728x90 AdSpace

Latest News

Sunday, November 27, 2016

১১ দিন পর মামলা নিল পুলিশ: সাঁওতালদের আনলেন যাঁরা, উচ্ছেদেও তাঁরা

আশীষ-উর-রহমান ও শাহাবুল শাহীন, গাইবান্ধা থেকে | আপডেট: | প্রিন্ট সংস্করণ
 [  কষ্টের ফসল দেখছেন চরণ টুডু  ]
সাঁওতালপল্লিতে ১১ দিন আগের সংঘাতের রেশ এখনো রয়ে গেছে। স্বজন ও সহায়-সম্পদ হারানোর দগদগে ক্ষত চারদিকে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যাবতীয় গোলমালের মূলে রয়েছে গত ইউপি নির্বাচনে ভোটের রাজনীতি এবং একটি প্রভাবশালী মহলের ভূমি দখলের জন্য সাঁওতালদের প্ররোচনা দেওয়া।
সরেজমিন অনুসন্ধানে সাঁওতাল ও আশপাশের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৩ সাল থেকে সাঁওতালরা খামারের জমিতে চাষাবাদ করার দাবি তুলতে থাকে। তবে তারা সংগঠিত ছিল না। খামারটি সাপমারা ইউনিয়নে। এই ইউনিয়নের বাসিন্দা গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাকিল আহমেদ ২০১৪ সালে সাঁওতালদের আন্দোলনের নেতৃত্ব নেন। তাঁকে সভাপতি ও জাতীয় পার্টির শাজাহান মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করে সাঁওতালদের নিয়ে গঠন করা হয় ‘সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটি’। ৪১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটিতে সাঁওতালদের মধ্যে ফিলিমিন বাস্কে ছিলেন সহসভাপতি। কমিটি দাবি তোলে, খামারে ইক্ষুর বদলে অন্য ফসল চাষ করা হচ্ছে। সে কারণে জমি তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে। উল্লেখ্য, ১৯৫২-৫৪ সালে সাঁওতাল ও আশপাশের মুসলিম-হিন্দুদের কাছ থেকে ১ হাজার ৮৪২ একর জমি সরকার অধিগ্রহণ করে।

এদিকে সাহেবগঞ্জ খামারের জমি চিনিকল কর্তৃপক্ষ চাষাবাদের জন্য লিজ দেয়। চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুল আউয়াল জানান, ২০০৪ সালে চিনিকলে লে-অফ হলে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে জমি লিজ দেওয়া হয়। লিজ গ্রহণকারীরা আখের পাশাপাশি অন্য ফসলও চাষ করত। অধিকাংশ জমির লিজ পান আওয়ামী লীগের সাবেক সাংসদ মনোয়ার হোসেন চৌধুরীর ভাই লিটন চৌধুরী। একটি চাতালও নির্মাণ করা হয়েছিল। এ নিয়ে তখন প্রথম আলোসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সংবাদও প্রকাশিত হয়। ২০১৫ সাল পর্যন্ত লিজ চলছিল।
লিজ গ্রহণকারীরা আখের বদলে অন্য ফসল চাষ করায় এবং তারা সাব-লিজ দেওয়ায় ভূমি উদ্ধার কমিটির নেতৃত্বে সাঁওতালরা ফার্মের জমিতে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে। ভূমি উদ্ধার কমিটির আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে বর্তমান গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সাংসদ আবুল কালাম আজাদও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন বলে স্থানীয় সাঁওতালরা জানান। একটি মহল চেষ্টা করে সাঁওতালদের দিয়ে জায়গা দখল করে চিনিকলকে আবার লিজ ব্যবস্থা চালু করাতে। তারাও সাঁওতালদের সমর্থন জানাতে থাকে। চিনিকলের এমডি জানান, সরকারি জায়গা কোনো ব্যক্তিকে ফিরিয়ে দেওয়ার আইনগত সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে চিনিকলের জায়গা সরকারের কাছে চলে যাবে।
সাঁওতালদের ভূমি উদ্ধারের আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সাংসদ আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংঘর্ষের দিন আমি ছিলাম না। রাজনৈতিকভাবে আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। চিনিকলের জমি কে দখল করল না-করল, তা আমার জানা নেই।’
এই পরিস্থিতিতে চলতি বছরের ৬ জুন সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভূমি উদ্ধার কমিটির সভাপতি শাকিল আহমেদ চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি দলীয় মনোনয়ন পাননি। বড় জয়পুরের সুধীর মুর্মু, লোকাস মুর্মুসহ অনেকে বললেন, শাকিল আহমেদ তাঁদের বুঝিয়েছিলেন, তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে ভূমি উদ্ধার আন্দোলন আরও বেগবান হবে। নির্বাচনে শাকিল বিজয়ী হন। নির্বাচন কমিশনের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ইউনিয়নের ১৪ হাজার ৬৮ ভোটারের মধ্যে সাঁওতাল ভোটার ছিলেন ৩ হাজারের বেশি। সাঁওতাল-অধ্যুষিত কেন্দ্রগুলোতে শাকিল একচেটিয়া ভোট পেয়েছেন। তিনি ৬ হাজার ৬৯৮ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের প্রার্থী তোফাজ্জল পান ২ হাজার ৬৮৪ ভোট। গত ১ জুলাই মাদারপুর, বড় জয়পুর ও ছোট জয়পুর গ্রামের সাঁওতাল এবং জয়পুরহাট, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী সাঁওতালরা সাহেবগঞ্জ খামারের জমিতে রাতারাতি টিনের ছাপরা দিয়ে চারটি বড় আকারের বসতির কাঠামো তৈরি করে। পরে দুই দিনের মধ্যে তাঁরা সাঁওতালপল্লির স্থায়ী বাড়ি থেকে আসবাব, থালাবাসন, গবাদিপশু—এসব এনে বসবাস শুরু করে। চার শতাধিক পরিবার ওঠে এসব ছাপরা ঘরে।
স্থানীয় লোকজন বলেছেন, খামারের জমিতে ঘর তোলার প্রস্তুতি চলছিল আগে থেকেই। চিনিকলের প্রশাসন তাতে বাধাও দিয়েছিল। ইতিমধ্যে ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর শাকিল আহমেদ উদ্ধার কমিটির সঙ্গে নিজের ঘনিষ্ঠতা কমিয়ে দেন। মূল নেতৃত্ব তখন চলে যায় শাহজাহান মিয়া ও ফিলিমিন বাস্কের হাতে। সাঁওতালরা খামারের বিভিন্ন অংশে চাষাবাদ শুরু করে। তারা যৌথ শ্রম ও খরচে ৩৫০ একরে মাষকলাই, ১১৫ একরে পাট ও ১৩৫ একরে রোপা আমন ধান এবং বিচ্ছিন্নভাবে ব্যক্তি উদ্যোগে সবজি চাষ করে।
বসতি ও ফসলের সুরক্ষায় সাঁওতালরা খামারের বিভিন্ন প্রবেশমুখে নিজেরাই পাহারা বাসায়। খামারের মাঠে আশপাশের গ্রামের গবাদি পশুপাখি চরে বেড়াত। সাঁওতালরা অন্যদের পশু ঢোকা বন্ধ করে দেয়। অন্যদের পশু এলে সেগুলো ধরে এনে খোঁয়াড়ে দিতে থাকে। এসব ঘটনায় গ্রামবাসীর সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্প্রীতিতে চিড় ধরে। সাপমারা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মাঠের জায়গায় বসতি গড়ে তোলার পরেই বদলে যেতে থাকে তাদের আচরণ। বহিরাগত সাঁওতালও এসেছিল অনেকে। তারা গ্রামবাসীর গবাদিপশু খোঁয়াড়ে দিত। শেষ দিকে ভূমি উদ্ধার কমিটির সদস্য ছাড়া অন্যদের খামারে ঢুকতে দিত না। এ নিয়ে আশপাশের গ্রামের লোকেরা ওই কমিটির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে।
এই পর্যায়ে চিনিকল কর্তৃপক্ষ খামারের জমি উদ্ধারের কঠোর অবস্থানে চলে যায়। উচ্ছেদের পরিকল্পনা করে। কমিটির সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহমেদ সাঁওতালদের পক্ষ ত্যাগ করে উচ্ছেদকারীদের পক্ষে চলে যান। তবে তিনি কমিটি থেকে পদত্যাগ করেননি। ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায় পুলিশ-র‌্যাবের যৌথ অভিযানে তিনিও অংশ নেন। এ সময় বিপুলসংখ্যক বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসীও উচ্ছেদ অভিযানে অংশ নেয়। এই গ্রামবাসীই মূলত এক রাতে কলাই, পাট ও সবজিখেত ধ্বংস করে দেয়। পরদিনও বিচ্ছিন্নভাবে মূল সাঁওতালপল্লিতে কয়েকটি বাড়িতে হামলা হয়। গবাদিপশু লুট ও ঘরের টিন খুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে।
এদিকে উচ্ছেদ অভিযানের পর থেকে ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান শাকিল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক শাওজাহান মিয়া গা ঢাকা দেন। তাঁদের মুঠোফোন বন্ধ। বাড়িতে খোঁজ নিয়ে তাঁদের পাওয়া যায়নি। সাপমারা ইউপির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চেয়ারম্যান সংঘর্ষের ঘটনার পর থেকে ইউনিয়ন পরিষদে আসেননি।
গত রোববার মাদারপুর গির্জার সামনে প্রধানমন্ত্রীর পাঠানো কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটির কাছে সাঁওতালরা খামারের জমি দখল ও উচ্ছেদের ঘটনায় ইন্ধন দেওয়ার জন্য স্থানীয় সাংসদ ও ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
সাঁওতালদের মামলা নিল পুলিশ
গত বুধবার রাতে সাঁওতালদের পক্ষে মামলা নিয়েছে পুলিশ। সাঁওতালদের পক্ষে স্বপন মুর্মু বাদী হয়ে গোবিন্দগঞ্জ থানায় এ মামলা করেন। এতে সাঁওতালদের ওপর হামলা, ঘরে আগুন, পুরোনো বসতবাড়িতে লুটপাট ও সাঁওতাল হত্যার অভিযোগে অজ্ঞাতনামা ছয় শ জনকে আসামি করা হয়। পুলিশ সন্দেহভাজন পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁরা হলেন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার চকরহিমাপুর গ্রামের মানিক সরকার (২৬) ও বাদশা মিয়া (৫০), তরফকামাল গ্রামের চয়ন মিয়া (২৫) এবং সাহেবগঞ্জ গ্রামের আবদুর রশিদ (৬০) ও শাহনেওয়াজ (৩৮)।
এর আগে সাঁওতাল প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছিলেন, সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে পাঁচটি মামলা করেছে। তাই সবাই পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। পুলিশের ভয়ে তাঁরা মামলা করতে পারছেন না। দেরিতে মামলা নেওয়া প্রসঙ্গে গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুব্রত সরকার বলেন, সাঁওতালরা মামলা দেয়নি। তাই মামলা হয়নি। তিনি বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
মামলা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটির সহসভাপতি ফিলিমিন বাস্কে মুঠোফোনে বলেন, ‘ওই মামলা আমরা করিনি। পুলিশ উৎসাহী হয়ে এই মামলা নেয়।’
সাঁওতালদের ধান কাটতে বা তুলে দিতে হাইকোর্টের নির্দেশ
ঢাকায় নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে উপজেলার সাহেবগঞ্জে অধিগ্রহণ করা জায়গায় সাঁওতালদের চাষ করা ধান কাটতে তাদের অনুমতি দিতে নতুবা চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ধান কেটে সাঁওতালদের কাছে তুলে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), বাংলাদেশ চিনি এবং খাদ্য শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান ও রংপুর সুপার মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রুলসহ আদেশ দেন। ৩০ নভেম্বর পরবর্তী তারিখ রেখেছেন আদালত। একই সঙ্গে গোবিন্দগঞ্জ এলাকার সাঁওতালদের নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্নতা নিশ্চিতসহ তারা যেন মুক্তভাবে তাদের গ্রাম, বাড়ি ও অন্য জায়গায় যেতে ও আসতে পারে, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় প্রশাসনকে বলা হয়েছে। গত বুধবার আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), ব্রতী সামাজিক কল্যাণ সংস্থা ও অ্যাসোসিয়েশন অব ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করে।
জামিন পেলেন দুই সাঁওতাল
আহতাবস্থায় হাসপাতাল থেকে গ্রেপ্তার হওয়া দুই সাঁওতাল বিমল কিসকু ও চরণ সরেনকে গতকাল জামিন দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন গাইবান্ধা জেলা শাখার পক্ষ থেকে গোবিন্দগঞ্জ বিচারিক হাকিম আদালতে তাঁদের জামিনের আবেদন জানানো হয়।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে ভারতীয় উপহাইকমিশনার
রাজশাহীতে ভারতীয় উপহাইকমিশনের উপহাইকমিশনার অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় গতকাল বিকেল সাড়ে চারটায় সাপমারা ইউনিয়নের সাঁওতাল-অধ্যুষিত মাদারপুর ও জয়পুর গ্রাম পরিদর্শন করেন। তিনি সাঁওতালদের খোঁজখবর নেন।


 
  • Blogger Comments
  • Facebook Comments

0 comments:

Post a Comment

Item Reviewed: ১১ দিন পর মামলা নিল পুলিশ: সাঁওতালদের আনলেন যাঁরা, উচ্ছেদেও তাঁরা Description: Rating: 5 Reviewed By: Tudu Marandy and all
Scroll to Top