Online Santal Resource Page: the Santals identity, clans, living places, culture,rituals, customs, using of herbal medicine, education, traditions ...etc and present status.

The Santal Resource Page: these are all online published sources

Santal Gãota reaḱ onolko ńam lạgit́ SRP khon thoṛ̣a gõṛ̃o ńamoḱa mente ińaḱ pạtiạu ar kạṭić kurumuṭu...

Wednesday, November 23, 2016

প্রিয় সাঁওতাল, বাঙালির অনেক শেখার আছে তোমাদের কাছে 0

শারমিন শামস্: ওদের চিনতাম না। জানতাম না। কখনো এত কাছাকাছি যাইনি ওদের। কিন্তু জানতাম, ওরা এমনই, এইরকমই হবে। সুন্দর, নির্মল আর ঝকঝকে। রাস্তায় বসে আছে। খড়ের ওপরে ঘুমোচ্ছে, কলাপাতায় পাত পেড়ে খাচ্ছে, দুইটা কী তিনটা হাঁড়ি-বাসন, তাতেই রাঁধাবাড়া, পরনের একটাই কাপড়।
চারিদিকে ধুলো উড়ছে। তবু কী অসম্ভব ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন ওরা, এতোটুকু ময়লা নেই শরীরে। যেখানে পরিবার নিয়ে এসে আছে, খোলা আকাশের নিচে, সেই জায়গাটাও এতোটুকু নোংরা করেনি। বাচ্চাগুলো পড়ছে গাছতলায় বসে, বইগুলো কী সুন্দর যত্ন করে ধরছে। খাচ্ছে, থালাবাটি চকচক করছে। একজনের খাওয়া শেষ হলে সেটা ধুয়ে এনে দিলে আরেকজন খেতে পারে। পর্যাপ্ত বাসন নেই। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। লুট হয়ে গেছে।
বাড়িই নেই, গেরস্থালীর জিনিস আর কী থাকবে! কেউ কেউ কলাপাতা দিয়ে ঘর বানাবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। একটা পুরোনো স্কুল বিল্ডিংয়ে আশ্রয় নিয়েছে কয়েকটি পরিবার। কেউ কেউ ভাগ্যক্রমে আশ্রয় পেয়েছে আত্মীয় বা প্রতিবেশির ঘরে। আর বাকিরা একেবারেই খোলা আকাশের নিচে, শীত কুয়াশায়, শিশু বৃদ্ধ, নারী পুরুষ- সবাই, ঘরহীন- অথচ ঘর ছিল, জমি ছিল, সংসার ছিল ওদের!
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে গিয়েছিলাম ১৮ তারিখ। নিজেদের যতটুকু সাধ্য তার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে মাত্র তিনদিনে ওদের জন্য টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। সারাদেশে এবং দেশের বাইরে বাস করা হৃদয়বান বাঙালি অগনিত, এ তো আমাদের জানা আছেই। সেই ভরসাতেই উদ্যোগ নেয়া। মাত্র তিনদিনে উঠে এলো প্রায় তিন লক্ষ টাকা। আর অসংখ্য কাপড়-চোপড়। নতুন-পুরাতন মেলানো। শীতের কাপড়ও এলো। যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, অংকুর ইন্টারন্যাশনাল একাই দিল এক লাখ ৮৬ হাজার ১০০ টাকা (২৪০০ ডলার), একজন দিলেন ৫০টা নতুন কম্বল, নতুন পেটিকোট কেনা হলো আর টিশার্ট দিল শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের কিছু ব্যবসায়ী। তারপর যাত্রা শুরু।
এতোদিন পত্রপত্রিকায় টেলিভিশনে সাঁওতালদের দুর্দশার ছবি দেখে আর সংবাদ পড়ে মনটা এক বিষন্নতায় ছেয়ে ছিল। একের পর এক সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে এই এক সংবাদ মনটাকে অস্থির করে তুলেছিল। মনে হতো, লিখে বা প্রতিবাদ জানিয়ে হয়তো কিছু হয়, কিন্তু পাশে দাঁড়ানোটাও খুব জরুরি। যে কোনোভাবেই হোক। ওদের জানাতে হবে, ওদের আমরা আপন ভাবি। ওদের আমরা স্বজাতি ভাবি, পরম আত্মীয় ভাবি। এই বার্তাটুকু ওদের কাছে পৌঁছে দেয়াটা খুব দরকার। যেন ওরা নিজেদের নিজ ভূমে পরবাসী না ভাবে, অনাহুত না ভাবে, সংখ্যালঘু না ভাবে।  
আমাদের টিমটা প্রথমে চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। এতো মানুষ কীভাবে সামাল দেবে! একটা পল্লীতে একখানা চায়ের দোকানের পাশে এক টুকরো জায়গায় ওরা জড়ো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকাও আছে। সেই তালিকা দেখে এক এক করে এসে নিয়ে যাবে টাকা, কম্বল আর কাপড়। আমি টিমের সবার কাছ থেকে একটু আলাদা হয়ে ঘুরছি, দেখছি, ওদের সাথে কথা বলছি আর ছবি তুলছি। প্রায় দুইশ মানুষ বসে আছে এক জায়গায়। বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে বসে আছে বিভিন্ন দিকে।
তিনটি ছবিই তুলেছেন শারমিন শামস্
নাহ, এতটুকু শোরগোল নাই, হৈচৈ চ্যাঁচামেচি, হুটোপুটি কিচ্ছু নেই। কী শান্ত আর নির্মল ওরা। এর আগে বহুস্থানে ত্রাণ বা সাহায্য দিতে দেখেছি। এই আমরা, এই বাঙালিরাই ত্রাণ নেবার সময় যে পরিমাণ বিশৃঙ্খলা আর চিৎকার চ্যাঁচামেচি করি, সে আমার ভালো জানা আছে। কিন্তু ওরা ঠিক বিপরীত। শান্ত, ধীরস্থির, চুপচাপ অপেক্ষা করছে। তারপর যথাসম্ভব শৃঙ্খলার সাথে একে একে এসে নিয়ে গেল।
আমি দূর থেকে মুগ্ধ হয়ে দেখলাম। কালো কালো মানুষের দল, কী অসম্ভব সুন্দর ওরা, কী দৃঢ় আর ঋজু তাদের দেহের ভঙ্গিমা! আমি মুগ্ধ হয়ে দেখছি আর শাটার টিপছি ক্যামেরায়। আর কথা বলছি ফাঁকে ফাঁকে।
ছয় নভেম্বর রাতে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে আগুন। পুড়ে ছাই হয়ে যায় সাঁওতাল পল্লীর সব বাড়িঘর। ভিতরে যেটুকু গরীবের গেরস্থালী সম্পদ ছিল, তাও লুট করে নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। পুলিশের উপস্থিতিতে পুরো হামলার নেতৃত্ব দিয়েছে ‘ইক্ষু খামার ভূমি উদ্ধার সংহতি কমিটি’-র সভাপতি শাকিল আলম বুলবুল। আর পুরো ঘটনার পিছনে আছেন স্থানীয় এমপি আবুল কালাম আজাদের ইন্ধন।
সাহসী সাঁওতালরা স্পষ্ট ভাষায় বলছে হামলাকারীর নাম। ভয় নেই, দ্বিধা নেই। তারা বিচার চায়। আর চায় ফিরে পেতে বাপ দাদার জমি। কোনভাবেই তারা এই জমি ছাড়তে রাজি নয়। পুনর্বাসিত হবার কথা শুনতেও চাইছে না। এই জমির মালিক ওদের পূর্বপুরুষ। এই জমি যখন অধিগ্রহণ করে চিনিকল, তখন শর্ত ছিল আখ চাষ না করে অন্য ফসল চাষ করলে সেই জমি মূল মালিককে ফিরিয়ে দিতে হবে। এরপর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ক্ষমতাধর প্রভাবশালীদের কাছে বহুবছর ধরে এই জমি ইজারা দিয়ে অন্য ফসল ফলিয়েছে। শর্ত ভঙ্গ করেছে। তাই সাঁওতালরা এই জমি আজ ফেরত চায়। তারা এর প্রকৃত মালিক। শর্ত অনুসারে তারা জমি ফিরে পাবার অধিকার রাখে। তাছাড়া অধিগ্রহণকৃত পুরো জমির (এক হাজার ৮৪২ একর) মাত্র শতকরা দশভাগ সাঁওতাল আর কিছু বাঙালির। আর এই দশভাগ জমিই দখল নিতে গিয়েছিল চিনিকলের লোকেরা, পুলিশ আর স্থানীয় নেতাদের সাথে নিয়ে। একসময় এই নেতারাই সাঁওতালদের বুঝিয়েছে, এই জমিতে তাদের অধিকারের কথা। কাগজেপত্রে জমির মালিকানা দেয়ার কথা বলে বহুদিন ধরে টাকাও নিয়েছে। আর আজ তারাই সাঁওতালদের তাদের জমি থেকে উচ্ছেদের জন্য মূল হামলার নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিষয়টি ভয়াবহ।
সাঁওতালদের আত্মসম্মানবোধের কথা শুনেছিলাম লোকমুখে। নিজচোখে দেখে আর নিজ কানে শুনে এলাম। ‘আমরা পুনর্বাসিত ক্যানো হবো? আমরা কি ভিখিরি? আমাদের নিজেদের জমি! বাপদাদার জমি! এই জমি আমাদের অধিকার। এই জমিতে আমরা থিতু হয়েছি, বসত করেছি, ফসল ফলিয়েছি। এই জমিই আমাদের ফিরিয়ে দিতে হবে। আমরা তো দয়া চাইছি না সরকারের কাছে। আমাদের যুক্তির কথা বলছি। সরকার আমাদের কাগজ দেখুক। যাচাই করুক। করে ই ফিরিয়ে দিক আমাদের জমি’।
ওদের কথা শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছিলো আমার। ‘কিচ্ছু নাই গো আপা কিচ্ছু নাই। সব পুড়িয়ে দিয়েছে। কিচ্ছু নাই। এই খোলা আকাশের নিচে এই ঠাণ্ডায় সকলে মিলে আছি আজ ১৪ দিন হলো’। চোখের পানি ঝাপসা করে দিচ্ছিলো আমার লেন্স। আমি এলোমেলো পায়ে হাঁটি। একটি সাঁওতাল মেয়ে, ভারি সুন্দর, কী তেজী ভঙ্গি। এসে দাঁড়ায় আমার মুখোমুখি। বলে, আপা, তুমি ওদের বলে দিও- এই জমির জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি, রক্ত দিছি, এই জমি আমরা ছাড়বো না। বলে দিও’।
আমার পা সরে না। মুখে কোন শব্দ আসে না যে ওকে বলি। ক্যামেরায় চোখ রেখে লুকাই অশ্রুবিন্দু। ঝকঝকে সাঁওতাল পাড়ার পথে পথে ধুলো ওড়ে, শেষ বিকেলের বাতাস বয়। আমি ফিরে আসি। নত মুখ, লজ্জিত, বেদনার্ত, নিরুপায়, অপরাধী! আমাকে যেন এই ধরণীও কৃপা না করে!
অনেক কিছু শেখার আছে এই আদিবাসী মানুষগুলোর কাছে। অনেক অনেক কিছু। দ্বিধাগ্রস্থ, দ্বিধাবিভক্ত, সুযোগসন্ধানী বাঙালি এই আমরা! সাঁওতালের কাছে যেন এই আত্মমর্যাদাবোধ, সাহস আর ঐক্যের শিক্ষা পাই, নির্মলতা আর পরিচ্ছন্নতার সবক নিতে পারি, ঐতিহ্য আর জীবনবোধের পাঠ ওরাই পারে দিতে এই ষোলো কোটি আত্মমগ্ন বোধহীন বাঙালিকে!  

http://womenchapter.com/views/17257
Share:

0 comments:

Post a Comment

Copyright © The Santal Resources Page | Powered by Blogger Theme by Ronangelo