Place for Advertisement

Please Contact: spbjouralbd@gmail.com

একুশের মুহূর্ত: আন্দোলনের তাত্ত্বিক পর্ব যেভাবে শুরু

 
আহমদ রফিক | আপডেট: | প্রিন্ট সংস্করণ

রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার পক্ষে নানা স্তরে লড়াই শুরু হয়েছিল বাহান্নরও বহু আগে থেকে। ভাষা আন্দোলনের বাঁকবদলের মুহূর্তগুলো নিয়ে আমাদের বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজন—

পূর্ব বাংলায় ঐতিহাসিক রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রতিবাদী প্রকাশ হঠাৎ হাওয়ার আবির্ভাবের মতোই অভাবিত। কেউ এর জন্য প্রস্তুত ছিল না, ভাবনা বা পরিকল্পনা দূরে থাক। এর পূর্বাপর বৈশিষ্ট্য ঘটনার আকস্মিকতা ও প্রতিক্রিয়ার স্বতঃস্ফূর্ততা এবং তাতে অন্তর্নিহিত বাঙালিত্বের ভাষিক জাতীয়তাবোধ। তবে এ কথা ঠিক যে এ আন্দোলন একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের মতো সশস্ত্র চরিত্রের নয়। বরং এটি ছিল শুরুতে নিরস্ত্র বাঙালি বুদ্ধিজীবীর কলমের লড়াই, পরে ছাত্র বুদ্ধিজীবী ও জনতার সম্মিলিত নিরস্ত্র লড়াই।
সূচনায় এ লড়াই অনেকটা বহুকথিত প্রবাদবাক্যের মতো ‘রাম জন্মাবার আগে রামায়ণ’ রচনার মতো ঘটনা। তাই দেখা যায়, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাস কয়েক আগেই পাকিস্তানের সম্ভাব্য রাষ্ট্রভাষার দাবিতে বিতর্ক ও বাদ-প্রতিবাদ মূলত বিবৃতি, মন্তব্য ও লেখার মাধ্যমে। পাকিস্তানবাদী রাজনৈতিক নেতা এবং পাকিস্তানি ভাবাদর্শের অনুসারী ও সমর্থক বুদ্ধিবৃত্তিক বলয়ের বিশিষ্টজনদের তাঁদের আগ বাড়িয়ে কথাবার্তা রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক বিতর্ক ও প্রতিবাদের সূচনা ঘটায়। বাংলার পক্ষে প্রতিক্রিয়াও ঘটে যথারীতি।
এ জাতীয় ঘটনা শুধু যে রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক বিতর্ক উসকে দিয়েছে তাই নয়, পূর্ববঙ্গে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং অবশেষে সংগঠিত আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে, ইতিহাস তৈরি করেছে। আর সে ইতিহাসের বাঁকফেরা সন্ধিক্ষণ হিসেবে কিছু ঘটনা তো বিশেষ মর্যাদায় চিহ্নিত হওয়ার যোগ্য। এমনকি এগুলোকে বলা যায় ইতিহাস-সৃষ্টির চালিকাশক্তির অনুঘটক।
ভারতে প্রায় দুই শতকের দীর্ঘ বিদেশি শাসনের অবসান ঘটে রক্তাক্ত ভূরাজনৈতিক বিভাজনের মাধ্যমে। ইতিহাসবিদগণ এ ঘটনাকে চিহ্নিত করেছেন ঐতিহাসিক ‘দক্ষিণ এশিয়া ট্র্যাজেডি’ হিসেবে। পশ্চাৎপদ বাঙালি মুসলমান দেশবিভাগ ও স্বতন্ত্রভুবন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্যে তাদের অর্থনৈতিক ইচ্ছাপূরণের স্বপ্ন দেখেছিল। তাই পাকিস্তানের পক্ষে তাদের এককাট্টা ভোট-সমর্থন। কিন্তু এ ঘটনা নিশ্চিত হতে না হতে দেখা দেয় দুর্যোগের আভাস এবং তা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে।
এ সম্পর্কে দুটো বাঁকফেরা ঘটনা রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক প্রতিবাদের জন্ম দেয়, যদিও তা তাত্ত্বিক চরিত্রের। ১৯৪৭ সালের ১৭ মে মুসলিম লীগের এক শীর্ষস্থানীয় নেতা চৌধুরী খালিকুজ্জামান এক বক্তৃতায় বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এ বক্তব্য পূর্ববঙ্গবাসী বাঙালি আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের জন্য যে অশনি সংকেত, তেমন উপলব্ধি অন্তত কিছুসংখ্যক বাঙালি বুদ্ধিজীবী তথা কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিকের প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ পায়।
তখনো দেশবিভাগের কাটাকুটির কাজ বাস্তবে শুরু হয়নি। কলকাতা তখনো অবিভক্ত বঙ্গের রাজধানী। কিন্তু হাওয়ায় ভাসছে দেশবিভাগজনিত অস্থিরতা। এ পরিস্থিতিতে ভাষিক চেতনার আবেগে উদ্দীপ্ত হয়ে লেখক-সাংবাদিক আবদুল হক রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে যুক্তিতথ্য-সহকারে গোটা চার প্রবন্ধ লেখেন। প্রথমটির শিরোনাম ‘বাংলা ভাষাবিষয়ক প্রস্তাব’। এটি ১৯৪৭ সালের জুন মাসে দুই কিস্তিতে দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় ছাপা হয়।
একই লেখকের দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ ১৯৪৭ সালের ৩০ জুন দৈনিক আজাদ-এ ছাপা হয়। মাস খানেক পর ইত্তেহাদে-এ প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় প্রবন্ধ ‘উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে’। একই সময়ে একই বিষয়ে ইত্তেহাদ-এ তরুণ সাংবাদিক মাহবুব জামাল জাহেদী লেখেন রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক প্রস্তাব। উল্লিখিত প্রথম লেখক শুধু বাংলাকেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণার দাবি জানান। দ্বিতীয়জন উর্দুর পাশে বাংলা অর্থাৎ অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবি তুলে ধরেন। এ সময়ে এ বিষয়ে লেখেন আরও কয়েকজন। সংস্কৃতি অঙ্গনে দেখা দেয় চাঞ্চল্য।
আর এতে জ্বালানি যোগ করেন বহুভাষাবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। আলীগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অভিমত প্রকাশ করলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এর বিরুদ্ধে ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে দৈনিক আজাদ-এ প্রবন্ধ লেখেন। শিরোনাম ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’। এ ছাড়া এ সময় এ কে নুরুল হক, আবদুল মতীন (‘রাষ্ট্রভাষা মতিন’ নন) প্রমুখ বাংলা ভাষার পক্ষে সোচ্চার হন। সাপ্তাহিক মিল্লাত কড়া ভাষায় সম্পাদকীয় লিখে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করে।
অপেক্ষাকৃত ছোট পরিসরে হলেও প্রাক-পাকিস্তান পর্বে এ ঘটনাগুলো পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক বিক্ষোভ, প্রতিবাদ ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তৈরি করে, এমনকি অনুঘটকের ভূমিকাও পালন করে। বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে এ জাতীয় তৎপরতা কারও মতে ‘ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব’, আমরা বলি ‘তাত্ত্বিক পর্ব’, যেহেতু প্রতিবাদ লেখার মাধ্যমে। এসব ঘটনা দ্রুতই রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে সচেতনতা সৃষ্টি করে, পরোক্ষে প্রেরণা হয়ে ওঠে রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য বিক্ষোভ, প্রতিবাদ ও আন্দোলনের। এ প্রতিবাদের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় পরবর্তী কয়েক মাসে বিশিষ্টজনের লেখালেখিতে।
আহমদ রফিক: ভাষাসংগ্রামী, কবি ও রবীন্দ্র-গবেষক
http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/1071805/%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%95-%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC-%E0%A6%AF%E0%A7%87%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87-%E0%A6%B6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%81

Share on Google Plus

About Tudu Marandy and all

0 comments:

Post a Comment