরু-বাছুর। এভাবে তারা আবার সম্পদশালী হয়ে উঠল এবং কারাম গোঁসাইয়ের আশীর্বাদে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকল।’ এ ঘটনার পর থেকেই সাঁওতালেরা কারামপূজা পালন করে আসছে। বাঠু সরেনের কথা থামতেই শুরু হয় কারাম নাচ। একদল সাঁওতাল নারী পায়ে পা মিলিয়ে হাত ধরাধরি করে নাচতে থাকে। মাদলের শব্দ ছড়িয়ে পড়ে আকাশে বাতাসে। দিং দাতাং ভেতাং মুড়–ম দাং দাতাং ভেতাং গুড়–ম দাং…। এ দেশে নানা অবহেলা ও বঞ্চনার মাঝে কাটছে সাঁওতাল আদিবাসীদের জীবন। অভাব তাদের নিত্যসঙ্গী। তবু কারামপূজা তাদের অভাবমুক্তি ও সৌভাগ্য লাভের পূজা। তাই এ সময়টাতে সাঁওতাল আদিবাসীরা কার্মু ও ধার্মুর কাহিনির সঙ্গে মিলিয়ে নেয় নিজেদের জীবনের অপূর্ণতাগুলোকে।
Source: http://www.kagoj24.com/?p=191
Share:
Copyright © The Santal Resources Page | Powered by Blogger Theme by Ronangelo