Online Santal Resource Page: the Santals identity, clans, living places, culture,rituals, customs, using of herbal medicine, education, traditions ...etc and present status.

The Santal Resource Page: these are all online published sources

Santal Gãota reaḱ onolko ńam lạgit́ SRP khon thoṛ̣a gõṛ̃o ńamoḱa mente ińaḱ pạtiạu ar kạṭić kurumuṭu...

Friday, March 21, 2014

জাকির তালুকদারের ছোটগল্পে

জাকির তালুকদারের ছোটগল্পে

সমতলের আদিবাসীদের জীবনচিত্র নির্মাণ

ফাহমিদ আল জায়িদ
জাকির তালুকদার গল্প লেখেন মূলত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। পেশায় চিকিত্সক এই লেখকের প্রতিনিয়ত সুযোগ ঘটে মফস্বলের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে মেলামেশা করার। ডাক্তারিবিদ্যা এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনা শেষে সবাই যখন সার্জন হয়ে শহরে স্থায়ী হওয়ার বাসনায় মেতে ওঠেন, তখন জাকির তালুকদার সম্ভবত সচেতনভাবেই নিজ শহরে ফিরে আসেন। তাঁর অধিকাংশ গল্প পাঠ করলে বোঝা যায়, প্রত্যেকটি গল্পের উত্স তাঁর নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। মোটা দাগে তিনি তাঁর গল্পে শহুরে পটভূমির তুলনায় গ্রামীণ পটভূমিই বেশি ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। এটিই স্বাভাবিক যে, এই গ্রাম, গ্রামের মানুষদের তিনি দেখেছেন খুবই ঘনিষ্ঠভাবে।

গ্রামীণ সমাজের শ্রেণি-কাঠামো, শ্রেণি-সম্পর্ক, প্যাট্রোন-ক্লাইন্ট সম্পর্ক, শ্রেণি-নির্ভরশীলতা, স্থানীয় পাওয়ার এলিটদের দাপট এবং এগুলোর ভেতর হাঁসফাঁস করতে থাকা নিম্নবর্গ মানুষদের ভাষাহীন প্রতিবাদ, গ্রামীণ রাজনীতি—এ সকল বিষয়কে উপজীব্য করেই গল্প ফাঁদেন জাকির তালুকদার। তিনি গ্রামীণ পাওয়ার এলিটকে তাঁর গল্পে সবসময়ই উন্মোচিত করেছেন। বিশেষ করে তাঁর বেশকিছু গল্পের একটি অন্যতম বিষয় হলো শোষণ। গ্রামীণ পাওয়ার এলিটদের শোষণ। এটিকে 'শ্রেণি-শোষণ' বললে মনে হয় না অত্যুক্তি হবে। গ্রামীণ পাওয়ার এলিট বলতে সাধারণত চেয়্যারম্যান, মেম্বার, জোতদার, সুদখোর, ব্যবসায়ী—এসকল শ্রেণিকে বোঝানো হয়েছে; যাদের ধনলিপ্সা আর প্রতারণার জুড়ি মেলা ভার। তারা নিজেদের শ্রেণিস্বার্থে গ্রামীণ জনজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—জাকির তালুকদারের গল্পে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে ধর্ম, ধর্মের ব্যবহার এবং এটির অপব্যবহার। গ্রামীণ মানুষের জীবনে ধর্মের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে এই ধর্মকে ব্যবহার এবং পুঁজি করে ধর্মীয় নেতা এবং গ্রামীণ পাওয়ার এলিটরা কিভাবে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, সেটি চমত্কারভাবে তাঁর গল্পগুলোতে উঠে আসে।

২.

ছয়টি গল্পগ্রন্থ, সাথে তিনটি অগ্রন্থিত গল্প নিয়ে জাকির তালুকদারের গল্পসমগ্র-১ প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ ২০১০ সালে। একজন লেখককে সামগ্রিকভাবে জানতে-বুঝতে গেলে শুরু থেকেই শুরু করা উচিত। অবশ্য অনেক লেখককে দেখেছি নিজের প্রাথমিক লেখাগুলোকে অস্বীকার করতে। তবে জাকির তালুকদার সেই গোত্রের লেখক নন বলেই ধারণা করি। কেননা, তাহলে তিনি তাঁর গল্পসমগ্র-১ প্রকাশ করতেন না এবং প্রথম গল্পগ্রন্থটিও (প্রকাশকাল ১৯৮৮) গল্পসমগ্রে অন্তর্ভুক্ত করতেন না। কিন্তু এরই মধ্যে জাকির তালুকদার ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করেন ৩০-০৯-২০১৩ তারিখে। তিনি লেখেন, ''কল্পনা চাকমা ও রাজার সেপাই ২০০৬ সালে প্রকাশিত আমার একটি গল্পের বই। সবগুলো গল্প আদিবাসীদের নিয়ে লেখা। আমার বই খুব একটা বিক্রি হয় না। তারপরেও কিছু পাঠক আছেন যারা আমার প্রকাশকদের পুঁজি তুলে আনতে সাহায্য করেন। এই বইটিরও সেই একই অবস্থা। লেখার সময় আমি কোনো পাঠকের কথা মাথায় রাখি না। কিন্তু লেখা শেষ হওয়ার পরে পাঠকগোষ্ঠীর কথা মনে আসে। আমার প্রকাশকও ভেবেছিলেন যে বইটি আদিবাসী ও আদিবাসী নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। কিন্তু এখন খোঁজ নিয়ে দেখছি, বিভিন্ন আদিবাসী নেতা ও সংগঠকদের সাথে কথা বলে দেখছি, তারা কেউ বইটির কথা জানেন না। তারপরেও আমি অখুশি নই। বাঙালি সচেতন পাঠক, যারা বইটির মুদ্রণ শেষ করে দিয়েছেন, তারা অন্তত বইটা পড়ার পরে আদিবাসীদের দিকে আলাদা দৃষ্টিতে তাকাবেন বটে। গোলাপকে নিয়ে যখন কেউ কবিতা লেখেন, কোকিলকে নিয়ে কবিতা লেখেন, তখন গোলাপ বা কোকিল তো সেই কবিতা পড়ে না। কিন্তু যারা পড়েন, সেইসব মানুষ গোলাপ বা কোকিলকে নতুন ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখতে পারেন। 'কল্পনা চাকমা ও রাজার সেপাই' নিয়ে তেমনটা হলেই আমি খুশি।'' গল্পগ্রন্থটি নিয়ে লেখকের আক্ষেপের কারণটা কিছুটা আঁচ করতে পারলাম। 'কল্পনা চাকমা এবং রাজার সেপাই' জাকির তালুকদারের চতুর্থ গল্পগ্রন্থ। আমাদের কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে খুব কমজনই রয়েছেন, যারা আদিবাসীদের নিয়ে আলাদা গল্প-উপন্যাস রচনা করেন। সেখানে জাকির তালুকদার আদিবাসীদের নিয়ে আস্ত একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন, সেটি জেনেই 'কল্পনা চাকমা ও রাজার সেপাই'-এর সব গল্প পড়ে ফেললাম। পাশপাশি, গোটা গল্পসমগ্র এবং আদিবাসীদের নিয়ে আরও কয়েকটি গল্প পড়ার ফলশ্রুতিই আমার এই লেখাটি।

৩.

আমি অত্যন্ত খুশি হই যখন দেখি জাকির তালুকদারের প্রথম প্রকাশিত গল্পগ্রন্থে ['স্বপ্নযাত্রা কিংবা উদ্বাস্তুপুরাণ' (১৯৮৮)] 'আতশপাখি' নামের একটি গল্পে তিনি সাঁওতাল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কথা বলেছেন। এটি বলতেই হচ্ছে যে, প্রথম গল্পগ্রন্থ থেকেই গল্পকার অত্যন্ত সচেতন ছিলেন অবাঙালি সমাজ নিয়ে। গল্পটি সাড়ে তিনকুল বয়সের সাঁওতাল সিধুবুড়োর স্মৃতির জবানীতে বর্ণনা করেছেন লেখক। সিধুবুড়ো স্মরণ করেছে তেভাগা আন্দোলনের কথা, ফসলের ন্যায্য হিস্যার কথা, হাতুড়ি আর কাস্তের কথা। ভদ্দরলোকের কেতাব পড়া সোনার টুকরা এক কমরেডের কথাই স্মৃতিচারণ করে সিধুবুড়ো। অল্পবয়সী সেই কমরেড ছোকড়া সিধুবুড়োর গ্রামে আসে একদিন। ক্ষেতমজুর, ভূমিহীন এবং ছোটকৃষকদের সাথে আলাপ করতে থাকে। সে গ্রামের জোতদারদের কাছ থেকে খাস জমি ছিনিয়ে নিয়ে তাদের মাঝে বণ্টন করতে চায়। ছেলেটিকে লাল ঝাণ্ডা নিয়ে কিষানদের সাথে মিছিল করতে দেখে সিধুবুড়ো। তখনই তার আবার মনে পড়ে যায় তেভাগার সময় ইলা রানিমা, জসীমভাই, সত্যেনদা, জীতেনদা, আক্কাস ভাইদের কথা। এদের সকলের পরিণামের কথা মনে করতেই আঁতকে ওঠে সিধুবুড়ো। সে জানে, এই ছেলেটির লাশ যেকোনো দিন ভেসে উঠবে মহানন্দার পানিতে। হয়েছিলও তাই। সেই তেভাগার পর সাঁওতালপল্লি যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। অস্থির, উদ্ধত, বেপরোয়া এই ছেলেটি আবার কিছুক্ষণের জন্য হলেও সাঁওতালপল্লিতে নতুন করে চাঞ্চল্য এনে দেয়। আবার লাল ঝাণ্ডার মিছিল দেখে আশাবাদী হয় সিধুবুড়ো। না, তাহলে সব শেষ হয়ে যায়নি। উত্তেজনায় দুর্বল হাঁটুর ওপর দাঁড়িয়ে যায় সিধুবুড়ো। তাকিয়ে দেখে, মিছিলে সব নতুন মুখ, এই মুলুকেরই ছেলে, কিষানের ব্যাটা, মজুরের ব্যাটা। তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে সেই একই আগুন জ্বলজ্বল করে জ্বলতে দেখে। সিধুবুড়ো এবার নিশ্চিত হয়। সেই জেদী বেপরোয়া কমরেড মরবার আগে তার বুকের আগুন জ্বালিয়ে রেখে গেছে সবার বুকে। পাশাপাশি নিজের ঘোলাচোখেও আগুনের সোনারাঙা শিখা দেখে আশাবাদী হয়ে ওঠে সিধুবুড়ো। মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যুগে যুগে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এভাবেই টিকে থাকে।

৪.

'পণ্যায়নের ইতিকথা' গল্পটির শিরোনাম থেকেই কিছুটা আন্দাজ করতে পারা যায় এর বিষয়বস্তু কী হতে পারে। আদিবাসীদের কিভাবে পণ্যে পরিণত করেছে আমাদের এনজিও; সেটির চমত্কার উপস্থাপনা রয়েছে গল্পটিতে। এনজিও মালিক মোজাম্মেল হক বেশ কয়েকদিন ধরেই ব্যস্ত। স্থানীয় এমপি'র সহযোগিতায় তিনি গড়ে তুলেছেন এনজিও যার কাজ আদিবাসীদের উন্নয়নে সামগ্রিক ভূমিকা রাখা। দাতাদের ভিজিট উপলক্ষে মোজাম্মেল সাহেব আদিবাসীদের সাজিয়ে-গুছিয়ে এনেছেন স্কুল মাঠে। দাতারা সবকিছু দেখে-শুনে সন্তুষ্ট হলে কমপক্ষে পঁচিশ কোটি টাকার অনুদান পেয়ে যাবে তার এনজিও। দাতাদের একে একে সবকিছু দেখাচ্ছিল মোজাম্মেল সাহেব। আদিবাসী কুটিরশিল্প থেকে শুরু করে শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা (বিশেষ করে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি) খাতে মোজাম্মেল সাহেবের এনজিও যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে; সেটিই দেখাচ্ছিলেন বিদেশি দাতাদের। কিন্তু দাতারা তো আর এটি জানেন না, এই আদিবাসীদের দিয়ে এমন প্রদর্শনী করতে বাধ্য করেছেন মোজাম্মেল সাহেব। লেখক প্রমাণ দেন এভাবে, 'হঠাত্ করেই বেঁকে বসেছিল সুধীর হেমব্রম, নিতাই টুডু আর গির্জার ফাদার আলবার্ট মুর্মু। না, এভাবে তারা আর সঙ সাজতে রাজি নয়। এতদিন তাদের যা বলা হয়েছে তা-ই করেছে মুখ বুঁজে। তাদের দেখিয়ে বারবার কোটি কোটি টাকা এনেছেন মোজাম্মেল হক। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের। অনুদানের টাকায় কিছুই করা হয়নি তাদের জন্য।' কিন্তু এসব বিষয় দাতাদের কান পর্যন্ত মোটেও পৌঁছায় না। সবকিছু ভালোয় ভালোয় শেষ হয়ে যায়। হাঁফ ছেড়ে বাঁচে মোজাম্মেল। এবার ভালোভাবে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে দাতাদের বিদায় করতে পারলেই বাঁচে সে। আদিবাসী সাঁওতাল ও বাঙালি মিলে প্রায় ১২০০ জনের খানাপিনার ব্যবস্থা। কিন্তু সবাই একসাথে খেতে বসলেই বাঁধে আসল বিপত্তি। দাতারা আদিবাসীদের সাথে খাবে বলে তাদের সাথে বসে পড়ে। তারা শুরু করলেও কোনো আদিবাসী খাওয়া শুরু করে না। অবাক হয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করতেই তারা সবাই জানায়, 'আজ আমাদের উপোস। ধর্মে নিষেধ আছে খাওয়া। আজ যে খাবে, সে নিজের পেটে চিমটি কাটবে নিজের পেটের ভেতরে থাকা ছেলেকে।' দাতা সাহেবরা হাত গুটিয়ে থ হয়ে বসে থাকে। আর লোভী মোজাম্মেল অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সাঁওতালগুলোর দিকে। এভাবেই শেষ হয় গল্পটি।

গল্পটিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছেন গল্পকার। প্রথমটি হলো—আদিবাসী ক্ষমতায়নের ধারণা এবং দ্বিতীয়টি—আদিবাসী সমাজে চোয়ানি খাওয়ার অভ্যাসটি। দাতাদের কাছে আদিবাসীদের ক্ষমতায়নকে দেখানোর জন্য সাধারণত কিছু 'সাকসেস স্টোরি' পূর্ব থেকেই তৈরি করা থাকে। বিষয়টি কুমিরের একই বাচ্চা বারবার দেখানোর মতো। এখানে মোজাম্মেল হক সাঁওতাল সত্যকে হাজির করেন সেই 'সাকসেস স্টোরি' হিসেবে। এই সত্যকে ইউনিয়ন পরিষদের ভোটের মাধ্যমে মেম্বার 'বানিয়েছে' এই মোজাম্মেল। দাতাদের সামনে সত্যকে তুলে ধরতেই তারা ইমপ্রেসড হয়ে বলে ওঠে, 'ওহ রিয়েলি! ইউ আর এ পাবলিক রিপ্রেজেন্টেটিভ!' কিন্তু ক্ষমতায়নের এই ধোঁকাবাজি ঠিকই ধরতে পারে সাঁওতালরা। লেখকের ভাষায়, 'তবে ইতোমধ্যেই ওরা বুঝে ফেলেছে, পুরো গোষ্ঠীর মধ্যে একজন বা দুইজন বড় হয়ে গেলে, আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেলেই, বাবুদের পঙিক্তভোজে বসতে পারলেই, তাকে জাতির উন্নতি বলা যায় না। হ্যাঁ, হয়তো হাভাতের সংখ্যা একজন কমেছে। তাতে অন্যদের কী এলো-গেলো। এখন ভদ্রলোকের সঙ্গে ওঠাবসা করতে করতে সত্য মেম্বার নিজের সাঁওতাল পরিচয় নিয়ে লজ্জা পায়। গাঁয়ের মধ্যে তারই একমাত্র ইট-সিমেন্টের বাড়ি, যেখানে আবার লোহারপাতের গেট আছে। অর্থাত্, ইচ্ছে করলেই যে কেউ সত্য মেম্বারের বাড়িতে ঢুকে পড়তে পারবে না।

সাঁওতালরা এখন আর সত্যকে নিজেদের লোক ভাবে না। তবে তার মানে এই নয় যে, তারা তাকে একঘরে করেছে। বরং সত্য নিজে নিজেই আলাদা হয়ে গেছে নিজের সমাজ থেকে।'

পাশাপাশি অনেক আদিবাসী গবেষক, বিশেষ করে সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে চোয়ানিপ্রিয়তা এবং নির্ভরতার কথা উল্লেখ করেছেন। স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া-ঝাটি, জমানো অর্থ বাজারি নেশার পেছনে খরচের প্রবণতা, শারীরিক দুর্বলতার কারণে কায়িক পরিশ্রমের অনভ্যাস—ইত্যাদি বিষয়কে গবেষকরা সাধারণত আদিবাসীদের অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা হিসেবে তুলে ধরে থাকেন। কিন্তু গল্পকার বিষয়টিকে ভিন্নভাবে তুলে এনেছেন। তিনি এটিকে অভ্যন্তরীণ বিষয় বলতে নারাজ। লেখকের ভাষায়, 'সাহেব, আমরা যে কয়দিন বেঁচে থাকি, চোয়ানিই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। জমি কেড়ে নেয় বাবুরা। রিলিফের চাল কেড়ে নেয়। মঙ্গার খয়রাত কেড়ে নেয়। আঙুলের টিপ-ছাপ নিয়ে ভাগিয়ে দেয় আমাদের। পেটের খিদে নিয়ে কোথায় যাই? তখন চোয়ানি। ও-তো ভাতেরই জিনিস। ভাতও খাওয়া হলো, দুঃখ ভোলার নেশাটুকুও হলো। শুধু কি আমরা খাই? বাচ্চাগুলো যখন খিদের জ্বালায় ট্যাঁ ট্যাঁ করে কাঁদে, তখন চোয়ানিতে আঙুল ডুবিয়ে সেই আঙুল চোষাই বাচ্চাদের। তবেই না বাচ্চারা শান্ত হয়ে ঘুমাতে পারে! এই যে সারা গাঁয়ে বাচ্চাদের ঘ্যানঘ্যান নাই, কান্নাকাটি নাই, খাবার চেয়ে সাহেব-বাবুদের বিড়ম্বনায় ফেলা নাই, সে তো এ-চোয়ানির গুণেই।'

নৃবিজ্ঞানী জেমস স্কটের একটি বিখ্যাত বই 'ওয়েপনস অব দি উইক' অর্থাত্ 'দুর্বলদের অস্ত্র', সেখানে তিনি কৃষক সমাজের প্রতিদিনের প্রতিরোধের চিত্র দেখিয়েছেন। প্রত্যক্ষ সহিংসতা অথবা সংঘটিত বিপ্লবের মাধ্যমেই যে প্রতিরোধ করা হয় তা নয়, নানা ধরনের সূক্ষ্ম বিষয়ের মাধ্যমেও প্রতিরোধ করা যায়। সাঁওতাল আদিবাসীদের উপোসের ঘটনাটিকে আমি এক ধরনের 'নিশ্চুপ' প্রতিরোধ হিসেবে দেখতে আগ্রহী। কেননা, তারা সরাসরি দ্বন্দ্বযুদ্ধে যেতে পারছে না মোজাম্মেলের সাথে। এছাড়া বিষয়টির আরও একটি ব্যাখ্যা দেওয়া যেতে পারে। সেটি হলো, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম-কানুন থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মোজাম্মেল সাঁওতাল আদিবাসীদের ব্যবহার করে নিজের তল্পি-তল্পা গোছাতে ব্যস্ত ছিল বিধায় তাদের জিজ্ঞাসা করারই ফুরসত পাননি যে, আজ তাদের খাবারে উপোস কিনা।

গল্পটিকে আমি যেহেতু আদিবাসী সাঁওতালদের নিশ্চুপ প্রতিরোধ হিসেবে দেখতে আগ্রহী; সেহেতু শ্রেণি'সচেতনতা' বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি কথা বলতে চাই। গল্পটিতে আমরা দেখেছি যে, মোজাম্মেল হক আদিবাসীদের নিজের এনজিও-র স্বার্থে ব্যবহার করে আসছে। দীর্ঘদিন এহেন শোষণের শিকার হতে হতেই একসময় তাদের মধ্যে সচেতনতা আসে এবং প্রতিরোধের ভাষা ভেসে ওঠে। প্রাথমিকভাবে মোজাম্মেলের প্রস্তাবে সাঁওতালরা 'না' করায় সে বলে, 'বাহ ভালো কথা বলতে শিখেছিস তো : কে শিখিয়েছে? উত্তর পাড়ার আলতাফ?' আলতাফ এলাকায় কমিউনিস্ট হিসেবে পরিচিত। সাঁওতালদের অনেকেই তার সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে মেশে। হুট করে আলতাফকে সিঁধ কেটে গল্পে ঢুকিয়ে আনলেও সমগ্র গল্পে তাকে কিন্তু আর খুঁজে পাওয়া যায় না। গল্পকার এখানে সাঁওতালদের সচেতনতা সৃষ্টির অবদানটি ইঙ্গিতে কমিউনিস্ট কর্মীকে দিতে চান বলেই আমার মনে হয়েছে। বামপন্থি রাজনীতির প্রতি লেখকের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বই সম্ভবত এটির কারণ। তবে আমি এটিও ভুলে যেতে চাই না যে, বাংলাদেশের যে অঞ্চলে সাঁওতালদের বাস, সেই অঞ্চলে ঔপনিবেশিক সময়ে বিখ্যাত তেভাগা আন্দোলন সংঘঠিত হয় এবং সাঁওতালসহ উত্তরবঙ্গের নানা আদিবাসী ও মার্ক্সবাদী নেতাকর্মীদের সেই আন্দোলনে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল।

নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হওয়াতে সেই শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাথে বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। শিক্ষকতা পেশায় আসার পূর্বে দু-বছর একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষক হিসেবে কাজ করেছি। তখনও বাংলাদেশের নানান অঞ্চলের আদিবাসীদের ওপর খুব কাছ থেকে বিশেষ করে এনজিও কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয়েছিল। জাকির তালুকদারের গল্পসমগ্র-১ যখন পড়ছিলাম; তখন সবকিছুই যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। ঘটনা এবং বর্ণনাগুলো জীবন্ত মনে হচ্ছিল আমার কাছে। তাঁর প্রত্যেকটি গল্পই বাস্তববাদী। নেই কোনো গীতল রোমান্টিকতা, নেই কোনো ধরনের ভাবালুতা। এটি বলা হয়ে থাকে যে, অভিজ্ঞতা ছাড়া কথাসাহিত্য লেখা যায় না। গল্পগুলো পড়ে মনে হয়েছে, নিজ অভিজ্ঞতায় লেখক যা প্রত্যক্ষ করেছেন, তা-ই তিনি কোনো ধরনের বদল ছাড়াই যেন কলমে নিয়ে এসেছেন। লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে পাঠকের বাস্তব অভিজ্ঞতা মিলে যাওয়াটা একটি বিশেষ আনন্দের ব্যাপার। আর একারণেই গল্পগুলো পাঠ করতে গিয়ে আমি যে আনন্দ লাভ করেছি; সেটি মোটেও ভোলার নয়।

 উৎস: দৈনিক ইত্তেফাক , মার্চ ২১,২০১৪, পৃষ্ঠা ২৪,
http://www.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDNfMjFfMTRfNF8yNF8xXzExNzI0MQ==
Share:

0 comments:

Post a Comment

Copyright © The Santal Resources Page | Powered by Blogger Theme by Ronangelo