Online Santal Resource Page: the Santals identity, clans, living places, culture,rituals, customs, using of herbal medicine, education, traditions ...etc and present status.

The Santal Resource Page: these are all online published sources

Santal Gãota reaḱ onolko ńam lạgit́ SRP khon thoṛ̣a gõṛ̃o ńamoḱa mente ińaḱ pạtiạu ar kạṭić kurumuṭu...

Friday, February 28, 2014

মাতৃভাষা: 'আদিবাসী ভাষা ও সাহিত্য সম্মাননা'

পাভেল পার্থ
 দেশের আদিবাসী জনগণের ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ঐতিহ্য সুরক্ষা ও উন্নয়নের অঙ্গীকার করেছে 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০'। কিন্তু এখনও পর্যন্ত আদিবাসী ভাষা ও সাহিত্য সুরক্ষা এবং বিকাশের প্রশ্নে আমরা কোনো ন্যায়পরায়ণ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দেখতে পাইনি। আদিবাসী জনগণ রাষ্ট্রের ঔপনিবেশিক 'পরিচয়-রাজনীতি' এবং 'জনমিতি-বাহাদুরির' ঐতিহাসিক নিশানা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি ও ৯ আগস্ট আদিবাসী দিবসে 'হারিয়ে যাচ্ছে আদিবাসী ভাষা' শিরোনামে গণমাধ্যমে কিছু প্রচার হয়। 'সবকিছু হারিয়ে গেল' বলে নাগরিক জীবনে কিছু 'উন্নয়নবাদী' জাদুঘরমার্কা মেকি কান্না চলে। কিন্তু আদিবাসী জনগণের ভাষা ও সাহিত্যের ন্যায়বিচার সুরক্ষায় রাষ্ট্র জান-জবান নিয়ে দাঁড়ায় না। রাষ্ট্র বরাবরের মতোই বৈষম্যের বন্দুক নিয়েই চোখ রাঙিয়ে থাকে আর একুশে ফেব্রুয়ারি এলে ঠোঁট ফুঁলিয়ে বলে, 'সব ভাষাকে বাঁচাতে হবে।' রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে ভাষা এমনি এমনি বেঁচেবর্তে থাকে না। এর জন্য অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা ও পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। রাষ্ট্রকে এও বুঝতে হবে, বন্দুক দিয়ে এলোপাতাড়ি ফানা ফানা রক্তাক্ত করেও কোনো ভাষাকে গায়েব করে ফেলা যায় না। দেশের আদিবাসী জাতিগুলোর প্রত্যেকের মাতৃভাষার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি, রাজনৈতিক দর্শক ও নীতি বৈষম্যহীন ও ন্যায়পরায়ণ হতে হবে। আদিবাসী ভাষাগুলোর টিকে থাকার প্রশ্নে দেশে বরাবরই কেবল 'মাতৃভাষায় আদিবাসীদের প্রাথমিক শিক্ষা' ইস্যু নিয়ে টালবাহানা চলছে। কিন্তু একটি ভাষা টিকে থাকার অনেক শর্তের ভেতর কাজ করে তার সাহিত্য ও যাপিতজীবনের চর্চার নিরাপত্তা, স্বীকৃতি ও মর্যাদা। রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসীদের ভাষা ও সাহিত্যকে মর্যাদা ও স্বীকৃতি দিয়ে 'আদিবাসী ভাষা ও সাহিত্য সম্মাননা' চালু করা জরুরি। প্রতি বছর আদিবাসী ভাষায় এবং আদিবাসীদের রচিত ও নির্মিত সাহিত্যকীর্তিগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা চালু করা যেতে পারে। আর সরকারের পক্ষে এই কাজটির দায়িত্ব নিতে পারে বাংলা একাডেমি কি আদিবাসী বিষয়ক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। সাহিত্যকর্মের জন্য আদিবাসী শিল্পী-সাহিত্যিকদেরও গুরুত্বপূর্ণভাবে একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পদকসহ দেশের অন্য সব পদক ও পুরস্কারের ক্ষেত্রে বিবেচনা করা জরুরি। মান্দি সমাজের শেরানজিংপালা, রেরে, আজিয়া, চাকমাদের রাধামন-ধনপুদি বা মৈতৈ ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজের রাসপালা, হাজংদের দেবী দুর্গাপালার মতো আদিবাসী জনগণের রয়েছে অবিস্মরণীয় সব মৌখিক আখ্যান। 'আদিবাসী ভাষা ও সাহিত্য সম্মাননা' দেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই মৌখিক ও লিখিত সাহিত্যকীর্তি উভয়কেই গুরুত্ব ও মর্যাদা দিয়ে বিবেচনা করা জরুরি।


২. 'বাংলা সাময়িকপত্রে আদিবাসীকথা' পুস্তকের ভাষ্যমতে, নৃতাত্তি্বক দৃষ্টিভঙ্গিতে আদিবাসী চর্চা শুরু হয় যতদূর সম্ভব ১৮৮৫ সাল থেকে। বিগত শতকের সত্তর-পরবর্তী সপ্ত দশকে চাকমা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্প ও সঙ্গীতে প্রথমবারের মতো জোয়ারের সৃষ্টি হয়। চাকমা সমাজের এই নবজাগরণের যুগে বেশ কয়েকটি প্রতিশ্রুতিশীল সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন জন্ম লাভ করে। ১৯৭২ সালে রাঙামাটি শহরে জুমিয়া ভাষা প্রচার দফতর (জুভাপ্রদ), মুড়োল্যা সাহিত্য ও সংস্কৃতিগোষ্ঠী এবং গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠী নামে তিনটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৯৭২ সালেই বিঝু উপলক্ষে জুভাপ্রদ তাদের প্রথম সাহিত্য সংকলন 'বিজু' এবং মুড়োল্যা সাহিত্য ও সংস্কৃতিগোষ্ঠী 'লুরা' নামে সংকলন প্রকাশ করে। ১৯৭৪ সালে গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠী চাকমা-মারমা-ত্রিপুরা ভাষার কিছু 'আধুনিক গান' নিয়ে প্রকাশ করে গানের সংকলন 'শিঙ্গা'। ১৯৭০ সালে ১২টি শিশুতোষ চাকমা কবিতা নিয়ে রাঙামাটি থেকে প্রকাশ হয় সুগত চাকমার (ননাধন) ছোট কলেবরের কবিতার 'রাঙামাত্যা'। আদিবাসীদের ভাষা, সাহিত্য, কৃষ্টি, শিল্প বিষয়াদির চর্চা, গবেষণা, প্রকাশনা ও প্রচারণার জন্য ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৮১ সালে ঢাকায় গঠিত হয় 'রাঙামাটি ইসথেটিকস কাউন্সিল (রা-ক), পরবতীকালে রাঙামাটির স্থলে জুম বসিয়ে করা হয় জুম ইসথেটিকস কাউন্সিল (জাক)। মুরল্যা লিটারেচার গ্রুপ ১৯৮০ ও রাঙামাটি ইসথেটিকস কাউন্সিল ১৯৮১ সালে চাকমাদের নিজস্ব উদ্যোগে পরপর রাঙামাটি থেকে বাংলা বর্ণমালা ও চাঙমা ভাষায় রাধামন-ধনপুদির প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশ করে। মৃত্তিকা চাকমার সম্পাদনায় সম্পূর্ণ চাঙমা ভাষায় বাংলা হরফে ত্রৈমাসিক কবিতাপত্র প্রথম প্রকাশ হয় রাঙামাটি থেকে ১৯৮১ সালে।

৩. কেবল চাকমা নয়, দেশের সব নিপীড়িত জাতির শিল্প-সাহিত্যের এক লড়াকু শ্রেণী ইতিহাস রয়েছে। এমনকি বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য বিকাশেও রয়েছে আদিবাসী জনগণের ঐতিহাসিক ভূমিকা। ত্রিপুরা মহারাজ ধর্মমাণিক্য ৮৬০ ত্রিপুরাব্দে (১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ) শুক্রেশ্বর এবং বানেশ্বরকে দিয়ে রাজমালা বাংলায় অনুবাদ করান। ত্রিপুরা জাতির সাহিত্যচর্চার সুবর্ণ অধ্যায় সূচিত হয়েছিল ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই। সুরেন্দ্র কুমার দেববর্মা 'ত্রিপুরা ভাষা' নামে একটি সাহিত্যপত্রও প্রকাশ করেন ১৯০৩ সালে। ১৯১৭ সালে মহেন্দ্র দেববর্মার নাটকের বই পতিব্রতা প্রকাশ হয়, রাধামোহন দেববর্মার ককবরক মা গ্রন্থটি প্রকাশ হয় ১৯০০ সালে। বাংলাদেশে ১৯৩৬ সালে খুশী কৃষ্ণ ত্রিপুরার গীতি সংকলন 'খা কাচাংমা খুম্বার' প্রকাশ হয়। ১৩৭০ ত্রিপুরাব্দে প্রকাশ হয় তার ককবরক ককতাং গ্রন্থটি। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, বরেন ত্রিপুরা, নববিক্রম ত্রিপুরা, প্রবাংশু ত্রিপুরা, মহেন্দ্রলাল ত্রিপুরা ও শোভা ত্রিপুরাদের নিজস্ব ককবরক ও বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা নানা বাধা আর নির্যাতনকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে এগিয়েছে।

৪. ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল, গাজীপুর এলাকার মান্দি, কোচ, হাজং, বানাই, ডালু, হদি, রাজবংশী, লেঙাম জনগোষ্ঠীদের ভেতর মূলত মান্দি ও হাজংদের ভেতরেই চলতি সময়ে মুদ্রিত সাহিত্যচর্চা বেশি দেখা যাচ্ছে। নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে ১৯৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত 'উপজাতীয় সাংস্কৃতিক একাডেমী' থেকে আদিবাসী সমাজের সাহিত্য দর্পণ ঘোষণা করে প্রায় অনিয়মিত 'জানিরা' নামে একটি প্রকাশনা প্রকাশ হচ্ছে। এই পত্রিকায় মূলত কিছু গান, কবিতা এবং খুবই গতানুগতিক আলোচনা ছাপানো হয়। দারিং ১৯৯৯ সালে রোমান হরফে কিন্তু মান্দিদের আ.চিক ভাষায় মোট সতেরটি গল্প লিখেছেন ছোটদের জন্য। মান্দিদের ভেতর জেমস জর্নেশ চিরান, মতেন্দ্র মানখিন, সঞ্জীব দ্রং, জেমস ওয়ার্ড খকসী, বচন নকরেক, বাবুল ডি নকরেক, পরাগ রিছিল, রাখী ম্রং, মিঠুন রাখসামদের কবি ও লেখকরা মূলত বাংলা ভাষাতেই নিজস্ব সাহিত্য আওয়াজ তুলেছেন। সিলেটের আদিবাসীদের ভেতর মূলত মৈতৈ মণিপুরি, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, খাসিয়া, মান্দি, হাজং, লেঙাম এবং চা বাগানের বিশাল আদিবাসী বাগানিয়া জনগণ বেশ জোরেশোরে সাহিত্য আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। মৈতৈ মণিপুরি ভাষার কবি একে শেরাম ও বিষুষ্ণপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার কবি শুভাসিস সিনহা খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখক। উত্তরাঞ্চলের সাঁওতাল, মুণ্ডা, ওঁরাও, মাহালী আদিবাসীদের ভেতরও সাহিত্যচর্চা এবং লেখালেখির বেশ একটা জীবন্তধারা বহমান।

৫. বাংলাদেশে আমরা আদিবাসীদের ভাষায় কিংবা বাংলা হরফে আদিবাসী ভাষায় বা আদিবাসীদের নিজস্ব হরফ এবং ভাষায় মূলত কবিতা চর্চা করতেই দেখি বেশিরভাগ কবি ও লেখককে। অনেকেই গবেষণা প্রবন্ধ, মুক্তগদ্য, স্মৃতিচারণ, আলোচনা লিখে থাকেন। সম্পূর্ণ চাঙমা বর্ণমালা ও ভাষায় দেবাশীষ চাকমার উপন্যাস ফেবো প্রকাশ হয় ২০০৪ সালে। এটি প্রকাশ করে পোগাদাঙ, প্রচ্ছদ করেছেন হাপং ত্রিপুরা মিলন। এছাড়াও কিছু বাংলা হরফ ও ভাষায় লেখা গল্প এবং উপন্যাস লিখেছেন কেউ কেউ, বেশকিছু নাট্যচর্চা অব্যাহত আছে আদিবাসী ভাষায় এবং আদিবাসী এলাকায়। চাকমা, মৈতৈ মণিপুরি, মান্দি, বিষুষ্ণপ্রিয়া মণিপুরি, ত্রিপুরা, সাঁওতালদের ভেতর মাতৃভাষা এবং অনেকের ক্ষেত্রে নিজস্ব বর্ণমালায় সাহিত্যচর্চার চল বেশি। কিন্তু সবকিছুর পরেও এও নিদারুণভাবে সত্য যে, দিনে দিনে প্রশ্নহীন কায়দায় রক্তাক্ত হতে হতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে আদিবাসী ভাষাগুলো। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট দেশে একটি জাতিতাত্তি্বক ভাষা জরিপের পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি আদিবাসী ভাষাগুলোর ব্যাকরণগত গবেষণা করার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু আদিবাসীদের ভেতর যারা নিরন্তর সাহিত্যচর্চা করে চলেছেন, তাদের সৃষ্টি আখ্যানের কোনো রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার এখনও নিশ্চিত হয়নি। রাষ্ট্র 'জাতীয় সাহিত্য' বলতে কেবল 'বাংলা ভাষা ও হরফে রচিত' সাহিত্যকেই বোঝে এবং বোঝায়। রাষ্ট্রের এই অধিপতি মনস্তত্ত্ব বদলানো জরুরি। প্রতিবছর আদিবাসী ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা জানানো উচিত। আদিবাসী জনগণের ভাষা ও সাহিত্য সুরক্ষার প্রশ্নে রাষ্ট্রীয়ভাবে 'আদিবাসী ভাষা ও সাহিত্য সম্মাননা' চালু করার মাধ্যমে মুমূর্ষু ভাষার পাশে ন্যায়পরায়ণতার খ্রাম নিয়ে দাঁড়াক রাষ্ট্র। খ্রাম, দামা, মাদল, পস্নু বাজুক আদিবাসী জমিন থেকে জুমে, জুম থেকে বাংলা একাডেমি কি জাতীয় সংসদ অবধি। নিশ্চিত হোক আদিবাসী ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহাসিক অহঙ্কার।

animistbangla@gmail.com
Share:

Friday, February 21, 2014

ভাষার দেশে আদিবাসীদের মাতৃভাষা

সালেক খোকন, অতিথি লেখক
 বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম
সুদেব পাহানের বয়স তখন ছয় বছর। বাবা খোসকা পাহানের ইচ্ছে, ছেলে তার সঙ্গে কাজে যাবে। সংসারে আসবে বাড়তি আয়। কিন্তু মা ভারতী পাহানের স্বপ্নটা ভিন্ন। অন্যদের মতোই তার ছেলে বই হাতে যাবে স্কুলে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে সে। কেউ তাকে ঠকাতে পারবে না। স্ত্রীর সঙ্গে মনোমালিন্যের এক পর্যায়ে সুদেবকে স্কুলে পাঠাতে সম্মতি দেন খোসকা পাহান। ভর্তি করান স্থানীয় কালিয়াগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সুদেব হেসে খেলে বড় হচ্ছিল যে ভাষার আলিঙ্গনে, মায়ের সে ভাষাটিকে সে খুঁজে পায় না বিদ্যালয়ে। সেখানে প্রচলন নেই তার আদিবাসী ভাষাটির। কেউ কথাও বলে না তার প্রিয় সাদরি ভাষায়। চারপাশের সকলেই বাংলাভাষী। ফলে শিক্ষালাভ করতে এসে শিশু বয়সেই বাংলা ভাষাটি তার ওপর আরোপিত হয়। এভাবেই চলতে থাকল কিছুদিন। একে তো ভাষার ভীতি তার ওপর ক্লাসের বন্ধুদের আচরণে সুদেব একেবারেই মুষড়ে পরে। ফলে এক অজানা আতঙ্ক ক্রমেই তার মনে বাসা বাধে। দিনে দিনে স্কুলে যাওয়া তার কাছে রীতিমতো ভয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে প্রথম পরীক্ষাতেই ফেল করে সে। এভাবে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সুদেব হারিয়ে ফেলে স্কুলে যাওয়ার আগ্রহটি। দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী আরেকটি গ্রাম হালজায়। এ গ্রামে কড়া আদিবাসীদের বাস। গোটা দেশে কড়ারা টিকে আছে মাত্র ১৯টি পরিবার। কড়াপাড়ার শিতা কড়া আর কোলো কড়ার আদরের সন্তান কৃষ্ণ কড়া। শিশু বয়সেই কৃষ্ণ কড়া ভর্তি হয় নিকটবর্তী রাঙ্গন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে প্রথম দিনেই কৃষ্ণ যেন সাগরে পড়ে। তার মায়ের কড়া ভাষায় বিদ্যালয়ে কেউ কথা বলে না। বন্ধুরা সকলেই বাঙালি। জাত যাওয়ার ভয়ে কৃষ্ণকে এড়িয়ে চলে সকলেই। অবজ্ঞা আর অবহেলায় কষ্ট পায় কৃষ্ণ। কিন্তু মায়ের উৎসাহে সাহস হারায় না। ফলে এক বেঞ্চিতে বন্ধুবিহীন একাই কাটিয়ে দেয় সে। অজানা বাংলা ভাষা বুঝে পরীক্ষায় পাস করা সে এক দুরূহ ব্যাপার! তাই পাস-ফেলের মধ্যেই কেটে যায় তার ৭টি ক্লাস। হালুয়াঘাটের গারো নারী সুমনা চিসিম। পেশায় একজন এনজিও কর্মকর্তা। পড়াশোনা শুরু করেন নেত্রকোনা জেলার সুসং দুর্গাপুরের বিরিশিরি মিশন স্কুলে। প্রথম স্কুলে গিয়ে সে সময় সুমনাও খুঁজে পাননি নিজের মায়ের ভাষাটিকে। ফলে প্রথম দিনেই ভড়কে যান তিনি। সুমনার ভাষায়, আমার ক্লাস টিচার ছিলেন একজন বাঙালি। স্বভাবতই আমি ভয়ে ভয়ে থাকতাম। ক্লাসে পড়া জিজ্ঞেস করলে ভাষা বুঝতে না পারায় সঠিক উত্তর দিতে পারতাম না। বাঙালি ক্লাসমেটরা হাসাহাসি করত। আমি বুঝতাম না কেন তারা হাসে। টিচারদেরকে তুমি বলে সম্বোধন করতাম। তুমি ও আপনির ব্যবহার জানা ছিল না তখন। প্রথম প্রথম বাংলা ভাষা না জানার কারণে নিজেও ছিলাম অন্ধকারে। ওপরের চিত্রগুলোতে এদেশে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের বাস্তব অবস্থা খানিকটা প্রকাশ পায়। কিন্তু সার্বিকভাবে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের চিত্র আরও করুণ। ভাষা শুধু প্রকাশমাধ্যমই নয়, বরং ভাষা প্রকাশের বিষয়কে নতুন রূপ দিয়ে অর্থবহ করে তোলে। তাই শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার ভূমিকাই প্রধান। কিন্তু এদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আদিবাসী শিশুদের জন্য নেই কোনো আদিবাসী ভাষায় পুস্তক কিংবা আদিবাসী ভাষাভাষী কোন শিক্ষক। অতি সম্প্রতি সরকারি ও বেসরকারিভাবে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি। ফলে আদিবাসী শিশুরা নিঃশব্দে বঞ্চিত হচ্ছে মাতৃভাষার দিগন্ত বিস্তারী আলো থেকে। বাঙালি সমাজের কোমলমতি শিশুরা যখন শিক্ষার শুরুতেই বিদ্যালয়ে আনন্দ-হাসির মধ্যে নিজের মাতৃভাষায় ছড়া কাটছে, নিজের ভাষায় ভাব জমিয়ে বন্ধুত্ব করছে অন্য শিশুদের সঙ্গে তখন আদিবাসী শিশুরা নীরবে, নিস্তব্ধে চোখের জল ফেলে কষ্ট নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বিদ্যালয় থেকে। এমন দৃশ্য যেকোনো বিবেকবান মানুষকে নাড়া দেবে। অন্যদিকে বাংলাভাষার নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আদিবাসীদের ভাষা থেকে বহু শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে বাংলা ভাষায়। সাঁওতালি ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার আন্তরিক সম্পর্কও রয়েছে। পণ্ডিতেরা মনে করেন, সাঁওতালি ভাষা বাংলা ভাষার ব্যাকরণে প্রভাব বিস্তার করেছে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত দেশি শব্দগুলো প্রধানত সাঁওতালি ও মুন্ডা ভাষা থেকে আগত। এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে আদিবাসীদের ভাষাগুলোকে সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে কোচ ও রাজবংশীদের ভাষা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। প্রায় পুরো বিলুপ্ত হয়ে গেছে আদিবাসীদের কুরুখ ও নাগরি ভাষা। এদেশে বসবাসকারী আদিবাসীদের কয়টি ভাষা রয়েছে ? একাধিক তথ্যমতে, পৃথিবীতে ৪টি ভাষা পরিবারের প্রায় ৩০টি ভাষা রয়েছে। এদের মধ্যে কয়েকটি ভাষা পরস্পর এতোটা ঘনিষ্ঠ যে এগুলোকে উপ-ভাষিক বৈচিত্র্য বলা যায়। যেমন তঞ্চঙ্গা মূলত চাকমা ভাষারই অংশ, রাখাইন মারমা ভাষার, লালং বা পাত্র গারো ভাষার এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী ও হাজং বাংলা ভাষার উপভাষা হিসেবে অবিহিত করা যায়। কিছু মতভেদ থাকলেও বাংলাদেশে আদিবাসী ভাষার সংখ্যা ২৫ থেকে ৩৮টি। আদিবাসী ভাষাগুলোকে মূলত ৪টি ভাষা পরিবারে ভাগ করা যায়। অস্টো এশিয়াটিক, তিব্বতি- চীন, দ্রাবিড় ও ইন্দো-ইউরোপীয়। বাংলাদেশে অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাসমূহ আবার দুটি শাখায় বিভক্ত। এগুলো হচ্ছে মোন-খমের ও মুণ্ডারি শাখা। বর্তমানে প্রায় একশটিরও অধিক ভাষা মোন-খমের শাখার অন্তর্ভূক্ত। বাংলাদেশে এ শাখার ভাষার মধ্যে উল্লেখযোগ্য খাসি ভাষা। খাসি ভাষা মৌখিক ভাষা। এ ভাষার কোনো বর্ণমালা নেই। তবে বর্তমানে এ ভাষা রোমান হরফে লেখা হয়। সাঁওতালি ও মুণ্ডা ভাষা দু’টিই মুণ্ডারি শাখার অন্তর্ভূক্ত। উভয় ভাষারই নিজস্ব কোনো হরফ নেই। হাজার হাজার বছর ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে এ ভাষা দু’টি। তবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে রঘুনাথ মুর্মু ‘অলচিকি’ নামে সাঁওতাল বর্ণমালা তৈরি করেন এবং তা সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। চীনা-তিব্বতি ভাষাগুলো আবার কয়েকটি শাখায় বিভক্ত। যেমন: বোডো, কুকি-চীন, সাক-লুইশ ও লোলো-বার্মিজ শাখা। মান্দি বা গারো, ককবোরক (ত্রিপুরা), লিঙ্গাম, পাত্র বা লালং, কোচ, রাজবংশী প্রভৃতি ভাষাগুলো বোডো শাখার অন্তর্ভূক্ত। মৈতেয় বা মণিপুরী, লুসাই, বম, খেয়াং, খুমি, ম্রো, পাংখো ইত্যাদি ভাষাগুলো কুকি-চীন শাখাভুক্ত। রাখাইন, ওঁরাওদের কুড়ুখ, পাহাড়িকা ও মাহালি ভাষা দ্রাবিড় ভাষা পরিবারে অন্তর্ভূক্ত। রাখাইন ভাষা অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ একটি ভাষা। রাখাইন ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে। ওঁরাওদের কুড়ুখ ভাষাটিও আদি ও কথ্য ভাষা। বাংলাদেশে ইন্দো-আর্য পরিবারভূক্ত ভাষার মধ্যে বাংলা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া এই পরিবারে আদিবাসীদের মধ্যে চাকমা ভাষা এবং সাদরি ভাষাও রয়েছে। মণিপুরীদের বিষ্ণুপ্রিয়া, হাজং ইত্যাদি ভাষাও এই শ্রেণীভূক্ত। ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে প্রতি দুই সপ্তাহে হারিয়ে যাচ্ছে একটি ভাষা। বিলুপ্তপ্রায় এসব ভাষা রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বারোপ করেছে ইউনেস্কো। এ ভাষাগুলো চিরদিনের মতো হারিয়ে গেলে তা মানবজাতির জন্য হবে বিপর্যয়কর ও দুর্ভাগ্যজনক। সে বিবেচনায় বাংলাদেশের আদিবাসীদের মাতৃভাষা সংরক্ষণের বিষয়টি অতি দ্রুত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। আদিবাসীদের ভাষারক্ষা কিংবা আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের বিষয়টি আসলেই প্রশ্ন ওঠে বর্ণ নিয়ে। আদিবাসীদের ভাষার লিখিত কোনো বর্ণ নেই। কিন্তু বিশ্বজুড়ে প্রচলিত ইংরেজি ভাষারও নেই কোনো নিজস্ব বর্ণ। ইংরেজি বর্ণগুলো রোমান হরফ থেকে নেওয়া। তাছাড়া চাকমা, মারমা, রাখাইন, সাঁওতাল, ত্রিপুরা, ম্রো, বম, গারো, খাসিয়া, হাজং, মণিপুরি, ওঁরাও, মুণ্ডাসহ ১৫টি আদিবাসী ভাষায় লিখিত রচনা এখনও রয়েছে। ভাষা রক্ষা কার্যক্রমে যা সহায়ক হতে পারে। চাকমাসহ অনেক আদিবাসী ভাষায় এখনো লিখিত রচনা রয়েছে। মণিপুরীদের ভাষা মৈথয়ীর ইতিহাস বহু পুরোনো। সাঁওতালি ভাষায় সাহিত্য ও অভিধান রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খন্ডে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ালেখা হয় এ ভাষায়। মিয়ানমারে মারমা ভাষায় উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। বান্দরবানে জিরকুন সাহু নামে এক আদিবাসী বম ভাষায় অভিধান করেছেন। যেগুলো ভাষা রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। তাই চাইলে সমন্বিত উদ্যোগে সহজেই রক্ষা করা যায় আদিবাসীদের মাতৃভাষাগুলোকে। তাই প্রশ্ন থেকে যায় একটিই- ভাষার দেশে রক্ষা পাবে কি আদিবাসীদের মাতৃভাষাগুলো?
 সালেক খোকন: লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক contact@salekkhokon.me বাংলাদেশ সময়: ০৬৫২ ঘণ্টা, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৪
উৎস:http://www.banglanews24.com/new/%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%80%E0%A7%9F/269420-%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87-%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%80%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%83%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B7%E0%A6%BE.html
Share:

Thursday, February 20, 2014

Tuesday, February 18, 2014

আদিবাসীরা বিচ্ছিন্নতার শিকার, ওদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে

.. আবুল বারকাত

রাজশাহী অফিস

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি প্রফেসর আবুল বারকাত বলেছেন, আদিবাসীরা বিচ্ছিন্নতার শিকার। নিরন্তর এ বিচ্ছিন্নতা তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা-অবিশ্বাস- অনাস্থা-বিদ্বেষ-ঘৃণাবোধ উত্পাদন ও পুনরুত্পাদন করেছে ও করছে। তিনি বলেন, আদিবাসী মানুষের দৃষ্টিতে আদিবাসীদের জীবন নিয়ে ভাবতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আদিবাসী মানুষের এই বিচ্ছিন্নতা আরো বাড়লে বিপর্যয় অনিবার্য। বিষয়টি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। তাই তাদের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

গতকাল সোমবার বিকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত 'বাংলাদেশের আদিবাসী মানুষের রাজনৈতিক অর্থনীতি' শীর্ষক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। মঞ্জুরি কমিশনের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ' (আইবিএস) এর গবেষকদের দক্ষতাবৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর মুহম্মদ মিজানউদ্দিন। আইবিএস পরিচালক প্রফেসর এম শহিদুল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আইবিএস প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রফেসর স্বরোচিষ সরকার।

প্রফেসর আবুল বারকাত বলেন, এদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা-বৈষম্যর প্রক্রিয়াটি শুরু ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভাগের সময় থেকে। তিনি বলেন, অর্থনীতিসহ শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দেশে বেশ উন্নয়ন হয়েছে— সরকার নির্বিশেষে এ দাবি করা হয়। তবে 'উন্নয়ন'-এর এই প্রক্রিয়ায় আর যাই ঘটুক, কোনো অর্থেই আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রকৃত উন্নয়ন ঘটেনি।

Source: http://www.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDJfMThfMTRfMV8yXzFfMTA5NzE5

Share:

Saturday, February 15, 2014

শুরু হচ্ছে দেশের সব ক্ষুদ্রজাতির ভাষার সমীক্ষা

 বিপ্লব রহমান
দেশের সব ক্ষুদ্রজাতির ভাষা সংরক্ষণ ও বিকাশে প্রথমবারের মতো সমীক্ষা করতে যাচ্ছে সরকার। এ জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এরই মধ্যে গ্রহণ করেছে বছরব্যাপী এক কর্মসূচি। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক দল ভাষা ও নৃবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ এবং চৌকস একটি কর্মীবাহিনী আগামী মার্চ থেকে শুরু করবে মাঠপর্যায়ের সমীক্ষার কাজ। ক্ষুদ্রজাতির প্রতিনিধিরাও যুক্ত থাকছেন এ উদ্যোগে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘বাংলাদেশে নৃভাষার বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ নামক পরীক্ষামূলক এই কর্মসূচি চলবে ক্ষুদ্রজাতি অধ্যুষিত দেশের ২০টি অঞ্চলে। এরপর চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গা, ম্রো, লুসাই, বম, রাখাইন, গারো, হাজং, সাঁওতাল, ওঁরাও, মুণ্ডা, খাসিয়া, মণিপুরিসহ প্রায় ৭০টি ক্ষুদ্রজাতির প্রায় ২৫ লাখ মানুষের নিজস্ব ভাষা, উচ্চারণ, বর্ণমালা, ভাষার বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে চলবে গবেষণা। পরে মাঠ পর্যায়ের সব তথ্য ও শ্রুতি সংরক্ষণ করা হবে মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের নিজস্ব তথ্য ব্যাংকে। ভাষাগত সংখ্যালঘুর এসব তথ্য-উপাত্ত নিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে প্রকাশ করা হবে বিশদ গ্রন্থ। এসব গ্রন্থ সবার জন্য উন্মুক্ত করা হবে ওয়েবসাইটেও।
সরকারি অর্থায়নে পুরো সমীক্ষায় ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় চার কোটি টাকা। পরে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে চলবে নিবিড় গবেষণা। বিস্তারিত কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী সময়ে বড় মাপে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ ভাষাভিত্তিক সমীক্ষা হবে।
ভারত উপমহাদেশে ১৯ শতকের শুরুতে প্রথম ভাষাগত সমীক্ষা করেন জর্জ আব্রাহাম গিয়ারসন। এটি একটি ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র হিসেবে বহু গবেষণায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু তথ্য স্বল্পতার কারণে প্রাচীন এই সমীক্ষার রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। এটি যথাযথ মাঠ পর্যায়ের সমীক্ষাও নয়। বাংলাদেশের ভাষাগত সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর সব ভাষাও এতে স্থান পায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, বহু ভাষা ও সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্যপূর্ণ বাংলাদেশে ক্ষুদ্রজাতির সব ভাষা, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, রীতিনীতি, কৃষ্টি-সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে এখন নতুন করে নেওয়া ভাষাবিষয়ক সমীক্ষাটি এ ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখবে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. জীনাত ইমতিয়াজ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভাষা কেবল প্রকাশমাধ্যম নয়, তা একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্বরূপের নির্দেশনাও। তাই বৃহত্তর ভাষার প্রভাবে দেশের ভাষাগত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বহু ভাষা আজ বিপন্ন। ক্ষুদ্রজাতির কয়েকটি ভাষা এরই মধ্যে বিলুপ্তপ্রায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘কিন্তু সংখ্যালঘুদের এসব ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আমাদের এক অমূল্য সম্পদ। তাই এসব সংরক্ষণ ও বিকাশে ক্ষুদ্রজাতির ভাষাবিষয়ক সমীক্ষাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া পড়াশোনা, গবেষণা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় সমীক্ষাটি ব্যবহৃত হবে তথ্যসূত্র হিসেবে।’

‘বাংলাদেশে নৃ-ভাষার বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ কর্মসূচির পরিচালক ড. অরুণা বিশ্বাস বলেন, ‘দেশের ক্ষুদ্রজাতির ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে একেকটি গ্রন্থে একেক রকম তথ্য দেওয়া আছে। অনেক তথ্য আবার নির্ভরযোগ্যও নয়। এমনই বাস্তবতায় ইনস্টিটিউটের ভাষাবিষয়ক সমীক্ষাটি হবে ভাষা ও নৃবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সংশ্লিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বৈজ্ঞানিক পন্থায়। এর তথ্য-উপাত্ত যেন যথাযথ হয়, সেদিকে দেওয়া হবে বিশেষ গুরুত্ব। এসব কারণে আমরা মনে করছি, সব মহলে এই সমীক্ষা গ্রন্থের বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা থাকবে।’


Source: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/13/51736 
Share:

ক্ষুদ্রজাতির ভাষায় বিশ্বকোষ

বিপ্লব রহমান


বাঙালি ছাড়াও এ দেশে বংশপরম্পরায় বসবাস করছে প্রায় ৭০টি ক্ষুদ্রজাতির প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। তাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতিনীতি ও ঐতিহ্য। নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাশাপাশি দেশের উন্নয়নে তারাও সমান অংশীদার। একুশের গৌরবের পথচলায় বাংলা ভাষা ছাড়াও ক্ষুদ্রজাতির নিজস্ব ভাষাতেই হচ্ছে লেখাপড়া, সাহিত্য নির্মাণ, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা। আর এখন ইন্টারনেটভিত্তিক মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া [wikipedia.org], সংক্ষেপে উইকিতে যোগ হয়েছে ক্ষুদ্রজাতির ভাষা। সমগ্র উইকিপিডিয়ার মোট ২৮৫টি ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষার পাশাপাশি স্থান করে নিয়েছে এ দেশের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি, সাঁওতালি ও চাকমা ভাষা। তবে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে সাঁওতালি ও চাকমা ভাষার উইকিপিডিয়া নির্মাণ উদ্যোগ।
নির্মাতাদের সূত্রে জানা গেছে, উইকিপিডিয়া হলো জনমানুষের হাতে তৈরি সাধারণের জন্য লেখা বিশ্বকোষ। বাংলাদেশের ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলা ছাড়া কেবল বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষায় রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ উইকি। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি উইকি নির্মাণ শুরু হয় ২০০৬ সালে। পরের তিন বছর পর্যন্ত এর অগ্রগতি ছিল অনেকটাই সাবলীল। কাজটি একাই অনেকটা এগিয়ে নেন নিউ ইয়র্কপ্রবাসী উত্তম সিংহ। তবে স্বেচ্ছাশ্রমে সমষ্টিগত অবদানকারীর অভাবে ২০০৯ সাল থেকে ধীর হয়ে পড়ে এর কার্যক্রম।


এরপর সাঁওতালি ও চাকমা ভাষায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয় উইকি। ২০০৮ সালে সাঁওতালি উইকি শুরু হলেও একইভাবে উদ্যোগের অভাবে এটি তেমন এগোতে পারছে না। এর নিবন্ধ সংখ্যা মাত্র ১০-১২। অন্যদিকে রাঙামাটির তরুণ কম্পিউটার প্রকৌশলী জ্যোতি চাকমা ও বেসরকারি কর্মকর্তা সুজ মরিজ চাকমা টানা এক বছর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০১২ সালে চাকমা লিপির ইউনিকোড ফন্ট ‘রিবেং ইউনি’ উদ্ভাবন করেন। তাঁদের নির্মিত [uni.hilledu.com] ওয়েবসাইটটি থেকে চাকমা ইউনিকোড ফন্ট ও অভ্র কি-বোর্ড লে-আউট সফটওয়্যার বিনা মূল্যে ডাউনলোড করা যায়। সেখানে দেওয়া আছে ‘রিবেং ইউনি’ ফন্ট ব্যবহারের নির্দেশাবলিও। গত বছরজুড়ে চাকমাভাষী অল্প কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীর উদ্যোগে এগিয়ে চলে চাকমা ভাষায় উইকি নির্মাণকাজ। ১৫-১৬টি নিবন্ধ তৈরির পর এটির কাজও খানিকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। এটিও হাজার হাজার নিবন্ধ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ উইকি হওয়ার অপেক্ষায়।
বাংলা উইকির অন্যতম উদ্যোক্তা ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহামের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রাগিব হাসান। কালের কণ্ঠকে তিনি জানান, উইকিপিডিয়ায় অনেক ক্ষুদ্র ভাষায় বিশ্বকোষ আছে। এমনকি এমন অনেক ইউরোপীয় ভাষা আছে, যার ভাষাভাষীর সংখ্যা সাঁওতালি বা চাকমা ভাষার চেয়েও অনেক কম। তাই উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন এ রকম ক্ষুদ্রতর ভাষার বিশ্বকোষ বিকাশের ওপর বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে।
উইকিপিডিয়ান রাগিব হাসান বলেন, ‘আমার স্বপ্ন, বাংলাদেশের প্রতিটি ভাষায় তথ্যের ভাণ্ডার গড়ে উঠবে। আর ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের এনে দেবে আরেক সমৃদ্ধ একুশ। সাঁওতালি ও চাকমা ভাষার উইকিপিডিয়ার বাস্তবায়ন হয়ে উঠুক এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ।’
সাঁওতালি ও চাকমা ভাষায় উইকি নির্মাণে পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছেন উইকিমিডিয়ার বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের কোষাধ্যক্ষ ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য আলী হায়দার খান। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, বাংলাদেশে ক্ষুদ্রজাতির ভাষাগুলোয় উইকিপিডিয়া তৈরিতে মূল বাধা হলো শিক্ষার ক্ষেত্রে এসব ভাষার চর্চা তেমন হয় না। এসব ভাষায় প্রকাশিত বইপুস্তকও খুব কম। এ ছাড়া ক্ষুদ্রজাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেটের ব্যবহারও সীমিত। ফলে উইকিপিডিয়ায় অবদান রাখতে পারেন এমন স্বেচ্ছাসেবী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
আলী হায়দার খান আরো বলেন, ‘সারা বিশ্বে ছোট ছোট ভাষা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। বিলুপ্ত হতে যাওয়া এসব ভাষাকে সংরক্ষণের জন্য বর্তমানে উইকিপিডিয়াকে বিবেচনা করা হচ্ছে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে। উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে আমরাও বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষাগুলোর চর্চা সচল রাখতে পারি।’
চাকমা ভাষার উইকি নির্মাতা জ্যোতি চাকমা কালের কণ্ঠকে জানান, গত বছর চাকমা উইকিপিডিয়ার কাজ শুরু করেও কর্মশালা করতে না পারায় এ কাজ তেমন এগোতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এ ছাড়া স্বেচ্ছাশ্রমে চাকমা ভাষার উইকি নির্মাণে চাই এক দল নিবেদিতপ্রাণ কর্মী।
See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/13/51736
Share:

Sunday, February 9, 2014

ক্ষুদ্রজাতি পড়বে নিজ ভাষাতেই

বিপ্লব রহমান

একুশের গৌরবের পথচলায় বাংলার পাশাপাশি ক্ষুদ্রজাতির মাতৃভাষাও হয়েছে সমুন্নত। কয়েকটি ক্ষুদ্রজাতির প্রধান ভাষায় লিখিত চর্চা বহু বছর ধরে চলছে বেসরকারি উদ্যোগে। শুধু তা-ই নয়, পাহাড় ও সমতলে বেসরকারি উদ্যোগে চলছে বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্রজাতির নিজ নিজ ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর এবারই প্রথম খোদ সরকারই এগিয়ে এসেছে এই মহতি উদ্যোগ বাস্তবায়নে।
দেশের প্রায় ৭০টি ক্ষুদ্রজাতির প্রায় ২৫ লাখ মানুষ হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরায় ব্যবহার করছেন নিজস্ব মাতৃভাষা। পাশাপাশি বাঙালির সঙ্গে ভাব বিনিময়ে তাঁরা ব্যবহার করেন বাংলা। প্রতিটি ক্ষুদ্রজাতির রয়েছে নিজস্ব প্রাচীন ভাষা, রীতিনীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তবে কয়েকটি ক্ষুদ্রজাতির ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা নেই। এ জন্য তাঁরা রোমান ও বাংলা হরফ ব্যবহার করেন। আবার চর্চার অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক ক্ষুদ্রজাতির ভাষা।
এ অবস্থায় প্রধান কয়েকটি ক্ষুদ্রজাতির ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায়, তাদের নিজস্ব ভাষায় পাঠদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। ভাষাগুলো হচ্ছে, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, গারো ও সাদ্রি। এর মধ্যে সাদ্রি ব্যবহার করেন উত্তরবঙ্গে বসবাসকারী ওঁরাও, মুণ্ডা, মালো, মাহাতো, রাজোয়ার, তেলি, বাগদি, লহরা, কর্মকারসহ ১৫টি ক্ষুদ্রজাতি। পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্তত দুই দশক ধরে বেসরকারি উদ্যোগে চলছে নিজস্ব বর্ণমালায় চাকমা ও মারমা ভাষার প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাতৃভাষায় পাঠ দেন সংশ্লিষ্ট ভাষার শিক্ষক। আর পাঠ্যবইও লেখা হয়েছে বেসরকারি উদ্যোগে। কয়েকটি উন্নয়ন সংস্থাও এই উদ্যোগের সঙ্গে আছে।



অন্যদিকে সাঁওতাল, গারো, ত্রিপুরা ও সাদ্রি- এই চার ভাষায় লিখিত চর্চা থাকলেও প্রাথমিক শিক্ষার জন্য নেই পর্যাপ্ত বই। এ জন্য সরকারি উদ্যোগে এবং ক্ষুদ্রজাতির বুদ্ধিজীবীদের তত্ত্বাবধানে এই চারটি ভাষায় এখন পাঠ্যবই লেখার কাজ চলছে। এরপর ক্ষুদ্রজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে সরকারি উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট ভাষায় পারদর্শী শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শুরু হবে পাঠদান। নিজস্ব হরফ বা বর্ণমালা না থাকায় গারো ও ত্রিপুরা ভাষায় রোমান হরফে এবং বাংলা বর্ণমালায় সাদ্রি ভাষায় লেখা হচ্ছে পাঠ্যবই। তবে বর্ণমালার বিতর্ক মীমাংসার অপেক্ষায় রয়েছে সাঁওতালি ভাষা। বাংলাদেশের সাঁওতালরা বহু বছর ধরে একই সঙ্গে রোমান ও বাংলা হরফে নিজ ভাষার চর্চা করছেন। প্রাথমিক পর্বের লেখাপড়ায়ও চলছে এই দুই বর্ণমালা। তাই বিতর্কটি মিটে যাওয়ার পর এ বিষয়ে সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ব্যবহারিক দিক চিন্তা করে অধিকাংশের মত বাংলা হরফেই সাঁওতালি ভাষায় লেখাপড়ার কাজ এগিয়ে নেওয়ার।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারির গৌরব হচ্ছে সব মাতৃভাষার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা। তাই বহু ভাষাভাষির বাংলাদেশে ক্ষুদ্রজাতি অন্তত প্রাথমিক শিক্ষাটুকু নিজ নিজ মাতৃভাষায় লাভ করবে, এটি একটি মৌলিক মানবিক অধিকার। দেরিতে হলেও সরকার ক্ষুদ্রজাতির বহু বছরের এই দাবিতে সাড়া দিয়েছে। এখন আমরা চাই, এর দ্রুত বাস্তবায়ন।’ তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি আমরা নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য বিষয়ে গবেষণা ও অধ্যয়নের জন্য চাই একটি ক্ষুদ্রজাতির একাডেমি।’
সাঁওতালি ভাষার বর্ণমালা বিতর্কের বিষয়ে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন সরেণ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে বহু বছর ধরে বাংলা বর্ণমালায়ই চলছে সাঁওতালি ভাষায় লেখাপড়া। আমরা নিজেরাও শৈশবে বাংলা হরফেই সাঁওতালি শিখেছি। কিন্তু শিশুদের পাঠদানে রোমান হরফ চালু করা হলে পরবর্তী সময় তাকে অন্যান্য বিষয়ে লেখাপড়ার জন্য আবার নতুন করে শিখতে হয় বাংলা বর্ণমালা। অর্থাৎ শিশুর ওপর চেপে বসে দুটি বর্ণমালা।’ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর এই নেতা আরো বলেন, ‘রোমান হরফে সাঁওতালি শেখার কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই। কারণ আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের লেখাপড়া সব বাংলা ভাষাতেই। আমরা রোমান হরফ গ্রহণ করলে উন্নয়নের মূল জনস্রোত থেকেই পিছিয়ে পড়ব।’
অন্যদিকে রোমান হরফের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন নওগাঁর ধামইরহাট মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক আলবার্ট সরেণ। তিনি বলেন, ‘মিশনারি শিক্ষার হাত ধরে ১৮৪৫ সাল থেকে এই উপমহাদেশে রোমান হরফে চলছে সাঁওতালি ভাষায় লেখাপড়া, সাহিত্যচর্চা ও গবেষণা। ভারতের ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, ওড়িষা, বিহার, আসাম, পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে বহু বছর ধরে চলছে রোমান হরফে লেখাপড়া। নব্বইয়ের দশকে আমাদের দেশে বাংলা বর্ণমালায় শুরু হয়েছে সাঁওতালি ভাষার চর্চা। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিকতার স্বার্থে আমরা রোমান হরফেই প্রাথমিক শিক্ষা চাই। অন্যথায় সারা বিশ্বের সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিজ ভাষায় ভাব বিনিময়ে আমরা পিছিয়ে পড়ব। এ ছাড়া বাংলা হরফে সাঁওতালি ভাষার উচ্চারণও সঠিক হয় না।’
সাঁওতাল শিক্ষার্থী সুভাষ চন্দ্র হেমরম রাজশাহীর নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর আইন বিভাগে পড়ছেন। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য ক্ষুদ্রজাতির মতো আমরাও ঘরের বাইরে ব্যবহারিক কাজে বাংলাভাষা ব্যবহার করি। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা হরফে সাঁওতালি ভাষা শেখা আমার জন্য সহজ হয়েছে। পরে এই বর্ণমালাতেই আমাকে লেখাপড়া করতে হয়েছে বলে নতুন করে আর শিখতে হয়নি।’ - See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/09/50254#sthash.U3mdta9b.dpuf
একুশের গৌরবের পথচলায় বাংলার পাশাপাশি ক্ষুদ্রজাতির মাতৃভাষাও হয়েছে সমুন্নত। কয়েকটি ক্ষুদ্রজাতির প্রধান ভাষায় লিখিত চর্চা বহু বছর ধরে চলছে বেসরকারি উদ্যোগে। শুধু তা-ই নয়, পাহাড় ও সমতলে বেসরকারি উদ্যোগে চলছে বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্রজাতির নিজ নিজ ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়। আর এবারই প্রথম খোদ সরকারই এগিয়ে এসেছে এই মহতি উদ্যোগ বাস্তবায়নে।
দেশের প্রায় ৭০টি ক্ষুদ্রজাতির প্রায় ২৫ লাখ মানুষ হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরায় ব্যবহার করছেন নিজস্ব মাতৃভাষা। পাশাপাশি বাঙালির সঙ্গে ভাব বিনিময়ে তাঁরা ব্যবহার করেন বাংলা। প্রতিটি ক্ষুদ্রজাতির রয়েছে নিজস্ব প্রাচীন ভাষা, রীতিনীতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তবে কয়েকটি ক্ষুদ্রজাতির ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা নেই। এ জন্য তাঁরা রোমান ও বাংলা হরফ ব্যবহার করেন। আবার চর্চার অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে অনেক ক্ষুদ্রজাতির ভাষা।
এ অবস্থায় প্রধান কয়েকটি ক্ষুদ্রজাতির ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায়, তাদের নিজস্ব ভাষায় পাঠদানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। ভাষাগুলো হচ্ছে, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল, গারো ও সাদ্রি। এর মধ্যে সাদ্রি ব্যবহার করেন উত্তরবঙ্গে বসবাসকারী ওঁরাও, মুণ্ডা, মালো, মাহাতো, রাজোয়ার, তেলি, বাগদি, লহরা, কর্মকারসহ ১৫টি ক্ষুদ্রজাতি। পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্তত দুই দশক ধরে বেসরকারি উদ্যোগে চলছে নিজস্ব বর্ণমালায় চাকমা ও মারমা ভাষার প্রাথমিক বিদ্যালয়। এসব বিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাতৃভাষায় পাঠ দেন সংশ্লিষ্ট ভাষার শিক্ষক। আর পাঠ্যবইও লেখা হয়েছে বেসরকারি উদ্যোগে। কয়েকটি উন্নয়ন সংস্থাও এই উদ্যোগের সঙ্গে আছে।
অন্যদিকে সাঁওতাল, গারো, ত্রিপুরা ও সাদ্রি- এই চার ভাষায় লিখিত চর্চা থাকলেও প্রাথমিক শিক্ষার জন্য নেই পর্যাপ্ত বই। এ জন্য সরকারি উদ্যোগে এবং ক্ষুদ্রজাতির বুদ্ধিজীবীদের তত্ত্বাবধানে এই চারটি ভাষায় এখন পাঠ্যবই লেখার কাজ চলছে। এরপর ক্ষুদ্রজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে সরকারি উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট ভাষায় পারদর্শী শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শুরু হবে পাঠদান। নিজস্ব হরফ বা বর্ণমালা না থাকায় গারো ও ত্রিপুরা ভাষায় রোমান হরফে এবং বাংলা বর্ণমালায় সাদ্রি ভাষায় লেখা হচ্ছে পাঠ্যবই। তবে বর্ণমালার বিতর্ক মীমাংসার অপেক্ষায় রয়েছে সাঁওতালি ভাষা। বাংলাদেশের সাঁওতালরা বহু বছর ধরে একই সঙ্গে রোমান ও বাংলা হরফে নিজ ভাষার চর্চা করছেন। প্রাথমিক পর্বের লেখাপড়ায়ও চলছে এই দুই বর্ণমালা। তাই বিতর্কটি মিটে যাওয়ার পর এ বিষয়ে সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ব্যবহারিক দিক চিন্তা করে অধিকাংশের মত বাংলা হরফেই সাঁওতালি ভাষায় লেখাপড়ার কাজ এগিয়ে নেওয়ার।
এসব বিষয়ে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারির গৌরব হচ্ছে সব মাতৃভাষার সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা। তাই বহু ভাষাভাষির বাংলাদেশে ক্ষুদ্রজাতি অন্তত প্রাথমিক শিক্ষাটুকু নিজ নিজ মাতৃভাষায় লাভ করবে, এটি একটি মৌলিক মানবিক অধিকার। দেরিতে হলেও সরকার ক্ষুদ্রজাতির বহু বছরের এই দাবিতে সাড়া দিয়েছে। এখন আমরা চাই, এর দ্রুত বাস্তবায়ন।’ তিনি বলেন, ‘পাশাপাশি আমরা নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য বিষয়ে গবেষণা ও অধ্যয়নের জন্য চাই একটি ক্ষুদ্রজাতির একাডেমি।’
সাঁওতালি ভাষার বর্ণমালা বিতর্কের বিষয়ে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন সরেণ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উত্তরবঙ্গের সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে বহু বছর ধরে বাংলা বর্ণমালায়ই চলছে সাঁওতালি ভাষায় লেখাপড়া। আমরা নিজেরাও শৈশবে বাংলা হরফেই সাঁওতালি শিখেছি। কিন্তু শিশুদের পাঠদানে রোমান হরফ চালু করা হলে পরবর্তী সময় তাকে অন্যান্য বিষয়ে লেখাপড়ার জন্য আবার নতুন করে শিখতে হয় বাংলা বর্ণমালা। অর্থাৎ শিশুর ওপর চেপে বসে দুটি বর্ণমালা।’ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর এই নেতা আরো বলেন, ‘রোমান হরফে সাঁওতালি শেখার কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই। কারণ আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের লেখাপড়া সব বাংলা ভাষাতেই। আমরা রোমান হরফ গ্রহণ করলে উন্নয়নের মূল জনস্রোত থেকেই পিছিয়ে পড়ব।’
অন্যদিকে রোমান হরফের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন নওগাঁর ধামইরহাট মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক আলবার্ট সরেণ। তিনি বলেন, ‘মিশনারি শিক্ষার হাত ধরে ১৮৪৫ সাল থেকে এই উপমহাদেশে রোমান হরফে চলছে সাঁওতালি ভাষায় লেখাপড়া, সাহিত্যচর্চা ও গবেষণা। ভারতের ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, ওড়িষা, বিহার, আসাম, পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি সাঁওতাল অধ্যুষিত অঞ্চলে বহু বছর ধরে চলছে রোমান হরফে লেখাপড়া। নব্বইয়ের দশকে আমাদের দেশে বাংলা বর্ণমালায় শুরু হয়েছে সাঁওতালি ভাষার চর্চা। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিকতার স্বার্থে আমরা রোমান হরফেই প্রাথমিক শিক্ষা চাই। অন্যথায় সারা বিশ্বের সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিজ ভাষায় ভাব বিনিময়ে আমরা পিছিয়ে পড়ব। এ ছাড়া বাংলা হরফে সাঁওতালি ভাষার উচ্চারণও সঠিক হয় না।’
সাঁওতাল শিক্ষার্থী সুভাষ চন্দ্র হেমরম রাজশাহীর নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর আইন বিভাগে পড়ছেন। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য ক্ষুদ্রজাতির মতো আমরাও ঘরের বাইরে ব্যবহারিক কাজে বাংলাভাষা ব্যবহার করি। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা হরফে সাঁওতালি ভাষা শেখা আমার জন্য সহজ হয়েছে। পরে এই বর্ণমালাতেই আমাকে লেখাপড়া করতে হয়েছে বলে নতুন করে আর শিখতে হয়নি।’
Source: http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2014/02/09/50254#sthash.U3mdta9b.dpuf

Share:

Tuesday, February 4, 2014

পুরস্কারে দুর্নীতি, অভিযুক্ত বাম সরকার

বালুরঘাট: বাম আমলে নিজেদের লোকেদের আদিবাসী সান্তালি পুরস্কার দিত সরকার।রবিবার দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাটে “কবি সারদা প্রসাদ কিস্কু স্মৃতি পুরস্কার-২০১৩” প্রাপক সান্তালি নাট্যকার রবিলাল টুডু এই অভিযোগই করলেন। স্থানীয় মন্মথ মঞ্চে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আদিবাসী উন্নয়ন বিভাগ আয়োজিত অনুষ্ঠানে এদিন পুরস্কার নিতে আসেন নাট্যকার রবিলাল টুডু হাজির ছিলেন। তিনি বলেন, ২০০৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সান্তালি অ্যাকাডেমি গঠিত হলেও সেই সময়ে বামফ্রন্টের নিজেদের লোকেদের বাইরে অন্য কাউকে এই পুরস্কার দেওয়া হত না। বালুরঘাট মন্মথ মঞ্চে নাট্যকার রবিলাল টুডু অভিযোগ করে বলেন ষাটের দশক থেকে তিনি পিছিয়ে পড়া আদিবাসী সম্প্রদায়কে তুলে ধরতে নাটক লিখেছেন।বামফ্রন্ট সরকার তাঁর এই প্রচেষ্টাকে কখনই সম্মান জানায়নি।
Share:

ভিন্নমত : আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা

সৌরভ সিকদার| আপডেট:

২৮ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় অধ্যাপক সৌমিত্র শেখরের ‘মাতৃভাষায় শিক্ষা: বাস্তবায়নভিত্তিক পরিকল্পনা চাই’ শিরোনামে প্রকাশিত লেখা সম্পর্কে দুটি কারণে কিছু বলা আবশ্যক মনে করছি। প্রথমত, লেখাটিতে বেশ কিছু তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে, যা যথার্থ নয়। দ্বিতীয়ত, আদিবাসীদের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের পরিপ্রেক্ষিত এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নে যৌক্তিকতা ও সাম্প্রতিক অগ্রগতির বিষয়ে পাঠককে জানানো প্রয়োজন।
প্রথমেই সৌমিত্র শেখরকে ধন্যবাদ জানাই যে তিনি বাংলাদেশের আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষার বিষয় নিয়ে একটি সময়োপযোগী লেখা উপস্থাপন করেছেন। শুরুতেই বলে রাখা ভালো, ২০১০ সালে যে যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেখানে এ দেশের আদিবাসী তথা সরকারি ভাষায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৩ সালের শুরুতেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হয় প্রাক্-প্রাথমিক পর্যায়ে আদিবাসীদের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির। এ বিষয়ে শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে গঠিত হয় একটি জাতীয় কমিটি। সেই কমিটির সুপারিশে প্রাথমিকভাবে ছয়টি (চাকমা, মারমা, ককবোরক, মান্দি, সাঁওতালি ও সাদরি) ভাষায় পাঠ্যপুস্তক তৈরি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া চলছে।


কাজেই অধ্যাপক সৌমিত্র শেখরের ‘প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনে কাজ করেছে প্রথাগত এনজিওগুলো, এই তথ্য যথার্থ নয়। তবে এনজিওগুলো এ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে, তা অস্বীকার করার অবকাশ নেই। তিনি চাকমাদের জনসংখ্যা উল্লেখ করেছেন ‘তিন লাখের মতো’ কিন্তু ২০১১ সালের জনগণনার হিসাবে চার লাখ ৪৪ হাজার। তিনি আরও লিখেছেন, ‘জনগোষ্ঠীর দু-একটির মাত্র সম্পূর্ণ লিপি বা হরফ আছে’ এই তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা জানাতে চাই যে বাংলাদেশের আদিবাসীদের মধ্যে চাকমা, মারমা, মণিপুরি ও ম্রোদের নিজস্ব লিপি আছে, যা দ্বারা পাঠ্যপুস্তক তৈরি করে উন্নয়ন সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, সাঁওতালেরা তাদের ভাষায় রোমানলিপি ব্যবহার করে আসছে ১০০ বছরেরও অধিক। এ ছাড়া বাংলাদেশে তারা বাংলা লিপিও ব্যবহার করে থাকে। মন্ত্রণালয়ে গঠিত আদিবাসীদের মাতৃভাষা বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটি লিপির প্রশ্নে সাঁওতালিদের মধ্যে বিভক্তি থাকায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সাঁওতাল সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু তারা অদ্যাবধি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় সাঁওতালি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক তৈরির বিষয়টি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। লিপির বিষয়ে কিছু তথ্য জানানো প্রয়োজন যে মন্ত্রণালয় বা বাস্তবায়ন কমিটি কোন জনগোষ্ঠী কোন লিপি ব্যবহার করবে, তা সম্পূর্ণ তাদের সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
এ ক্ষেত্রে নিজ নিজ ভাষার ওপর তাদের যে মমতা ও আবেগ রয়েছে, তা যেন বিদ্যমান থাকে একুশে ফেব্রুয়ারির গৌরবময় ঐতিহ্যের এই দেশে, তা রক্ষা করার চেষ্টা করেছে কমিটি। যাদের নিজস্ব লিপি নেই, তারা রোমান অথবা বাংলা—যে হরফেই হোক না কেন, এটি নির্ধারণ করবে নিজ নিজ ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠী। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের ত্রিপুরাদের ককবোরক ভাষা লিখিত হয় বাংলা হরফে কিন্তু বাংলাদেশের ত্রিপুরাদের দাবি অনুযায়ী তারা রোমান হরফ গ্রহণ করেছে।
লেখক সৌমিত্র শেখর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দু-চার বছর পর এই বিদ্যালয় বা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। আশঙ্কাটি অমূলক। কেননা এটি কোনো এনজিওর প্রকল্পভিত্তিক বিদ্যালয় নয়। দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০১৪ সাল থেকে যে প্রাক্-প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাদান কর্মসূচি চালু হতে যাচ্ছে, সেখানে বিভিন্ন ভাষার আদিবাসীরা শুধু তাদের ভাষায় (পর্যায়ক্রমিকভাবে) প্রাক্-প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা লাভের সুযোগ পাবে। যেহেতু সরকারিভাবে এবং সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষাদান করা হবে, সে কারণে এটি বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা নেই।
এবার আসি আদিবাসীদের মধ্যে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু প্রসঙ্গে। লেখক প্রস্তাব করেছেন, সবার আগে অপেক্ষাকৃত কম আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষার আওতায় আনতে হবে। ভাষা ও শিক্ষা নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, আমরা সবাই এ বিষয়ে একমত। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে এ মুহূর্তে এটি করা সম্ভব নয়। কেননা খুমি, খেয়াং, পাংখোয়া প্রভৃতি সংখ্যায় স্বল্প হলেও এই আদিবাসীরা যে দুর্গম এলাকায় থাকে, সেখানে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই বললেই চলে, এমনকি তাদের মধ্যে মাতৃভাষায় শিক্ষাদান উপযোগী শিক্ষক তৈরি করতেও সময়ের প্রয়োজন। এই প্রধান দুই বাস্তবতা সামনে রেখে বাংলাদেশের আদিবাসীদের মধ্যে পর্যায়ক্রমিকভাবে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কেই বেছে নেওয়া হয়েছে।
সূচনাবর্ষে (২০১৪ বা ২০১৫) পাঁচটি আদিবাসী ভাষা এবং পরবর্তী বর্ষে আরও কিছু ভাষা এভাবে ক্রমান্বয়ে সম্ভাব্য সব আদিবাসীর মাতৃভাষায়
প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত সম্পন্ন করা হবে। প্রাথমিক সমাপনী বা পঞ্চম শ্রেণীতে যাওয়ার আগেই ভাষিক সমন্বয় (ব্রিজিং) অর্থাৎ মাতৃভাষা থেকে পর্যায়ক্রমে বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শেখা এবং বাংলা মাধ্যমে শিক্ষালাভের যোগ্যতা অর্জন করার প্রক্রিয়াটি আধুনিক এমএলই (মাল্টি লিঙ্গুয়াল এডুকেশন) ব্রিজিং-প্রক্রিয়া মেনেই করা হয়েছে।
শিক্ষানীতির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এটি বাস্তবায়নে প্রয়োজন সময় ও আন্তরিকতার। ইতিমধ্যে অনেকটা সময়ক্ষেপণ হলেও আশা করি, সরকার তার আন্তরিকতা দিয়ে আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করবে।

 সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
jeweel1965@gmail.com

ূগজপডে: http://www.prothom-alo.com/opinion/article/113224/%E0%A6%86%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%80%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%83%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%B7%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%BE

Share:
Copyright © The Santal Resources Page | Powered by Blogger Theme by Ronangelo