Online Santal Resource Page: the Santals identity, clans, living places, culture,rituals, customs, using of herbal medicine, education, traditions ...etc and present status.

The Santal Resource Page: these are all online published sources

Santal Gãota reaḱ onolko ńam lạgit́ SRP khon thoṛ̣a gõṛ̃o ńamoḱa mente ińaḱ pạtiạu ar kạṭić kurumuṭu...

Sunday, March 30, 2014

সান্তালি বর্ণমালার যৌক্তিকতা এবং শব্দ পরমাণু

সমর মাইকেল সরেন
General Secretary at Santali Wiki Bangladesh
March 29, 2014 at 11:19pm
সান্তালি ভাষার লেখ্যরূপের চর্চার সূচনা হয় ১৮০০ সালের দিকে । কিন্তু কালপ্রবাহে উনিশ শতকের দিকে এসে বর্ণমালা বিতর্কের অঙ্কুরোদগম ঘটে ।বর্তমান ভারতেবর্ষেই কয়েকটি লিপির প্রচলন রয়েছে । অলচিকি,রোমান,বাংলা,দেভনাগরী, উড়িয়া প্রভৃতি । বর্তমানে বিতর্কটি প্রকটাকার ধারণ করছে । বাংলাদেশেও এর ধারা চলে এসেছে ।এই বিতর্কে অনেকেই জড়িয়ে পড়েছেন জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারেই । কিন্তু ভাষার অন্তরীক্ষ দর্শনের জায়গাটি কতটুকু স্থান পেয়েছে এই বিতর্কে তাই বিবেচনার বিষয় । আজ বাংলা,রোমান বা অলচিকি কোনটারই পক্ষপাতিত্ব করতে আসি নি । একটি অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে যুক্তির সন্নিবেশ ঘটানোর প্রচেষ্টামাত্র ।

সান্তালি সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে পাওয়া যায় যে, সান্তালি সাহিত্যগুলো দীর্ঘদিন ধরে মৌখিক সাহিত্যের ওপরই বেঁচে ছিল । বৃটিশভারতেই এই লেখ্যরূপের চর্চা শুরু হয় । এই লেখ্যরূপের সুচনা কিন্তু বাংলা বর্ণমালা দিয়েই ।চিকিৎসক সি আর লেপ্সাস সর্বপ্রথম বাংলা বর্ণমালাটি ব্যবহার করেন এবং পরবর্তীতে তিনিই রোমান হরফের ব্যবহার করেন সান্তালি ভাষার লেখ্যরূপের জন্য । কিন্তু রোমান হরফ সান্তালি প্রকাশের জন্য উপযুক্ত ছিল না তাই তার পরিবর্তন পরিমার্জন করে তৈরি করেনতুল্য(স্ট্যান্ডার্ড) রোমান হরফ যা সান্তালির জন্য উপযুক্ত আর এটিই বর্তমানে প্রচলিত । ইতোপূর্বে দৈনিক প্রথম আলোতে এ সমন্ধীয় আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল । এরপরেও জ্ঞাতর্থে তিনি এই হরফটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন Vocabulary of Santali Language এ ।তৎকালীন বিদেশী মিশনারীরাও বিতর্কে জড়িয়েছিলেন তা জে ত্রইজি এবং পিও বোড্ডিং ও স্ক্রেফস্রুড সাহেবের লেখাগুলোতেও পাওয়া যায় । অপরদিকে বিশ্লেষণ করলে দুটি দৃষ্টিভঙ্গীর সন্ধান পাওয়া যায় একটি হল তাদের সুবিধার্থে রোমান এর আশ্রয় গ্রহণ অর্থাৎ যেহেতু তারা রোমানের সাথে অভ্যস্ত । দ্বিতীয়ত, ভুবনীকরণের জন্য রোমান(যেমনঃইংরেজী) এর প্রয়োজনীয়তা ।কেননা, রোমানকে সংস্কার করেই যেহেতু তুল্য রোমান সান্তালি বর্ণমালা করা হয়েছে তদ্রূপ বাংলাকেও সংস্কার করে তুল্য বাংলা সান্তালি বর্ণমালা করা সম্ভব ছিল । কিন্তু তা করা থেকে বিরত থাকলেন ।


অপরদিকে সান্তালি লেখ্য সাহিত্যের বড় অংশই রোমান সান্তালির সাথে জড়িত । অনেক সান্তালদের শিরায় শিরায় এর অনুপ্রবেশ ঘটেছে । এই বর্ণমালায় বাইবেল প্রকাশিত হওয়ায় তা আরও ব্যাপকতা পেয়ে যায় । ধর্মীয় অনুভূতি জড়িয়ে পড়ে এতে । গড়ে ওঠে সম্ভ্রম । অপরদিকে স্থানীয় ভাষাগুলোর সাথেও পরিচয় ঘটে সান্তালদের ।সেগুলোর সাথেও সম্ভ্রম ঘটে যেমনঃ বাংলা,উড়িয়া, হিন্দী, দেভনাগরী প্রভৃতি। ভুবনগাঁয়ে প্রভাবশালী স্থানীয় ভাষারসাথে পরিচয় ঘটে । এদের সাথে আত্মীয়তার, সখ্যতার এমনকি প্রভু ভৃত্যের পরিচয় ছিল ভারতবর্ষে আদি আর্যদের প্রবেশের পর পরই । বর্তমানে সান্তালি ভাষার ওপর এসব ভাষার ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের পাড়ায় পাড়ায় মাস্তানির প্রভাব উত্তরত্তোর বৃদ্ধি পেয়েই যাচ্ছে । অপরদিকে ভুবনীকরণে(গ্লোবালাইজেশনে) রোমান বর্ণমালার বিস্তর প্রভাব রয়েছে । এর মাস্তানি ঘটছে বিভিন্ন দেশীয় সীমারেখার ভাষাগুলোর ওপর । বাংলা ভাষাও এর ঘায়ে কাবু হয়ে পড়ে অনেক সময় ।কিন্তু এমন পরিস্থিতেও সান্তালি ভাষার ধ্বনিগুলো এগিয়ে যায় বিভিন্ন প্রকার মস্তান ভাষার বর্ণমালা আঁকড়ে ধরে । ভাষা ও বর্ণমালা উভয়ই বিদিশাগ্রস্ত হয় । অবশেষে এরূপ বিদিশাগ্রস্ততা থেকে মুক্ত হতে পন্ডিত রঘুনাথ মূর্মু ১৯২৫ সালে অলচিকি বর্ণমালা তৈরী করেন । এর পূর্বে সাধু রামচাদ মূর্মু ১৯২৩ (মতান্তরে ১৯২১) সালে 'মজ দাঁদের আঁক' তৈরি করেছিলেন । কিন্তু রামচাঁদ এর বর্ণমালাটি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বিকশিত হবার সুযোগটি হারায় । তলিয়ে পড়ে । অপরদিকে অলচিকির উতপত্তিস্থল হল ময়ুরভাঞ্জ । ডক্টর অরুণ ঘোষ অলচিকিতে এই অঞ্চলের উচ্চারণভঙ্গীতার কথা উল্লেখ করেছেন । তাই অনেকসময় এটিকে সার্বজনীন বলেও মেনে নিতে পারেন না । কিন্তু এর মধ্যে একটি জাতীয়তাবোধ খুজে পাওয়া যায় । যেটি এর মহত্ব । কিন্তু এতেও কিঞ্চিৎ সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে আঞ্চলিকতার দরুণ । অনেকেই মনে করেন রোমান যেরূপে সকলের উপযোগী করে তোলা হয়েছিল এটিকেও সেরূপ সংস্কারের প্রয়োজন । আবার কট্টরপন্থীরা মনে করেন যে, এর সংশোধন আনা হলে এর মৌলতা হারাবে বা স্বকীয়তা হারাবে ।দূর্বীন সরেন কলকাতার একটি আর্টিকেলে প্রকাশ করেন যে, অলচিকি অনুকরনীয় কোন বর্ণমালা কেননা সিএস উপাসক রচিত The History and Paleography of Muryan Brahmi Script এ উল্লেখ করেন যে ব্রাহ্মী লিপির সাথে এর মিল রয়েছে তাই এটি অনুকরন বা কপি করা হয়েছে!?কিন্তু প্রাচ্যের লিপির সাথে প্রাচ্যের সম্পর্ক থাকাটাইতো স্বাভাবিক ।
অপরদিকে রোমান সান্তালি হরফে সান্তালি বর্ণমালাকে প্রকাশ করা হলেও বর্গীয় বর্ণমালার সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে বাংলার ক চ ট ত প ধাঁচে । রহস্যটা কি? হ্যাঁ এ দেশেরই একটি দর্শন কাজ করেছে । প্রাচীন ভারতের । মিশনারীরা এর সাথে পরিচিত ছিলেন কিনা সে বিষয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিতের সন্নিবেশ পাওয়া যায় না । অন্তত সান্তালিতে এই বর্গীয় বর্ণমালার সন্নিবেশন কিঞ্চিৎ ভাবিয়ে তোলে। সংস্কৃত বা বাংলা অথবা ভারতীয় দর্শণের ওপর গড়ে ওঠা বর্ণমালাগুলোকে বিশ্লেষণ করলেই উত্তরটি পাওয়া যাবে । প্রাচীন ভারতীয় অনার্যবা সান্তালদেরও এই দর্শণের সাথে এবং এর উৎপত্তিস্থল প্রাচ্যের ঘটনার সঙ্গে যে সম্পর্ক ছিল না তা বললে একেবারেই ভূল হবে ।
কেননা আদি অনার্য ও আদি আর্য ভাষাগুলোর সংস্কারেই সংস্কৃত ভাষার জন্ম । বাংলারও মিল মিশ রয়েছে এসব ভাষার সাথে । তাই সান্তালি ধ্বনির সাথে প্রাচ্যের দর্শণের পরিচয় বা সখ্যতা যে আত্মার সাথে দেহের সম্পর্কের ন্যায় থেকে গেছে অব্যাক্তভাবে। ওপরের দেহের ওপর নানা প্রকার বর্ণমালার লেবাশ চড়ালেও এই আত্মা রয়ে গেছে । তখন পঞ্চকোষে পঞ্চকপালে পঞ্চযজ্ঞে পঞ্চকর্ম ইত্যাদিতে পঞ্চদেবতা পঞ্চজন ইত্যাদিরা পঞ্চগুণকে পঞ্চযামে পঞ্চরাত্রে পঞ্চপর্বে পঞ্চগব্যে পঞ্চপুষ্প ইত্যাদিতে পরিণত করে পঞ্চগৌড়ে পঞ্চনদে প্রবাহিত করে । পঞ্চমুখে পঞ্চস্বরে সেকথা বলে বলে পঞ্চলক্ষণে লিখিত হয় । এই পঞ্চতত্ত্বের প্রতিনিধিত্বকারী যে পঞ্চবর্গ তারাই ক চ ট ত প । ভগবতে একথা বলা হয়েছে যে এই পঞ্চ পঞ্চ(৫x৫=২৫) উপাদান বিশিষ্ট গৃহকে যে চেনে না, সে প্রজাসৃষ্টি করতে পারে না ।অপর দিকে এই প্রাচ্যেই বেদের শুরু । জ্ঞানের শুরু । স্পেনে তখন মাত্র আঠারোটি বই নিয়ে ইউরোপের সর্ব্বৃহৎ লাইব্রেরী গড়ে উঠেছিল । অথচ আমাদের এই ভারতবর্ষে তখন দেড়শতাধিক তন্ত্রের চর্চা হত! আজ সেই ইতিহাসের সাথে বিচ্ছেদের দরুণ পাশ্চাত্যকেই গুরু বলি প্রাচ্যকে বলি গরু । কারণ গরু নাকি নিজের আঙিনার ঘাঁস খায় না । বাংলায় অ মানে যে রক্ষা করে ব মানে বাহক শ মানে যে শুয়ে আছে দ মানে দাতা কিন্তু ইংরেজীতে abcd অবশদ এর কোন মানে নেই । উপরন্তু যেহেতু অনার্য সান্তালি শব্দের সংস্কার ঘটে বাংলা ও সংস্কৃতে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে । যেমনটি ডক্টর শহীদুল্লাহ,সুনীতিকুমার চট্টোপাধায়ের মত বিজ্ঞ পন্ডিতরাও স্বীকার করেছেন । তাই সান্তালি ভাষার প্রত্যেকটির মানে আছে ক্রিয়া আছে ঘটনা আছে । অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা একাডেমীর ডক্টর ক্ষুধিরাম দাস,সান্তালি ব্যাকরণজ্ঞ আর এম ম্যাকফাইল উভয়ই উল্লেখ করেছেন যে, সান্তালি ক চ ট ত প এর অর্ধস্বরগুলো বাংলায় হসন্ত উচ্চারণের ন্যায় নয় । কেননা বাংলা হসন্ত উচ্চারণের শেষে সংক্ষিপ্ত অ ধ্বনির আগমণ ঘটে থাকে ।
১৮৯৪ সালে সান্তালি কাব্য সাহিত্যে একটি মাইলস্টোন স্থাপিত হয় । মিশনারীদের প্রবল প্রভাব সত্ত্বেও মাঝি রামদাস টুডু রেস্কা রচনা করেন কালজয়ী 'খেরোয়াল বংশা ধরম পুথি'। এ গ্রন্থটি কিন্তু বাংলা বর্ণমালায় করা হয়েছিল । আর এখানেই নীহিত রয়েছে সান্তালদের আদি ইতিহাস ।কিন্তু চিনতে পারছি না । কারণ আমরা বিবরণমূলক ইতিহাস চর্চার সাথে জড়িত ব্যাখ্যামূলক ইতিহাসে নেই । উপরন্তু এই গ্রন্থ প্রকাশনার সাথে জড়িত ছিলেন বাংলা গদ্য সাহিত্যের বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রাহুল সাংস্কৃত্যায়ন ।  রামদাস টুডুর দর্শন নিশ্চয় সীমিত গন্ডীবদ্ধ ছিল না । অপরদিকে এই গ্রন্থটি বর্তমান প্রতীকি শব্দ দ্বারা অধ্যয়ন করলে ছেলে ভুলোন গল্প বলেই মনে হয় । যেমনটি মনে হয় বাতসায়নের কামসুত্র বা মহাভারতের কাহিনীগুলোকে । কেননা প্রতীকি শব্দ দ্বারা এসব অধ্যয়ন করলে যথাক্রমে যৌন উত্তেজক গ্রন্থ বা ঘুম পাড়ানী ভারতীয় মিথ বলে মনে হয় ঠিক তেমন । এল ও স্ক্রেফস্রুড বা বর্তমান অনেক লেখকই এই গ্রন্থের ঘটনাগুলোকে মিথ বলে আখ্যায়িত করে ভ্রম ঘটান । অথচ মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যার ভেতর দিয়ে গেলে অন্য চিত্রকে খুজে পাওয়া যায় ।
পাশ্চাত্যেও ততদিনে শুরু হয়ে গিয়েছিল পদ অর্থের রহস্য বা আত্মা খোঁজার আপ্রাণ প্রচেষ্টা । ১৮৯১ সালে নোম চমস্কি জিবি থিওরী দাঁড় করান । শব্দার্থ তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা কেবল সারফেস স্ট্রাকচারের ওপর নির্ভর করে বলে ঘোষণা দেন । অপরদিকে ডীপ স্ট্রাকচার ডিবেটে(১৯৬০-১৯৮৫) কেউ কেউ দেখালেন শব্দকে বাক্য প্রসবের এককরূপে গড়ে তোলার ক্ষেত্রটি যত না ব্যাকরণ[=সিন্ট্যাক্স] নির্ভর তার চেয়ে বেশী শব্দার্থ নির্ভর । তাই আমাদের সান্তালি ধ্বনিগুলোর ওপর যত বর্ণমালাই চড়ানো হোক না কেন এদের অন্তরীক্ষ দর্শন ব্যাতীত বর্ণমালা গ্রহণের বিষয়ে একমত হবার বিষয়টি বিদিশাগ্রস্তেই নিমজ্জিত থাকবে । বাংলা বা সংস্কৃত কিন্তু এই প্রকৃয়াটি আবিস্কার করে ফেলেছে । সান্তালি কবে করবে?
বর্তমান বাংলাদেশে যে, বর্ণমালা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে তাতে কতটুকু তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে ? বাংলা এবং রোমান বর্ণমালা কোনটির যৌক্তিকতা বেশী তা নিয়ে যুক্তির প্রতিযোগীতা চলছে । আমিও এতে জড়িয়েছিলাম এখনও আছি । কিন্তু যুক্তিগুলো অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে হওয়া উচিৎ । রোমান পন্থীরা বাংলা পন্থীদের কোন কোন মহলের(এনজিও,গবেষক) পক্ষপাতপুষ্ট বলে আখ্যায়িত করছে । আবার বাংলা পন্থীরাও বিভিন্ন মানববন্ধনে চার্চ সংশ্লিষ্ট খ্রিষ্টিয় মৌলবাদীতার প্রভাব বলে আখ্যায়িত করছেন । উভয়ই সমান । আবার চার্চ বিগত দিনগুলোতে স্কুলগুলোয় রোমানের চর্চা করেছে সত্য কিন্তু বর্তমানে তাদের চর্চায় ভাটা পড়েছে । অপরদিকে বাংলাপন্থীরা একসময় কয়েকটি স্কুলে পাইলট প্রজেক্ট চালানোর পর বন্ধ করে দেয় । গত বছর সান্তালি বর্ণমালা সিদ্ধান্তে ঐক্যমতে না আসতে পারার কারণে উভয় পক্ষই মনের দূঃখে বনে গমণ করেছেন । অর্থাৎ নিজ নিজ চিন্তাধারার এনজিওতে সান্তালি চর্চা স্ব স্ব বর্ণমালায় শুরু করলেন । কিন্তু ব্যাপক অর্থে বর্ণমালা ঐক্যে পৌছানোও গেল না । প্রতিষ্ঠাতো দূরেই থাক ।
প্রকাশ্যেই বলি, নীরব হলেও এহেন বিতর্কে খুজে পাওয়া যায় সাম্প্রদায়িকতা । এই সাম্প্রদায়িকতা একটি বর্ণমালা কাঠামোর সাম্প্রদায়িকতা । আমি প্রকাশ্যে ঘোষণা করছি আমি এরূপ সাম্প্রদায়িকতা থেকে ইস্তফা দিচ্ছি অন্তত যুক্তির ক্ষেত্রে । এই সাম্প্রদায়িকতাতে বিরাজ করে একটি ভয় । আর ভয় থেকেই জন্ম নেয় প্রতিযোগীতার । যেমন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ রোমান পন্থীদের চার্চের তাবেদার, সাম্রাজ্যবাদীর দোসর বলে রোমানেও খুঁজে পান একটি সাম্রাজ্যবাদী গন্ধ । অপরদিকে রোমান পন্থীরা জাতীয় আদিবাসী পরিষদকে দোষারোপ করছেন যে, তারা ডনারদের অর্থ হজম করছে । খ্রিষ্টানদের অর্থ নিয়ে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে কথা বলছে ইত্যাদি ইত্যাদি ।  তাহলে বিভাজনকারী কে? যারা একই দিকে বাংলাপন্থীদের সহায়তা করছেন অপরদিকে রোমান পন্থীদেরও পৃষ্ঠপোষকতা করছেন ! নিঃসন্দেহে দাতাগোষ্ঠী । আর আমরা শব্দের অন্তর্নিহিত অর্থ বের না করেই একটি বিবাদে জড়িয়ে আছি । বাংলাদেশে বানান নীতি নিয়েও স্পষ্ট কোন বিধি নেই ।

ব্যাকরণ চর্চার চরম অপ্রতুলতা । বইয়ের জন্য এখনও ভারতের ওপর নির্ভরশীল ।
উপরন্তু জাতিস্বত্তার স্বীকৃতি বা ভাষার স্বীকৃতি না পেলে আমাদের দেশের প্রভাবশালী বাংলা ভাষা আমাদের ভাষাকেও হজম করে ফেলবে । সান্তালির ক্ষেত্রে তা যেকোন বর্ণমালাই প্রতিষ্ঠা পাক না কেন । উপরন্তু পুরাতনের চর্চাই হবে । কারখানার মত স্কুলগুলো থেকে বর্ণমালা নিয়ে বের হবে বছর বছর হাজার হাজার শিশু । প্রয়োগের জায়গাটা খুজে না পেয়ে কারখানার পণ্যের ন্যায় মালিকের জিহ্বা ধার করে দাম জাহির করবে । অথবা আবারও বিদিশাগ্রস্ত হবে । এখনও আমরা রাজবৃত্তের(এনজিও,চার্চ,দাতাসংস্থা,রাজধানী কেন্দ্রিক রাজনীতি) আবর্তেই রয়েছি । আমাদের ইতিহাসগুলো ধুকে ধুকেই মরছে । দিন দিন ইতিহাস পরিণত হচ্ছে মিথোলজিতে । বিবরণমূলক ইতিহাস বা প্রথাকেন্দ্রিকতা আমাদের পিছু ছাড়ছে না । ব্যাখ্যামূলক ইতিহাস চর্চায় মনোনিবেশ প্রয়োজন । শব্দ পরমাণুর খোঁজ বা বুৎপত্তিকে বাদ দিয়ে এক ইঞ্চিও আগানো সম্ভব নয় ।অন্তত ভাষার ক্ষেত্রে । প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন ।

তথ্যসুত্রঃ

১। সাঁওতালি সাহিত্যের ইতিহাস, পরিমল হেম্ব্রম,পশ্চিমবঙ্গ ।

২।খেরোয়াড় বংশা ধরম পুথিঃ রামদাস টুডু রেস্কা, ভাষান্তর সারদা প্রসাদ কিস্কু ।

৩।সাঁওতালি বাংলা সমশব্দ অভিধান, ডক্টর ক্ষুধিরাম দাস, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমী ।

৪।বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ।

৫। পরমা ভাষা সংকেত- কলিম খান ।

৬।সান্দেশ-২০১৩

৭।Horkoren Mare Hapramkoak katha- L.O Skrefsrud.

৮। Santali a natural language, Dr. PC Hembrom

৯।The Santals,Reading in tribal life, Volume VII: Language and Physical Characteristics- J Troisi(1979).

১০। Gee J.P and Grosjean F.(1983), Performance Structures: a psycholinguistic appraisal.

১১। ভগবত গীতা

১২। বঙ্গীয় শব্দকোষ- হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় ।

১৩। Herder J.G(1891),On the origin of language.

১৪।Ibid.

টীকাঃ

জিবি থিওরীঃ নোম চমস্কীর গভর্নমেন্ট বাইন্ডিং থিওরী ।

ডীপ স্ট্রাকচার ডিবেটঃ অন্তরঙ্গ গঠনের বিতর্ক । এটি ১৯৬০ তে শুরু হয়ে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বিতর্কটি চলতে থাকে । বিশ্বের প্রায় সকল ভাষাতাত্ত্বিক জড়িয়ে পড়েন এতে ।              



উৎস: https://www.facebook.com/notes/samar-m-soren/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BF-%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A3%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%AF%E0%A7%8C%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%8F%E0%A6%AC%E0%A6%82-%E0%A6%B6%E0%A6%AC%E0%A7%8D%E0%A6%A6-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A3%E0%A7%81/750604091631124?ref=notif&notif_t=note_tag
Share:

Friday, March 21, 2014

জাকির তালুকদারের ছোটগল্পে

জাকির তালুকদারের ছোটগল্পে

সমতলের আদিবাসীদের জীবনচিত্র নির্মাণ

ফাহমিদ আল জায়িদ
জাকির তালুকদার গল্প লেখেন মূলত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। পেশায় চিকিত্সক এই লেখকের প্রতিনিয়ত সুযোগ ঘটে মফস্বলের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে মেলামেশা করার। ডাক্তারিবিদ্যা এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনা শেষে সবাই যখন সার্জন হয়ে শহরে স্থায়ী হওয়ার বাসনায় মেতে ওঠেন, তখন জাকির তালুকদার সম্ভবত সচেতনভাবেই নিজ শহরে ফিরে আসেন। তাঁর অধিকাংশ গল্প পাঠ করলে বোঝা যায়, প্রত্যেকটি গল্পের উত্স তাঁর নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। মোটা দাগে তিনি তাঁর গল্পে শহুরে পটভূমির তুলনায় গ্রামীণ পটভূমিই বেশি ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। এটিই স্বাভাবিক যে, এই গ্রাম, গ্রামের মানুষদের তিনি দেখেছেন খুবই ঘনিষ্ঠভাবে।

গ্রামীণ সমাজের শ্রেণি-কাঠামো, শ্রেণি-সম্পর্ক, প্যাট্রোন-ক্লাইন্ট সম্পর্ক, শ্রেণি-নির্ভরশীলতা, স্থানীয় পাওয়ার এলিটদের দাপট এবং এগুলোর ভেতর হাঁসফাঁস করতে থাকা নিম্নবর্গ মানুষদের ভাষাহীন প্রতিবাদ, গ্রামীণ রাজনীতি—এ সকল বিষয়কে উপজীব্য করেই গল্প ফাঁদেন জাকির তালুকদার। তিনি গ্রামীণ পাওয়ার এলিটকে তাঁর গল্পে সবসময়ই উন্মোচিত করেছেন। বিশেষ করে তাঁর বেশকিছু গল্পের একটি অন্যতম বিষয় হলো শোষণ। গ্রামীণ পাওয়ার এলিটদের শোষণ। এটিকে 'শ্রেণি-শোষণ' বললে মনে হয় না অত্যুক্তি হবে। গ্রামীণ পাওয়ার এলিট বলতে সাধারণত চেয়্যারম্যান, মেম্বার, জোতদার, সুদখোর, ব্যবসায়ী—এসকল শ্রেণিকে বোঝানো হয়েছে; যাদের ধনলিপ্সা আর প্রতারণার জুড়ি মেলা ভার। তারা নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে গ্রামীণ জনজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জাকির তালুকদারের গল্পে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে ধর্ম, ধর্মের ব্যবহার এবং এটির অপব্যবহার। গ্রামীণ মানুষের জীবনে ধর্মের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে এই ধর্মকে ব্যবহার এবং পুঁজি করে ধর্মীয় নেতা এবং গ্রামীণ পাওয়ার এলিটরা কিভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, সেটি চমত্কারভাবে তাঁর গল্পগুলোতে উঠে আসে।

২.

ছয়টি গল্পগ্রন্থ, সাথে তিনটি অগ্রন্থিত গল্প নিয়ে জাকির তালুকদারের গল্পসমগ্র-১ প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ ২০১০ সালে। একজন লেখককে সামগ্রিকভাবে জানতে-বুঝতে গেলে শুরু থেকেই শুরু করা উচিত। অবশ্য অনেক লেখককে দেখেছি নিজের প্রাথমিক লেখাগুলোকে অস্বীকার করতে। তবে জাকির তালুকদার সেই গোত্রের লেখক নন বলেই ধারণা করি। কেননা, তাহলে তিনি তাঁর গল্পসমগ্র-১ প্রকাশ করতেন না এবং প্রথম গল্পগ্রন্থটিও (প্রকাশকাল ১৯৮৮) গল্পসমগ্রে অন্তর্ভুক্ত করতেন না। কিন্তু এরই মধ্যে জাকির তালুকদার ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করেন ৩০-০৯-২০১৩ তারিখে। তিনি লেখেন, ''কল্পনা চাকমা ও রাজার সেপাই ২০০৬ সালে প্রকাশিত আমার একটি গল্পের বই। সবগুলো গল্প আদিবাসীদের নিয়ে লেখা। আমার বই খুব একটা বিক্রি হয় না। তারপরেও কিছু পাঠক আছেন যারা আমার প্রকাশকদের পুঁজি তুলে আনতে সাহায্য করেন। এই বইটিরও সেই একই অবস্থা। লেখার সময় আমি কোনো পাঠকের কথা মাথায় রাখি না। কিন্তু লেখা শেষ হওয়ার পরে পাঠকগোষ্ঠীর কথা মনে আসে। আমার প্রকাশকও ভেবেছিলেন যে বইটি আদিবাসী ও আদিবাসী নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। কিন্তু এখন খোঁজ নিয়ে দেখছি, বিভিন্ন আদিবাসী নেতা ও সংগঠকদের সাথে কথা বলে দেখছি, তারা কেউ বইটির কথা জানেন না। তারপরেও আমি অখুশি নই। বাঙালি সচেতন পাঠক, যারা বইটির মুদ্রণ শেষ করে দিয়েছেন, তারা অন্তত বইটা পড়ার পরে আদিবাসীদের দিকে আলাদা দৃষ্টিতে তাকাবেন বটে। গোলাপকে নিয়ে যখন কেউ কবিতা লেখেন, কোকিলকে নিয়ে কবিতা লেখেন, তখন গোলাপ বা কোকিল তো সেই কবিতা পড়ে না। কিন্তু যারা পড়েন, সেইসব মানুষ গোলাপ বা কোকিলকে নতুন ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখতে পারেন। 'কল্পনা চাকমা ও রাজার সেপাই' নিয়ে তেমনটা হলেই আমি খুশি।'' গল্পগ্রন্থটি নিয়ে লেখকের আক্ষেপের কারণটা কিছুটা আঁচ করতে পারলাম। 'কল্পনা চাকমা এবং রাজার সেপাই' জাকির তালুকদারের চতুর্থ গল্পগ্রন্থ। আমাদের কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে খুব কমজনই রয়েছেন, যারা আদিবাসীদের নিয়ে আলাদা গল্প-উপন্যাস রচনা করেন। সেখানে জাকির তালুকদার আদিবাসীদের নিয়ে আস্ত একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন, সেটি জেনেই 'কল্পনা চাকমা ও রাজার সেপাই'-এর সব গল্প পড়ে ফেললাম। পাশপাশি, গোটা গল্পসমগ্র এবং আদিবাসীদের নিয়ে আরও কয়েকটি গল্প পড়ার ফলশ্রুতিই আমার এই লেখাটি।

৩.

আমি অত্যন্ত খুশি হই যখন দেখি জাকির তালুকদারের প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থে ['স্বপ্নযাত্রা কিংবা উদ্বাস্তুপুরাণ' (১৯৮৮)] 'আতশপাখি' নামের একটি গল্পে তিনি সাঁওতাল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কথা বলেছেন। এটি বলতেই হচ্ছে যে, প্রথম গল্পগ্রন্থ থেকেই গল্পকার অত্যন্ত সচেতন ছিলেন অবাঙালি সমাজ নিয়ে। গল্পটি সাড়ে তিনকুল বয়সের সাঁওতাল সিধুবুড়োর স্মৃতির জবানীতে বর্ণনা করেছেন লেখক। সিধুবুড়ো স্মরণ করেছে তেভাগা আন্দোলনের কথা, ফসলের ন্যায্য হিস্যার কথা, হাতুড়ি আর কাস্তের কথা। ভদ্দরলোকের কেতাব পড়া সোনার টুকরা এক কমরেডের কথাই স্মৃতিচারণ করে সিধুবুড়ো। অল্পবয়সী সেই কমরেড ছোকড়া সিধুবুড়োর গ্রামে আসে একদিন। ক্ষেতমজুর, ভূমিহীন এবং ছোটকৃষকদের সাথে আলাপ করতে থাকে। সে গ্রামের জোতদারদের কাছ থেকে খাস জমি ছিনিয়ে নিয়ে তাদের মাঝে বণ্টন করতে চায়। ছেলেটিকে লাল ঝাণ্ডা নিয়ে কিষানদের সাথে মিছিল করতে দেখে সিধুবুড়ো। তখনই তার আবার মনে পড়ে যায় তেভাগার সময় ইলা রানিমা, জসীমভাই, সত্যেনদা, জীতেনদা, আক্কাস ভাইদের কথা। এদের সকলের পরিণামের কথা মনে করতেই আঁতকে ওঠে সিধুবুড়ো। সে জানে, এই ছেলেটির লাশ যেকোনো দিন ভেসে উঠবে মহানন্দার পানিতে। হয়েছিলও তাই। সেই তেভাগার পর সাঁওতালপল্লি যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। অস্থির, উদ্ধত, বেপরোয়া এই ছেলেটি আবার কিছুক্ষণের জন্য হলেও সাঁওতালপল্লিতে নতুন করে চাঞ্চল্য এনে দেয়। আবার লাল ঝাণ্ডার মিছিল দেখে আশাবাদী হয় সিধুবুড়ো। না, তাহলে সব শেষ হয়ে যায়নি। উত্তেজনায় দুর্বল হাঁটুর ওপর দাঁড়িয়ে যায় সিধুবুড়ো। তাকিয়ে দেখে, মিছিলে সব নতুন মুখ, এই মুলুকেরই ছেলে, কিষানের ব্যাটা, মজুরের ব্যাটা। তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে সেই একই আগুন জ্বলজ্বল করে জ্বলতে দেখে। সিধুবুড়ো এবার নিশ্চিত হয়। সেই জেদী বেপরোয়া কমরেড মরবার আগে তার বুকের আগুন জ্বালিয়ে রেখে গেছে সবার বুকে। পাশাপাশি নিজের ঘোলাচোখেও আগুনের সোনারাঙা শিখা দেখে আশাবাদী হয়ে ওঠে সিধুবুড়ো। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যুগে যুগে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এভাবেই টিকে থাকে।

৪.

'পণ্যায়নের ইতিকথা' গল্পটির শিরোনাম থেকেই কিছুটা আন্দাজ করতে পারা যায় এর বিষয়বস্তু কী হতে পারে। আদিবাসীদের কিভাবে পণ্যে পরিণত করেছে আমাদের এনজিও; সেটির চমত্কার উপস্থাপনা রয়েছে গল্পটিতে। এনজিও মালিক মোজাম্মেল হক বেশ কয়েকদিন ধরেই ব্যস্ত। স্থানীয় এমপি'র সহযোগিতায় তিনি গড়ে তুলেছেন এনজিও যার কাজ আদিবাসীদের উন্নয়নে সামগ্রিক ভূমিকা রাখা। দাতাদের ভিজিট উপলক্ষে মোজাম্মেল সাহেব আদিবাসীদের সাজিয়ে-গুছিয়ে এনেছেন স্কুল মাঠে। দাতারা সবকিছু দেখে-শুনে সন্তুষ্ট হলে কমপক্ষে পঁচিশ কোটি টাকার অনুদান পেয়ে যাবে তার এনজিও। দাতাদের একে একে সবকিছু দেখাচ্ছিল মোজাম্মেল সাহেব। আদিবাসী কুটিরশিল্প থেকে শুরু করে শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা (বিশেষ করে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি) খাতে মোজাম্মেল সাহেবের এনজিও যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে; সেটিই দেখাচ্ছিলেন বিদেশি দাতাদের। কিন্তু দাতারা তো আর এটি জানেন না, এই আদিবাসীদের দিয়ে এমন প্রদর্শনী করতে বাধ্য করেছেন মোজাম্মেল সাহেব। লেখক প্রমাণ দেন এভাবে, 'হঠাত্ করেই বেঁকে বসেছিল সুধীর হেমব্রম, নিতাই টুডু আর গির্জার ফাদার আলবার্ট মুর্মু। না, এভাবে তারা আর সঙ সাজতে রাজি নয়। এতদিন তাদের যা বলা হয়েছে তা-ই করেছে মুখ বুঁজে। তাদের দেখিয়ে বারবার কোটি কোটি টাকা এনেছেন মোজাম্মেল হক। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের। অনুদানের টাকায় কিছুই করা হয়নি তাদের জন্য।' কিন্তু এসব বিষয় দাতাদের কান পর্যন্ত মোটেও পৌঁছায় না। সবকিছু ভালোয় ভালোয় শেষ হয়ে যায়। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে মোজাম্মেল। এবার ভালোভাবে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে দাতাদের বিদায় করতে পারলেই বাঁচে সে। আদিবাসী সাঁওতাল ও বাঙালি মিলে প্রায় ১২০০ জনের খানাপিনার ব্যবস্থা। কিন্তু সবাই একসাথে খেতে বসলেই বাঁধে আসল বিপত্তি। দাতারা আদিবাসীদের সাথে খাবে বলে তাদের সাথে বসে পড়ে। তারা শুরু করলেও কোনো আদিবাসী খাওয়া শুরু করে না। অবাক হয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করতেই তারা সবাই জানায়, 'আজ আমাদের উপোস। ধর্মে নিষেধ আছে খাওয়া। আজ যে খাবে, সে নিজের পেটে চিমটি কাটবে নিজের পেটের ভেতরে থাকা ছেলেকে।' দাতা সাহেবরা হাত গুটিয়ে থ হয়ে বসে থাকে। আর লোভী মোজাম্মেল অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সাঁওতালগুলোর দিকে। এভাবেই শেষ হয় গল্পটি।

গল্পটিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছেন গল্পকার। প্রথমটি হলো—আদিবাসী ক্ষমতায়নের ধারণা এবং দ্বিতীয়টি—আদিবাসী সমাজে চোয়ানি খাওয়ার অভ্যাসটি। দাতাদের কাছে আদিবাসীদের ক্ষমতায়নকে দেখানোর জন্য সাধারণত কিছু 'সাকসেস স্টোরি' পূর্ব থেকেই তৈরি করা থাকে। বিষয়টি কুমিরের একই বাচ্চা বারবার দেখানোর মতো। এখানে মোজাম্মেল হক সাঁওতাল সত্যকে হাজির করেন সেই 'সাকসেস স্টোরি' হিসেবে। এই সত্যকে ইউনিয়ন পরিষদের ভোটের মাধ্যমে মেম্বার 'বানিয়েছে' এই মোজাম্মেল। দাতাদের সামনে সত্যকে তুলে ধরতেই তারা ইমপ্রেসড হয়ে বলে ওঠে, 'ওহ রিয়েলি! ইউ আর এ পাবলিক রিপ্রেজেন্টেটিভ!' কিন্তু ক্ষমতায়নের এই ধোঁকাবাজি ঠিকই ধরতে পারে সাঁওতালরা। লেখকের ভাষায়, 'তবে ইতোমধ্যেই ওরা বুঝে ফেলেছে, পুরো গোষ্ঠীর মধ্যে একজন বা দুইজন বড় হয়ে গেলে, আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেলেই, বাবুদের পঙিক্তভোজে বসতে পারলেই, তাকে জাতির উন্নতি বলা যায় না। হ্যাঁ, হয়তো হাভাতের সংখ্যা একজন কমেছে। তাতে অন্যদের কী এলো-গেলো। এখন ভদ্রলোকের সঙ্গে ওঠাবসা করতে করতে সত্য মেম্বার নিজের সাঁওতাল পরিচয় নিয়ে লজ্জা পায়। গাঁয়ের মধ্যে তারই একমাত্র ইট-সিমেন্টের বাড়ি, যেখানে আবার লোহারপাতের গেট আছে। অর্থাত্, ইচ্ছে করলেই যে কেউ সত্য মেম্বারের বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারবে না।

সাঁওতালরা এখন আর সত্যকে নিজেদের লোক ভাবে না। তবে তার মানে এই নয় যে, তারা তাকে একঘরে করেছে। বরং সত্য নিজে নিজেই আলাদা হয়ে গেছে নিজের সমাজ থেকে।'

পাশাপাশি অনেক আদিবাসী গবেষক, বিশেষ করে সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে চোয়ানিপ্রিয়তা এবং নির্ভরতার কথা উল্লেখ করেছেন। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া-ঝাটি, জমানো অর্থ বাজারি নেশার পেছনে খরচের প্রবণতা, শারীরিক দুর্বলতার কারণে কায়িক পরিশ্রমের অনভ্যাস—ইত্যাদি বিষয়কে গবেষকরা সাধারণত আদিবাসীদের অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা হিসেবে তুলে ধরে থাকেন। কিন্তু গল্পকার বিষয়টিকে ভিন্নভাবে তুলে এনেছেন। তিনি এটিকে অভ্যন্তরীণ বিষয় বলতে নারাজ। লেখকের ভাষায়, 'সাহেব, আমরা যে কয়দিন বেঁচে থাকি, চোয়ানিই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। জমি কেড়ে নেয় বাবুরা। রিলিফের চাল কেড়ে নেয়। মঙ্গার খয়রাত কেড়ে নেয়। আঙুলের টিপ-ছাপ নিয়ে ভাগিয়ে দেয় আমাদের। পেটের খিদে নিয়ে কোথায় যাই? তখন চোয়ানি। ও-তো ভাতেরই জিনিস। ভাতও খাওয়া হলো, দুঃখ ভোলার নেশাটুকুও হলো। শুধু কি আমরা খাই? বাচ্চাগুলো যখন খিদের জ্বালায় ট্যাঁ ট্যাঁ করে কাঁদে, তখন চোয়ানিতে আঙুল ডুবিয়ে সেই আঙুল চোষাই বাচ্চাদের। তবেই না বাচ্চারা শান্ত হয়ে ঘুমাতে পারে! এই যে সারা গাঁয়ে বাচ্চাদের ঘ্যানঘ্যান নাই, কান্নাকাটি নাই, খাবার চেয়ে সাহেব-বাবুদের বিড়ম্বনায় ফেলা নাই, সে তো এ-চোয়ানির গুণেই।'

নৃবিজ্ঞানী জেমস স্কটের একটি বিখ্যাত বই 'ওয়েপনস অব দি উইক' অর্থাত্ 'দুর্বলদের অস্ত্র', সেখানে তিনি কৃষক সমাজের প্রতিদিনের প্রতিরোধের চিত্র দেখিয়েছেন। প্রত্যক্ষ সহিংসতা অথবা সংঘটিত বিপ্লবের মাধ্যমেই যে প্রতিরোধ করা হয় তা নয়, নানা ধরনের সূক্ষ্ম বিষয়ের মাধ্যমেও প্রতিরোধ করা যায়। সাঁওতাল আদিবাসীদের উপোসের ঘটনাটিকে আমি এক ধরনের 'নিশ্চুপ' প্রতিরোধ হিসেবে দেখতে আগ্রহী। কেননা, তারা সরাসরি দ্বন্দ্বযুদ্ধে যেতে পারছে না মোজাম্মেলের সাথে। এছাড়া বিষয়টির আরও একটি ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। সেটি হলো, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম-কানুন থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মোজাম্মেল সাঁওতাল আদিবাসীদের ব্যবহার করে নিজের তল্পি-তল্পা গোছাতে ব্যস্ত ছিল বিধায় তাদের জিজ্ঞাসা করারই ফুরসত পাননি যে, আজ তাদের খাবারে উপোস কিনা।

গল্পটিকে আমি যেহেতু আদিবাসী সাঁওতালদের নিশ্চুপ প্রতিরোধ হিসেবে দেখতে আগ্রহী; সেহেতু শ্রেণি'সচেতনতা' বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি কথা বলতে চাই। গল্পটিতে আমরা দেখেছি যে, মোজাম্মেল হক আদিবাসীদের নিজের এনজিও-র স্বার্থে ব্যবহার করে আসছে। দীর্ঘদিন এহেন শোষণের শিকার হতে হতেই একসময় তাদের মধ্যে সচেতনতা আসে এবং প্রতিরোধের ভাষা ভেসে ওঠে। প্রাথমিকভাবে মোজাম্মেলের প্রস্তাবে সাঁওতালরা 'না' করায় সে বলে, 'বাহ ভালো কথা বলতে শিখেছিস তো : কে শিখিয়েছে? উত্তর পাড়ার আলতাফ?' আলতাফ এলাকায় কমিউনিস্ট হিসেবে পরিচিত। সাঁওতালদের অনেকেই তার সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে মেশে। হুট করে আলতাফকে সিঁধ কেটে গল্পে ঢুকিয়ে আনলেও সমগ্র গল্পে তাকে কিন্তু আর খুঁজে পাওয়া যায় না। গল্পকার এখানে সাঁওতালদের সচেতনতা সৃষ্টির অবদানটি ইঙ্গিতে কমিউনিস্ট কর্মীকে দিতে চান বলেই আমার মনে হয়েছে। বামপন্থি রাজনীতির প্রতি লেখকের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বই সম্ভবত এটির কারণ। তবে আমি এটিও ভুলে যেতে চাই না যে, বাংলাদেশের যে অঞ্চলে সাঁওতালদের বাস, সেই অঞ্চলে ঔপনিবেশিক সময়ে বিখ্যাত তেভাগা আন্দোলন সংঘঠিত হয় এবং সাঁওতালসহ উত্তরবঙ্গের নানা আদিবাসী ও মার্ক্সবাদী নেতাকর্মীদের সেই আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল।

নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হওয়াতে সেই শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। শিক্ষকতা পেশায় আসার পূর্বে দু-বছর একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষক হিসেবে কাজ করেছি। তখনও বাংলাদেশের নানান অঞ্চলের আদিবাসীদের ওপর খুব কাছ থেকে বিশেষ করে এনজিও কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল। জাকির তালুকদারের গল্পসমগ্র-১ যখন পড়ছিলাম; তখন সবকিছুই যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। ঘটনা এবং বর্ণনাগুলো জীবন্ত মনে হচ্ছিল আমার কাছে। তাঁর প্রত্যেকটি গল্পই বাস্তববাদী। নেই কোনো গীতল রোমান্টিকতা, নেই কোনো ধরনের ভাবালুতা। এটি বলা হয়ে থাকে যে, অভিজ্ঞতা ছাড়া কথাসাহিত্য লেখা যায় না। গল্পগুলো পড়ে মনে হয়েছে, নিজ অভিজ্ঞতায় লেখক যা প্রত্যক্ষ করেছেন, তা-ই তিনি কোনো ধরনের বদল ছাড়াই যেন কলমে নিয়ে এসেছেন। লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে পাঠকের বাস্তব অভিজ্ঞতা মিলে যাওয়াটা একটি বিশেষ আনন্দের ব্যাপার। আর একারণেই গল্পগুলো পাঠ করতে গিয়ে আমি যে আনন্দ লাভ করেছি; সেটি মোটেও ভোলার নয়।

 উৎস: দৈনিক ইত্তেফাক , মার্চ ২১,২০১৪, পৃষ্ঠা ২৪,
http://www.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDNfMjFfMTRfNF8yNF8xXzExNzI0MQ==
Share:

Wednesday, March 19, 2014

আলফ্রেডরা ঘুমালেও, জেগে থাকুক বিচিত্রারা

স্বপন এককা
শৈশবে মা-বাবা, দাদা-দাদির কোলে শুয়ে-বসে রূপকাহিনী শুনতাম অনেক। রাজ-রাজড়ার কাহিনী, ভূত-প্রেত, জন্তু জানোয়ার, রাক্ষস, জিন-পরীদের রসালো ও ভয়ার্ত সব কাহিনী শুনে গা ছমছম করত। চোখে যখন ঘুম নামতো না তখন অদূরে ডেকে যাওয়া শেয়ালের হুক্কাহুয়ার অনুকরণ শোনা যেত পাশের বাড়ির আঙিনা থেকে। তখনও বুঝতাম না সেটা ও বাড়িওয়ালার চালাকি।

যখন আর একটু বড় হয়েছি তখন আমাদের পূর্বপুরুষরা কিভাবে বন্য পশুপাখি, বিষাক্ত সাপ, পোকামাকড়ের দংশন সয়ে বসতবাড়ি, ঊষর ভূমিকে আবাদি জমিতে রূপান্তর ঘটিয়েছে সেসব কাহিনী শুনেছি। তাদের মুখেই শুনেছি এত এত জমি নিজের কাছে রেখে কী লাভ! তাই তারা অন্যদের তৈরি জমি দিয়ে দিত। জমির মালিক হিসেবে তাদের কাছে তখন দলিল দস্তাবেজের কোনো বালাই ছিল না। হাল যার, জমি তার-নিয়ম যেন এমনি। আউশ, আমন ধান, কাউন আর কিছু রবিশস্য আবাদ করে সারাবছরের খাদ্য জমাত তারা। তাছাড়া বন জঙ্গলের লতা-পাতা, ফলমুল, ডোবা-জলার শামুক, ঝিনুক, মাছ, কাঁকড়া, কচ্ছপ প্রভৃতি ছিল তাদের খাদ্যতালিকার উপাদেয় খাবার। নদীনালা, জঙ্গল-পাহাড়ে বসবাসকারী এসব আদিবাসীরা মূলজনগোষ্ঠী থেকে বেশ তফাতে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। এতে সুবিধা ছিল যে কেউ তাদের দৈনন্দিন জীবন জীবিকায় কোনোরূপ বাধা দেয়ার প্রয়োজন মনে করত না। তখন তাদের উৎসবপার্বণগুলোও বেশ সাড়ম্বরে উদযাপন করা হতো। আদিবাসীরা মহুয়া মদ আর হাড়িয়া জলে মজে গিয়ে লোক ঐতিহ্যের চর্চা-অনুশীলন করত। ছেলেমেয়েরা সারারাত জেগে ঢোল-মাদল, নাগরা, কাশির সুর ঝংকারে কোমর জড়িয়ে ঝুমুর তালে মাতিয়ে তুলতো আখড়া বা ডেরা। সংখ্যাগুরুদের স্বাভাবিক জীবনে এরা কখনো উপদ্রব হয়নি। বরং এরা সবসময় মূলজনগোষ্ঠী থেকে তফাতে সরে থেকেছে।

ফসল লাগানোর মৌসুমে সবাই সবার সাহায্যে এগিয়ে আসত। বেগার নামক স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করত। জমির মালিক তখন পাড়াপ্রতিবেশীদের ডেকে এনে খাওয়াতো সাধ্যমতো। তাদের ছিল পারিবারিক ও পাড়াকেন্দ্রিক গোরস্তান ও শ্মশানভূমি। সময় পাল্টেছে এখন। আদিবাসীরা এখন অস্তিত্ব বিপন্নতায় পতিত। জাতীয় জাদুঘরের ছোট্ট কুঠুরীতেই যেন ভালো শোভা পায়! বৈরী প্রতিরূপ পরিবেশ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের হয়তো অনুপযোগী বলেই তাদের অবস্থান এখন গ্রিন হাউজের মতো স্বচ্ছ ঘেরাটোপে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের কথা বাদই দিলাম গোটা উত্তরবঙ্গ তথা সমতলের আদিবাসীদের একসময় নিজস্ব জায়গা জমি ছিল অঢেল। কিন্তু আজ অবস্থা বিপরীত। যে জমি ছিল তাদের নিজেদের সে জমি আজ অন্যের। এক শতক না পেরোতেই মালিকানা দ্রুত বদল হয়ে যাচ্ছে। যেখানে তারা মজুরি খাটে দুমুঠো আহারের জন্য। শুধু মানসিক নয় কর্মক্ষেত্রে অনেকেই শারীরিকভাবেও হেনস্তার শিকার হন। লোক লজ্জার ভয়ে হয়তো কেউ তা প্রকাশ করেন না। নীরবে সয়ে যান।

আদিবাসীদের জমি কব্জায় নেবার কতনা ফন্দি ফিকির সংখ্যাগুরু প্রভাবশালীদের। মিথ্যা ও সাজানো মামলা হামলায় আদিবাসীদের জড়িয়ে হয়রানি করা হয়। আদিবাসীদের মধ্যে যাদের অর্থসম্পদ আছে, যারা সচ্ছল সেসব বিত্তবানদের পক্ষাবলম্বন করে মামলা পরিচালনায় পরামর্শ সহযোগিতা প্রদান করার মাধ্যমে সংখ্যাগুরুরা আদিবাসীদের নৈকট্য লাভ করেন। বিরোধীপক্ষকে সম্পদ, সম্ভ্রমহানির হুমকি, ভয়ভীতি দেখিয়ে, শাসিয়ে পক্ষের লোকগুলোর অনুগ্রহ লাভ করে তাদের ধর্ম পিতা-মাতা আত্মীয় হয়ে যান নিমিষেই। এভাবেই সম্পদশালীদের বাসায় নিয়মিত যাতায়াতের ফলে তাদের স্ত্রী-যুবতী কন্যাদের বাগে এনে ধর্মান্তর ও বিয়ে করার মাধ্যমে সম্পদে অংশীদার হয়ে যান অ-আদিবাসীরা। নেশাদ্রব্য উৎপাদন, বিপণনে খোদ প্রভাবশালী নেতা জনপ্রতিনিধিরাই আদিবাসীদের উৎসাহিত করেন। অথচ পড়াশুনার জন্য আদিবাসী শিশুদের তাগিদ দেয়া হয় না। কারণ তারা শিক্ষিত হলে তো আর ঠকানো যাবে না। উঠতি বয়সী ছেলেদের নেশা ও অনৈতিক কাজে জড়িয়ে বিপদে ফেলে তারাই আবার ত্রাতারূপে এসে হাজির হন। যে আদিবাসীদের তারা হোটেল রেস্তোরাঁয় ঢুকতে দিতে অপারগ তারাই কিনা আদিবাসীদের ভোট, সম্পদ, নারী দখল ও ভোগ করার লালসায় হায়েনার মতোই হামলে পড়েন। তখন কোথায় থাকে তাদের রুচিবোধ, লোকদেখানো ভদ্রতা-ভব্যতা!

ক্রমাগতভাবে আদিবাসীদের আবাদি জমি, বসতবাড়ি দখল কিংবা অধিগ্রহণ করে ইকোপার্ক তৈরি, বিনোদন কেন্দ্র নির্মাণ, সামাজিক বনায়ন, যাতায়াতের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, আদিবাসীদের বাড়ির পাশে বাড়ি তৈরি করে আদিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনের কর্মে ব্যাঘাত সৃষ্টি, ধর্মীয় উৎসব পার্বণাদি পালনে বাধাদানের মাধ্যমে এদেশ থেকে আদিবাসীদের চিরতরে উৎখাতের অপচেষ্টায় লিপ্ত এলাকার সংখ্যাগুরু সমপ্রদায়ের স্বার্থান্বেষী মহল। শ্মশান বা কবরস্থান পর্যন্ত বাদ যাচ্ছে না। ঢোল মাদলে সুমধুর আওয়াজেও যেন তাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়, ধুপের উৎকট গন্ধে যেন তাদের দম বন্ধ হয়ে আসে এমনই তাদের অভিব্যক্তি। উদ্যত কামুক রাইফেলের নিশানা তাক করা আছে আদিবাসীদের সম্পদ, নারীদের দিকে যেন বা চিল শকুনের ভাগাড়। দিনের আলোয় যারা সাদা শুভ্র বসনে, সুবচনে সুললিত কণ্ঠে নীতি নৈতিকতার জিকির তুলে হাততালি পান, রাতের আধারে, লোকচক্ষুর অন্তরালে এরাই হন সর্বভূক প্রাণী।

আদিবাসীদের বন্ধু বলে পরিচিত দাঁদন ব্যবসায়ীরা কর্জ টাকার ওপর চড়াসুদ ধরে আসল টাকার ১০-১৫ গুণ বাড়িয়ে স্বল্প সময়ে আদিবাসীদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। কেউ হয়তো ৫০০ টাকা ধার বা কর্জ দিয়েছে ৩ মাস পর তা বেড়ে সুদাসলে হয় ১০০০ টাকা! এক বছর পর তা ২০০০ টাকা হয়। দেখা যায় যে চতুর ধুরন্ধর সেই বিপদের বন্ধুটি তার দেয়া ৫০০ টাকা দিয়েই ৪-৫ বছরে এক বিঘা জমির মালিক হয়ে গেছে। যে জমির প্রকৃত বাজার মূল্য তখন ৩০-৩৫ হাজার টাকা। পাওনা টাকা যথাসময়ে ফেরত দিতে না পারলে দলিলপত্র গচ্ছিত রেখে দেয়া হয় কখনো কখনো। টাকার অংক বেশি হলে জমি বন্ধক রাখা হয়। সেই বন্ধকী জমিতে চাষাবাদ করতে করতেই যেন তাতে তাদের স্বত্ব জন্মে যায়। এর মধ্যেই ভুয়া বা নকল দলিল তৈরি করে ফেলে তারা। কখনো বা সেই জমি অনুগত আদিবাসীদের নামে জমি কিনে পরে তা নিজের নামে দলিল করা হয়। সহজ সরল নিরক্ষর আদিবাসীদের বেলায় দেখা যায় যে এক বিঘা জমি বিক্রি করতে গিয়ে এক একর কিংবা এক হেক্টর জমি বিক্রি হয়ে যায়!

এসবের প্রতিকার চেয়ে আদিবাসীরা কার কাছে সহায়তা চাইবেন? স্থানীয় প্রভাবশালীরা, জনপ্রতিনিধি, সরকার দলীয় নেতাকর্মীরাই যদি আদিবাসীদের ওপর জুলুম, নির্যাতন, হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে শাসন শোষণ করেন তবে তারা যাবেন কোথায়? সুখ শান্তি, নিরাপত্তা কামনা করে যাদের ওপর পরম ভরসা রেখে আদিবাসীরা ভোট দেয় তারাই যদি আদিবাসীদের সম্পদ, নারীর ওপর হামলে পড়েন তবে আর কার কাছে প্রতিকার চাইবেন। তাইতো একসময় তারা নিভৃতে দেশান্তর হয়ে যান। মিথ্যা মামলায় ফেরারি হওয়ার চেয়ে দেশান্তরী হওয়াই যেন তাদের কাছে শ্রেয়।

রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ অনুযায়ী আদিবাসীদের ভূমি কেনার আগে জেলা প্রশাসকের (সার্বিক) অনুমতি নিতে হবে (ক্রেতা যদি হন অ-আদিবাসী)। কম লোকই তা মেনে চলেন। সিলেটের বালুচর এলাকার চেয়ারম্যান মছবি্বর হোসেন বলেন যে এ ধরনের আইন মাত্র দু'বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে। একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে তিনি যদি এ রকম অনৈতিক ও বেআইনি কাজ করতে পারেন তখন অন্যরা কি-না করতে পারেন। তখন যারা জমি কেনাবেচার কাজটি করেন সেই মুহুরি হাকিম কি জানতেন না কে কার জমি কিনছে? নিশ্চয় তারা টাকার নেকাবে আড়ালে থেকে কবুল পড়িয়ে সটকে পড়েন। নয়তো এহেন গর্হিত কাজ বছরের পর বছর চলতে থাকে কিভাবে?

অনেক ভূমি ক্রেতা-বিক্রেতা এ আইন সম্পর্কে জানলেও যতটা না টাকা পয়সা খরচের ভয়ে তার চেয়ে বেশি ভয় অনুমতি না পাবার আশঙ্কা করেন! প্রকৃত মূল্যের অনেক কম দামে জমি হাতিয়ে নেয়ার বাসনায় তারা ওপথ মাড়ান না। আর এ কারণেই গোমস্তাপুরের বিচিত্রা তিরকীর স্বামী মঙ্গলা সরকার তার সর্বস্ব হারিয়ে অর্থাভাবে করুণ মৃত্যু বরণ করেন। অথচ পৈতৃক সূত্রে তিনি ছিলেন ৪৮ বিঘা জমির মালিক। বিচিত্রাদের এতগুলো ধানি জমি অল্প সময়ে কিভাবে বেহাত হয়? যে এতগুলো জমি বিক্রি করে সে এত টাকায় কী করেছে? আদিবাসীদের পেট নিশ্চয় ডাইনোসর বা হাতির পেটের মতো বড় নয়! যে বা যারা কিনেছে তাদের আর্থিক সঙ্গতিই বা কতটুকু? জেলা প্রশাসনের কেউ কি জানতে চেয়েছিলেন কী কারণে মঙ্গল এতগুলো জমি বিক্রি করছেন? উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের এ রকম শত হাজার একর জমি বেদখল হয়ে আছে। অর্থবল, জনবল, মনোবলের সংকটে কেউ আর সেগুলো পাওয়ার আশা করেন না।

অবৈধ দখলদারীদের হাত থেকে এই ভূমি রক্ষা করতে গিয়েই ২০০০ সালের ১৮ আগস্ট মহাদেবপুরের ভীমপুরে নৃশংসভাবে খুন হন সাঁওতাল নেতা আলফ্রেড সরেন। এ নিয়ে মামলা হলেও তার ফলাফল নিয়ে আদিবাসীরা এখনো সন্দিহান। ঢেউ খেলানো বরেন্দ্রভূমিতে আদিবাসীদের আবাস এখন দোদুল্যমান। নিশাত মজুমদার, ওয়াসফিয়া নাজরীনদের মতো এভারেস্ট চূড়ায় পতাকা ওড়াতে না পারলেও নিজের বেদখল হওয়া জমিতে ঝা-া পোঁতা চাট্টিখানি কথা নয়। ভূমিখেকোদের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে সেই দুঃসাধ্য কাজটিই করেছে গোমস্তাপুর উপজেলার জিনারপুরের সাহসী আদিবাসী ওঁরাও নারী বিচিত্রা তিরকী। যেন সে নতুন যুগের ইলামিত্র। সাঁওতালদের রানীমাতা নাচলের ইলামিত্রের অন্তর্ধান হলেও নব চেতনায় উজ্জীবিত একালের রানীমাতা রূপে আবির্ভাব যেন এই বিচিত্রা তিরকীর। সর্বহারা স্বামী মঙ্গলের পৈতৃক সম্পত্তি যা অন্যেরা বেআইনিভাবে হস্তগত করেন তা উদ্ধারে তিনি যে সাহসিকতার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন তা আদিবাসীদের মনে আশার সঞ্চার ঘটায়। সামপ্রতিক উপজেলা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের দুইজন আদিবাসী নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। নাচোল উপজেলায় প্রতিমা রানী রাজোয়ার ও দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলায় রুসিনা সরেন। তারা প্রমাণ করেছেন যুগের প্রয়োজনে তাদের কিভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। তাদের নিজ যোগ্যতা, দক্ষতায় তারা সংখ্যাগুরুদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ পর্যায়ে এসেছেন। দেশজুড়ে জয়িতাদের তালিকায় কতিপয় আদিবাসী নারীদের নামও যুক্ত হতে দেখছি। আশা জাগানিয়া এই নারী নেতৃত্বের সম্মিলন যদি সাহসী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয় তবেই সমতলের আদিবাসীরা মানমর্যাদা নিয়ে এদেশে টিকে থাকতে পারবে।

আদিবাসী ওরাঁও সমাজে প্রচলিত আছে যে, রোহিতাস গড়ে আদিবাসীরা নেশা খেয়ে সারারাত আনন্দ ফুর্তি করে ভোরবেলা যখন তারা গভীর ঘুমে অচেতন তখন বাইরের দখলদার বাহিনী রোহিতাসগড় আক্রমণ করে। তখন নারীরা তড়িৎগতিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে পুরুষের বেশ ধরে দখলদারদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং তাদের পরাস্ত করতে সক্ষম হয়। অবশ্য শেষবার আদিবাসী নারীদের আসল চেহারা ধরা পড়লে শত্রুপক্ষ পুরুষালি চেতনায় ঝাঁপিয়ে পড়ে আদিবাসীদের রোহিতাসগড় থেকে বিতাড়িত করে।

কাস্তে হাতে ঝুমুর তালে আদিবাসী নারীরা শুধু কোরাস গাইতেই পারঙ্গম নয় প্রয়োজনীয় মুহূর্তে জ্বলে উঠতেও পারে। নিজেদের দাবি অধিকারে উচ্চকিত বিচিত্রা তিরকী, রুসিনা সরেন, বিশুদমনি টপ্য, প্রতিমা রানী রাজোয়ারসহ উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের শাণিত চেতনার মশাল মিছিলে কাটুক আঁধার।
[লেখক : আদিবাসী সংগঠক ও সংস্কৃতিকর্মী]

উৎস: http://www.thedailysangbad.com/index.php?ref=MjBfMDNfMThfMTRfMl8yMF8xXzE1ODQwMg==

Share:
Copyright © The Santal Resources Page | Powered by Blogger Theme by Ronangelo