Online Santal Resource Page: the Santals identity, clans, living places, culture,rituals, customs, using of herbal medicine, education, traditions ...etc and present status.

The Santal Resource Page: these are all online published sources

Santal Gãota reaḱ onolko ńam lạgit́ SRP khon thoṛ̣a gõṛ̃o ńamoḱa mente ińaḱ pạtiạu ar kạṭić kurumuṭu...

Saturday, March 30, 2013

সান্তালী লিপিতে সান্তালী পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবিতে ফুলবাড়ীতে আদিবাসীদের মানববন্ধন

সান্তালী লিপিতে সান্তাল শিশুদের সান্তালী পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবিতে গতকাল শুক্রবার দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে আদিবাসীদের বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে ঘন্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। ফুলবাড়ী উপজেলা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতি ও সান্তাল ষ্টুডেন্টস্ ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে স্থানীয় সুজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ফুলবাড়ী-মাদিলা সড়কের ওপর ব্যানার ও ফ্যাস্টুন নিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। এই কর্মসূচীতে ফুলবাড়ীসহ পার্শ্ববর্তী বিরামপুর, নবাবগঞ্জ ও পার্বতীপুর উপজেলার বিভিন্ন বয়সী আদিবাসী নারী-পুরুষ অংশ গ্রহণ করেন।

মানববন্ধন চলাকালে উপজেলা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতি’র সভাপতি চুন্নু টুডু’র সভাপতিত্বে সভায় সান্তালী পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের দাবির সমর্থনে বক্তব্য রাখেন সান্তালী ইউকি বাংলাদেশ-এর সম্পাদক ও সান্তালী ভাষা লেখার সফট্ওয়্যার (হরকাথা) উদ্ভাবক সমর মাইকেল সরেন, বাংলাদিশাম সান্তাল বাইশি’র সভাপতি প্রফেসর এসসি আলবার্ট সরেন, জগেন হাসদা, সান্তালী ইউকি বাংলাদেশ-এর সভাপতি সুবাস হেব্রম, তুহিন মার্ডি, ফুলজেনসিউস মুরমু, সান্তাল মার্শাল এসোসিয়েশনের জীবন মুরমু, সান্তাল ষ্টুডেন্টস ইউনিয়নের রাজশাহী মহানগর শাখার সভাপতি মুকুল কিস্কু প্রমূখ।
পরে সুজাপুর উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে উপজেলা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতি’র সভাপতি চুন্নু টুডু’র সভাপতিত্বে “মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলা নয়, সান্তালী লিপিতে সান্তাল শিশুদের সান্তালী পাঠ্যপুস্তক প্রনয়ন কর এবং আমাদের ভাষার বর্ণমালা আমরাই নির্ধারণ করবো” শীর্ষক এক আলোচনা সভাপতি অনুষ্ঠিত হয়।
Source: http://bdn24x7.com/?p=94326
Share:

Monday, March 25, 2013

সাঁওতালি ভাষায় নিউজ পোর্টাল

সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ভাষায় চালু হলো ওয়েবসাইট ও নিউজ পোর্টাল www.santaliwiki.org। শুক্রবার দিনাজপুর প্রেসক্লাবে সাঁওতালি উইকি বাংলাদেশ আয়োজিত দিনব্যাপী এক কর্মশালায় সাইটটি উদ্বোধন করা হয়। এ সময় সাঁওতালি ভাষায় এসএমএসের মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন সুবিধাও চালু করা হয়।

প্রাথমিক অবস্থায় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবির মাধ্যমে এ সেবা ব্যবহার করা যাবে।
কর্মশালায় সাঁওতাল উইকি বাংলাদেশের সভাপতি সালভাদর পাউরিয়া, সাধারণ সম্পাদক সমর মাইকেল সরেন এবং সাঁওতাল গোত্রপ্রধানদের সর্বোচ্চ নেতা দেশ পাগানা কেরোবিনসহ ১৭টি সাঁওতাল ছাত্রসংগঠনের ৭০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
Source: http://ekotha.com/tech/?p=804

সাঁওতালি ভাষায় নিউজ পোর্টাল সালাহ উদ্দিন আহমেদ, দিনাজপুর
  সাঁওতাল সম্প্রদায়ের ভাষায় চালু হলো ওয়েবসাইট ও নিউজ পোর্টাল www.santaliwiki.org। শুক্রবার দিনাজপুর প্রেসক্লাবে সাঁওতালি উইকি বাংলাদেশ আয়োজিত দিনব্যাপী এক কর্মশালায় সাইটটি উদ্বোধন করা হয়। এ সময় সাঁওতালি ভাষায় এসএমএসের মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন সুবিধাও চালু করা হয়।
প্রাথমিক অবস্থায় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবির মাধ্যমে এ সেবা ব্যবহার করা যাবে।
কর্মশালায় সাঁওতাল উইকি বাংলাদেশের সভাপতি সালভাদর পাউরিয়া, সাধারণ সম্পাদক সমর মাইকেল সরেন এবং সাঁওতাল গোত্রপ্রধানদের সর্বোচ্চ নেতা দেশ পাগানা কেরোবিনসহ ১৭টি সাঁওতাল ছাত্রসংগঠনের ৭০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
Source: http://www.kalerkantho.com/index.php?view=details&type=gold&data=news&pub_no=1191&cat_id=1&menu_id=61&news_type_id=1&index=0&archiev=yes&arch_date=24-03-2013**********************************************************************************  
Share:

Saturday, March 23, 2013

উইকিতে সাঁওতালি ভাষা

বিপ্লব রহমান ইন্টারনেটভিত্তিক মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ায় (সংক্ষেপে উইকি) যুক্ত হয়েছে সাঁওতালি ভাষা। বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার পর এটি বাংলাদেশের তৃতীয় কোনো ভাষা, যা উইকিতে যুক্ত হলো। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উইকিতে সাঁওতালি ভাষা যুক্ত হওয়ায় এই ভাষার শিক্ষার্থী ও আগ্রহীদের জন্য তো বটেই, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে অবাধ সুযোগ উন্মুক্ত হলো।
উদ্ভাবকদের সূত্রে জানা গেছে, সাঁওতালি ভাষাকে ইন্টারনেট জগতে প্রতিষ্ঠা করতে গত মাস থেকে শুরু হয়েছে এই ভাষার উইকি নির্মাণের কাজ। গত বছর ইউনিকোডভিত্তিক সাঁওতালি টাইপিং সফটওয়্যার 'হড় কাথা' চালু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় নির্মাণ করা হচ্ছে এই ভাষার উইকি। ইতিমধ্যে অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। গবেষক ও আগ্রহীদের জন্য শিগগির তা উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
সাঁওতালি ভাষার উইকি নির্মাণ কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিয়েছেন হড় কাথার উদ্ভাবক সমর মাইকেল সরেন। এই কাজে তাঁকে নেপথ্য সহযোগিতা দিয়েছেন বাংলা উইকির প্রতিষ্ঠাতা ড. রাগিব হাসান। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে রাগিব হাসান বলেন, 'উইকি জগতে আদিবাসী ভাষাগুলোর অংশগ্রহণে উইকি জগৎ আরো সমৃদ্ধ হবে। বাংলাদেশের তরুণ সান্তাল প্রযুক্তিপ্রেমীদের সক্রিয় অংশগ্রহণেই সাঁওতালি ভাষার উইকি আরো সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে বলে মনে করছি।' তিনি সাঁওতালি উইকিতে বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর তরুণ প্রযুক্তিপ্রেমীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ কামনা করেন।
সাঁওতালি ভাষার উইকির প্রধান নির্মাতা সমর মাইকেল সরেন নিজেও একজন সাঁওতাল। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, 'আমরা সাঁওতাল বা সান্তালরা জাতি হিসেবে স্বয়ংসম্পূর্ণ।
আমাদের সমৃদ্ধিশালী সংস্কৃতি, কৃষ্টি, রীতি-নীতি, ঐতিহ্য রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য শব্দভাণ্ডারে সমৃদ্ধ, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও উন্নত ভাষা। উপরন্তু আমাদের রয়েছে বর্ণমালা, সমৃদ্ধ ব্যাকরণ ও অভিধান।'
সমর সরেন বলেন, 'নানা কারণে আদিবাসীদের মৌলিক মানবিক অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি সাঁওতালি ভাষাও আজ হুমকির মুখে। সাঁওতালি ভাষার চর্চা ও গবেষণা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও পায় না। এমন অবস্থায় আমরা নিজেরাই এই ভাষাকে রক্ষা করতে উদ্যোগী হয়েছি। এরই অংশ হিসেবে আমরা নির্মাণ করছি সাঁওতালি ভাষার মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া।'
সমর সরেন আরো বলেন, 'উইকি হচ্ছে এমন একটি মাধ্যম, যেখানে যে কেউ তাঁর নিজ জন-জাতির জ্ঞান-বিজ্ঞান, সংস্কৃতিবিষয়ক তথ্য বা ছবি যুক্ত করে মাতৃভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারবেন। আশা করছি, সাঁওতালি ভাষার উইকি নির্মাণে বাংলাদেশি সাঁওতাল জনগোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে।'
সান্তাল গ্র্যাজুয়েট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (সাগাব) সভাপতি সালভাতর পাউরিয়ার নেতৃত্বে মোবাইল ভার্সনে সাঁওতালি উইকির অনুবাদ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। কালের কণ্ঠকে সালভাতর পাউরিয়া বলেন, 'উইকিতে সান্তালি ভাষা যোগ করতে পেরে আমরা গর্বিত। উইকির জগতে এই ভাষা অনন্য স্বাক্ষর রাখবে বলে আমরা মনে করি।'
সাঁওতালি উইকিপেডিয়ান সুনীল ডগলাস হেমব্রম বলেন, 'তথ্য-প্রযুক্তিতে সান্তালি সংস্কৃতি ও ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে সান্তালি ভাষার উইকি হবে একটি মাইলফলক।'
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কাসহ অল্প কয়েকটি দেশে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর বসবাস। তবে বাংলাদেশ ও ভারতেই তাঁরা সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় বাস করছেন। বিশ্বে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আনুমানিক ৮৬ লাখ। তাঁদের রয়েছে ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, কৃষ্টি, রীতি-নীতি, সাহিত্য, লোকগাঁথা ও সমৃদ্ধ ইতিহাস। তাঁরা নিজেদের 'সান্তাল' বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন।
১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সিধুঁ-কানহু নামক দুই সাঁওতাল সহোদর জীবন দিয়ে গড়ে তোলেন সাঁওতাল বিদ্রোহ, যা ইতিহাসে ব্রিটিশ রাজের সিংহাসন-কাঁপানো 'সান্তাল হুল' নামে পরিচিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাঁওতালরা সরাসরি সম্মুখ সমরে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। স্বাধীন দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও রয়েছে তাঁদের সক্রিয় অবদান।
উদ্যোক্তারা জানান, সাঁওতালি ভাষার উইকিটি বর্তমানে উইকি'র ইনকিউবেটরে রয়েছে। বিভিন্ন তথ্য সাঁওতালি ভাষায় অনুবাদ করে এই ভাষার উইকিতে যুক্ত করার কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। মিডিয়া উইকির (উইকিপিডিয়া সফটওয়্যার) অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। মোবাইল ফোন থেকেও যাতে ইন্টারনেট ব্রাউজ করে এই ভাষার উইকি পাঠ করা যায়, এমন সুবিধা থাকছে। সাঁওতাল ভাষায় পারদর্শী যে কেউ এই অনুবাদ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন। সাঁওতালি উইকিতে অনুবাদ কার্যক্রমে প্রতিদিনই এই ভাষার প্রযুক্তিপ্রেমীরা যোগদান করছেন। পারস্পরিক সহযোগিতায় তথ্য ও বানান শুদ্ধির কাজ চলছে। বাংলা উইকির জন্য 'বিএন' এবং ইংরেজি উইকির জন্য 'ইএন'-এর আদলে আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আইএসও'র ল্যাঙ্গুয়েজ কোড হিসেবে সাঁওতালি উইকির জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে 'এসএটি' শব্দ।
সাঁওতালি উইকিপিডিয়ানরা আরো জানান, এ ভাষায় বিভিন্ন তথ্য অনুবাদ করে তা উইকিতে যোগ করার ক্ষেত্রে প্রায়ই তাদের সাঁওতালি ভাষার অভিধানের সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। শিক্ষার্থী ও গবেষকদের যেন সাঁওতালি অভিধান দুষ্প্রাপ্যতায় ভুগতে না হয়, সে চিন্তা থেকে তাঁরা সাঁওতালি উইকিতে ইংরেজি-সাঁওতাল ভাষার অভিধান ই-বুক আকারে যুক্ত করতে যাচ্ছেন। আগ্রহী যে কেউ বিনা মূল্যে পিডিএফ আকারে সাঁওতালি অভিধানটি ডাউনলোড করে নিতে পারবেন।

Source:http://www.kalerkantho.com/print_news.php?pub_no=859&cat_id=1&menu_id=13&news_type_id=1&index=9 
Share:

Friday, March 22, 2013

সাঁওতালি ভাষার উইকি সম্পর্কে রাগিব হাসান (বাংলা উইকি’র প্রশাসক ও প্রধান প্রতিষ্ঠাতা/নির্মাতা) এর শুভেচ্ছা ...


সাঁওতালী উইকিপিডিয়ার জন্য যারা কাজকরছেন, সবাইকেঅনেক ধন্যবাদ।উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ শাখার কর্মীরাইতিমধ্যেই আপনাদের সাথে যোগাযোগ করেছেএবং পরেরপ্রতিটি ধাপেপ্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিয়ে যাবে। এইব্যাপারটি সবাইকে জানাবার জন্য বিপ্লবরহমান ভাইকেওঅনেক ধন্যবাদ।উনার মাধ্যমেইআসলে সাঁওতাল চাকমাভাষাভাষীদের সাথে যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের ভাষাগুলোর মধ্যে বাংলার পরেএসেছিলো বিষ্ণুপ্রিয়ামণিপুরি উইকিপিডিয়া, যার কাজএকাই অনেকএগিয়ে নিয়েছিলেননিউইয়র্ক প্রবাসীউত্তম সিংহ।তবে ইউজারকমিউনিটি গড়েনা ওঠায়সেটার কাজথেমে গেছে।সাঁওতালীর ক্ষেত্রে যাতে সেটা নাহয়, সেজন্যপ্রথম থেকেইকমিউনিটি গঠনেরকাজ করতেহবে
উইকিপিডিয়াতে অনেক ক্ষুদ্র ভাষায় বিশ্বকোষআছে, এমনকিএমন অনেক(ইউরোপীয়) ভাষা আছে যার ভাষাভাষীরসংখ্যা সাঁওতালীরবা চাকমাভাষার চাইতেঅনেক অনেককম। তাইউইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন এরকম ক্ষুদ্রতর ভাষারবিশ্বকোষ বিকাশেরউপরে বেশগুরুত্ব দিচ্ছে।
আমার স্বপ্ন, বাংলাদেশের প্রতিটি ভাষায় তথ্যের ভাণ্ডারগড়ে উঠবে।আর ডিজিটালপ্রযুক্তি আমাদের এনে দেবে আরেকএকুশ। সাঁওতালীউইকিপিডিয়ার বাস্তবায়ন হয়ে উঠুক এইস্বপ্নের দিকেপ্রথম পদক্ষেপ
ড. রাগিব হাসান (বাংলা উইকি প্রশাসক ও প্রধান প্রতিষ্ঠাতা/নির্মাতা)

 Source: http://mukto-mona.com/bangla_blog/?p=25079
*****************************************************************************
Share:

সান্তালি ভাষার হরফ সমস্যা নিরসনে রাষ্ট্রের উচিত যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়া

খোকন মুরমু
আবহমানকাল ধরেই বাংলাদেশে বৃহত্তর বাঙালি জাতির পাশাপাশি বসবাস করছেন অনেক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ। এসব জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও ভাষা। ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৯ নভেম্বর একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ৫২'র ভাষা আন্দোলনে বাঙালির রক্তদানকে চিরস্মরণীয় করেছেন। একুশের এ চেতনা সারাবিশ্বের সব রাষ্ট্রকে নিজ দেশে নানান ভাষাভাষী মানুষের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকারকে প্রতিষ্ঠা করতে অনুপ্রাণিত করবে। অপ্রিয় হলেও সত্য, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভকারী বাংলা ভাষাভাষীর এদেশেই বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতির ভাষা আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। অবাঙালি এসব মানুষ আজ নিজ দেশেই নিজস্ব মাতৃভাষা চর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আনন্দের বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার দেরিতে হলেও আজ দেশের অন্যান্য জাতিসত্তার মাতৃভাষার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছেন। এরই মধ্যে এসব জাতিসত্তার মানুষের মধ্যে আশার আলো সঞ্চার করেছে বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত 'শিক্ষা নীতি-২০১০'। বাংলাদেশে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিশুদের নিজ মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে 'জাতীয় শিক্ষা নীতিতে' মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রদানের বিল পাস করেছেন। শিক্ষা নীতি-২০১০ বাস্তবায়নে সরকার ২০১৪ সাল শিক্ষাবর্ষের প্রথম থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সান্তাল, চাকমা, গারো, ত্রিপুরা, মারমা, ম্রো ও ওঁরাও শিশুদের নিজ মাতৃভাষায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।

গত ৭ সেপ্টেম্বর (২০১২) 'মণিপুরী ভাষা দিবস' পালন শীর্ষক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য এরই মধ্যে দিয়েছে এ নীতি বাস্তবায়নের সবুজ সংকেত। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, 'কাউকে ছোট বা কাউকে বড় নয়, বাংলাদেশের সব নাগরিকের শিক্ষা সুনিশ্চিত করার জন্য সরকার যুগান্তকারী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছেন। সরকার আজকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের মায়ের কোলের পর নিজ নিজ ভাষায় শিক্ষা প্রদানের নিমিত্তে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুর ওপর জোর দিয়েছেন।' গত ৫ নভেম্বর ২০১২ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে 'ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের পদ্ধতি ও কৌশল নির্ধারণ' সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব। আলোচনায় সরকারের অন্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে চাকমা, সান্তাল, গারো, ত্রিপুরা, মারমা, ম্রো ও ওঁরাও জাতিসত্তার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় গৃহীত হয়, চাকমা, মারমা, ম্রো তাদের নিজস্ব লিপিতে এবং ত্রিপুরা, গারো শিশুদের জন্য রোমান লিপিতে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হবে। তংচঙ্গা জাতিসত্তার ভাষা ও সংস্কৃতি চাকমাদের সঙ্গে প্রায় মিল থাকায় এবং আপত্তি না থাকায় উভয় ভাষার জন্য চাঙমা হরফে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ণ করা হবে। সান্তাল ও সাদ্রী ভাষাভাষী শিশুদের জন্য উত্তরবঙ্গের সান্তাল এবং ওঁরাও উভয় প্রতিনিধি 'বাংলা' হরফে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নের প্রস্তাব দেন। সান্তাল ভাষার জন্য ওই প্রস্তাব সভায় গৃহীত হয়নি। কারণ বাংলাদেশে সান্তালি লেখার ক্ষেত্রে রোমান হরফ বেশি জনপ্রিয়। এ আলোচনা সভায় সান্তাল প্রতিনিধিগণকে তাই সমাজের সঙ্গে বসে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।

সান্তালি ভাষার জন্য হরফ বির্তকের এ জের ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরে অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বাংলা ও রোমান হরফ এর সমর্থক সান্তালদের মধ্যে পরস্পরকে দোষারোপ, তর্কযুদ্ধ, সামাজিক মিডিয়ায় শোরগোল থেকে কাদা ছোড়াছুড়ি পর্যন্ত গড়িয়েছে ব্যাপারটা। ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন সংগঠনের মানববন্ধন, সমাবেশ ও জনমত তৈরির পদক্ষেপ আজ অবধি চলমান। 'বাংলাদৗশ্ম সান্তাল বাইসি' গত ১৭ জানুয়ারি ২০১৩ দিনাজপুর প্রেসক্লাবে রোমান হরফে সান্তাল ভাষা লেখার জন্য সংবাদ সম্মেলন করে। এর ধারাবাহিকতায় এ সংগঠনটি এখন অবধি রোমান হরফে সান্তালি ভাষা লিখার পক্ষে সান্তাল জনগণের মধ্যে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। 'জাতীয় আদিবাসী পরিষদ' গত ৯ জানুয়ারি ২০১৩ রাজশাহী শহরে বাংলা হরফে সান্তালি ভাষা লিখার জন্য মানববন্ধন করে। এ সংগঠনের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়েছেন জাতীয় ছাত্র পরিষদ। এ সংগঠন দুটি সান্তালি ভাষা বাংলা হরফে লেখার জন্য জনসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন।

সান্তালরা সাধারণত খ্রিস্টধর্ম ও সারি সারনা (সান্তালদের আদিধর্ম) ধর্মের অনুসারী হয়ে থাকেন। আবার কিছু লোকজন সনাতন ধর্মের রীতিমাফিকও ধর্মচর্চা করে থাকেন। সারি সারনা অনুসারীরা যর্থাথভাবে ধর্মীয় চর্চা করেন বাংলাদেশে। এমন লোকজন খুবই কম। কারণ এ ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ধর্ম-বই পুস্তকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সারনা ধর্মাবলম্বী অনেক সান্তাল সে কারণে প্রতিবেশী হিন্দুদের সঙ্গে সনাতন ধর্ম পালন করে থাকেন। সারি সারনা এবং সনাতন ধর্মের অনেকটা মিল থাকায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে সারি সারনা অনুসারী সান্তাল শিক্ষার্থীরা আজ সনাতন ধর্ম শিক্ষাকে পড়াশোনার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিচ্ছে। সারি সারনা ধর্মের ধর্মীয় বইপুস্তক, শিক্ষক এবং এর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা কোনটাই বাংলাদেশে নেই। একটি সান্তাল শিশু জাতিতে সান্তাল হওয়া সত্ত্বেও সারনা কিংবা খ্রিস্টান ধর্মের যে কোন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করছে। খ্রিস্ট ধর্মানুসারী পরিবারে জন্মগ্রহণের ফলে প্রকৃতিগতভাবে রোমান হরফে সান্তালি সাহিত্য চর্চার জগতে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু সারি সারনা অথবা সনাতন ধর্মাবলম্বী একটি সান্তাল শিশু জন্মগতভাবে এ সুবিধাটা সাধারণত পাচ্ছে না। সে ছোট থেকে সারনা ধর্মের মজবুত ভিত হাতড়াচ্ছে সনাতন ধর্ম শিক্ষায় এবং খ্রিস্ট ধর্মকে মিশনারি প্রণীত ধর্ম বলে অবজ্ঞার চোখে দেখা শিখছে পরিবার থেকেই। ধর্ম শিক্ষার এ বিষয়টি প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা প্রণেতাদের মাথায় রাখা প্রয়োজন। সারি সারনা ধর্মের বইপুস্তক প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা হতে মাধ্যমিক পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

সান্তাল জাতিসত্তার ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে অনেকে গবেষণা করলেও সমস্যার গভীরে গিয়ে গবেষণা করেছেন মাত্র গুটিকয়েক গবেষক। এসব গবেষণার মধ্যে থাকা কিছু ছোট ভুলের জন্য সান্তালদের পরবর্তীতে গুনতে হয় বড় মাশুল। সেসব ভূল বিষয়গুলো বাঙালি সমাজ সহসাই গ্রহণ করে থাকে যা সান্তালদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অনেক ভালো গবেষক এ পর্যন্ত জানেন না সান্তালি ভাষার অভিধান আছে। সান্তাল সম্পর্কে স্বল্প অনুসন্ধান এসব গবেষণাপত্রের ওপর নেয়া জাতীয় পর্যায়ে অনেক সিদ্ধান্ত সান্তালদের স্বার্থের বাইরে চলে যায়। একাডেমিক কার্যক্রম সম্পাদন করতেও অনেকে সেকেন্ডারি তথ্যের ওপর নির্ভর করে গবেষণা সম্পন্ন করেন। ফলশ্রুতিতে দেখা যায় পূর্ববর্তী গবেষণায় যদি কোন ভুলভ্রান্তি থেকে থাকে তা ভুলই থেকে যাচ্ছে। ড. ক্ষুদিরাম দাস রচিত 'সান্তালি বাংলা সমশব্দ অভিধান' খুবই ভালো মানের একটি গবেষণা যদিও বাংলা হরফে কিছু সান্তালি শব্দ পরিষ্কার নয়। মাতৃভাষা সান্তালি নয় কিন্তু বাংলা ভালো জানেন এমন লোক সান্তালদের নিয়ে কোন গবেষণার কাজ করলে উপাত্ত সংগ্রহে বইটি রাখা তার জন্য জরুরি। লেখক বইটি হয়তো বাংলাভাষী জনগণের সান্তালি ভাষা বোঝার মাধ্যম হিসেবে রচনা করেছিলেন। ড. বঙ্কেশ চক্রবর্তীর 'এ কম্পেরাটিভ স্টাডি অফ সান্তালি অ্যান্ড বেঙ্গলি' প্রবন্ধটি সান্তালি ভাষায় বাংলার প্রভাব কতখানি এ বিষয়ের ওপর গুরুত্ব প্রদান করে। অধ্যাপক জিনাত ইমতিয়াজ আলী সান্তাল স্টুডেন্ট্স ইউনিয়ন (সাসু) কর্তৃক প্রকাশিত সান্দেশ ৬ষ্ঠ বর্ষ, নবম সংখ্যা (২০০০) 'সাঁওতালি ভাষা : একটি পরিচিতিমূলক প্রচেষ্টা' প্রবন্ধে লিখেছেন এঙ্গা কুলের অর্থ (পুরুষ সিংহ) আন্ড্য়া কুলের অর্থ (নারী সিংহ)। প্রকৃতপক্ষে সান্তালি এঙ্গা শব্দের বাংলা অর্থ হবে স্ত্রীলিঙ্গ এবং সান্তালি আন্ড্য়া শব্দের বাংলা অর্থ হবে পুংলিঙ্গ। বদরুদ্দীন উমর কর্তৃক রচিত 'সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা' বইটির ২৩ পৃষ্ঠার দ্বিতীয় প্যারায় লেখা হয়েছে 'সান্তালি ভাষায় নির্বিশেষ শব্দের সংখ্যা হাতেগোনা'। এটা ভুল তথ্য। কারণ সান্তালি ভাষা পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম এবং আজ অবধি চলমান। সান্তালি ভাষায় নির্বিশেষ শব্দের ব্যবহার কম থাকতে পারে কিন্তু হাতেগোনা নয়। পিও বোডিং কর্তৃক (১৯২৯-৩৬) সালের মধ্যে রচিত প্রথম পাঁচ খ-ের 'এ সান্তাল ডিকশনারি্থ বইটি দেখলেই বুঝা যাবে সান্তালি ভাষায় নির্বিশেষ শব্দ কতখানি আছে। অনেকে গবেষণায় সান্তালি ভাষাকে বেইজ হিসেবে ধরে বাংলা ভাষার শেকড় সন্ধানের জন্য গবেষণা করেন। ফলে না হয় সান্তালি ভাষার জন্য ভালো বা বাংলা ভাষার জন্য। সান্তালি ভাষার গবেষণা করতে হলে শিকড় অনুসন্ধানে যাওয়া প্রয়োজন তবেই বাংলা ও সান্তাল ভাষা উভয় লাভবান হবে।

বাংলা ভাষার প্রথম সংবাদপত্র রচনা করেন পর্তুগিজ পাদ্রি মানুয়েল দ্য এসেম্পসাঁও এবং আরেক পাদ্রি উইলিয়াম কেরি রচনা করেন বাংলা ভাষাকে সঠিকভাবে পরিচালনা করার প্রথম ব্যাকরণ বই। বাংলা ভাষার জন্য প্রথম ব্যাকরণ বই এবং সংবাদপত্র প্রণেতা খ্রিস্টান পাদ্রিদের বাংলা ভাষাভাষী লোকজন যথাযথ মর্যাদা দিয়েই স্মরণ করে থাকেন। বাংলা ভাষার পথিকৃৎ হওয়ার জন্য তাদের নাম বাংলা ভাষার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। কিন্তু উপমহাদেশে এ দুই পুরোহিতের আবির্ভাব হয়েছিল খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে। এখানে ধর্ম মুখ্য নয়, দুজনের উদ্ভাবনের কাছে বাঙালি জাতি ঋণী থাকবে চিরকাল। বাংলা ভাষাভাষী কেউ উইলিয়াম কেরি রচিত বাংলা ব্যাকরণকে খ্রিস্টানদের উপাদান বলে অবজ্ঞা করছে না। একইভাবে সান্তাল ভাষার জন্য নরওয়েজিয়ান পুরোহিতদের অবদান অনেক বেশি। পিও বোডিং কর্তৃক রচিত অভিধান তাই আজকে সান্তালদের অভিধান। ঔপনিবেশিক শাসনের দলিল বলে অনেকে রোমান হরফকে বর্জন করার পক্ষে যুক্তি দেখালে তা অন্ধত্ব ছাড়া কিছু নয়। মিশনারিরা বহু দূর থেকে এসে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের নিমিত্তে সান্তালদের হরফ, শব্দ ও ভাষা শুদ্ধভাবে শিখে তাদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করেন ১৮০০ সালের প্রথমদিকে। সান্তালরা মিশনারিদের গবেষণা মনেপ্রাণে নিয়েছিল কারণ তাদের গবেষণায় ছিল আত্মত্যাগ। বাইবেল রোমান হরফে সান্তাল ভাষায় অনুবাদ হলে রোমান সান্তালি হরফ কালে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মিশনারিদের প্রভাবে সান্তালরা অনেকে ধীরে ধীরে খ্রিস্ট ধর্মানুসারী হতে থাকে।

এটা সত্য, মিশনারিরা সান্তালদের বিভিন্ন মতবাদ চাপিয়ে দিয়েছে। মতবাদ হতে পারে ধর্ম বা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে। কিন্তু মিশনারিদের ধর্ম প্রসারের ফলে সান্তালি ভাষা ও সাহিত্যের ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়েছে। ভাষার উপরে তারা কখনো হস্তক্ষেপ করেনি। উপরন্তু তাদের আত্মত্যাগ সান্তাল জাতিকে শিক্ষার ক্ষেত্রে যেমন অগ্রসর করেছে তেমনি সান্তালি ভাষাকেও করেছে আরও সমৃদ্ধশালী। উপমহাদেশে রোমান হরফে সান্তালি ভাষায় সাহিত্য চর্চা ও বিভিন্ন ধর্মীয় বইপুস্তক তৈরি করা শুরু হয় আঠার শতকের প্রথম দিক থেকে। মিশনারিরা সান্তালদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষা দেয়ার জন্য পড়াশোনা শেখাতে আরম্ভ করেন বাংলা হরফ দিয়েই। কিন্তু সান্তালি ভাষা বাংলা হরফে শুদ্ধ উচ্চারণ না হওয়ায় তারা প্রাথমিকভাবে সমস্যায় পড়েন। সান্তালদের পড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ইতিহাস, গান, ধাঁধা, উপকথা ও মিথ সংগ্রহ করে রেভা. জে ফিলিপস ১৮৪৫ সালে বাংলা হরফে সান্তালি ভাষার বই প্রকাশ করেন। সান্তালদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রাথমিকভাবে বাংলা হরফে শুরু হলেও উচ্চারণ শুদ্ধ না হওয়ায় জন্য মি. ফিলিপস রোমান লিপিতে শুদ্ধভাবে সান্তালি ভাষা লেখার অনুশীলন চালাতে থাকেন। অবশেষে ১৮৬৩ সালে মিশনারিদের অনেক অধ্যবসায়ের ফলশ্রুতিতে তাদেরই উত্তরসূরি ড. সি আর লেপসাস সান্তালি ভাষার জন্য মানসম্পন্ন রোমান হরফ তৈরি করতে সক্ষম হন। এ রোমান হরফ আজ ভারতের ঝাড়খন্ড, বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও উত্তরপ্রদেশে এবং নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়।

বেসরকারি মতে, বাংলাদেশে প্রায় চার লাখ সান্তাল বসবাস করেন। বাংলাদেশে বসবাসকারী বেশিরভাগ সান্তাল রোমান হরফেই সান্তালি ভাষা চর্চা করে আসছেন অনেক আগে থেকেই। কিছু এনজিও দাতা সংস্থার অর্থায়নে সান্তালি ভাষা শিক্ষার বই বাংলা হরফে প্রণয়ন করে নিজেদের পরিচালিত স্কুলে সান্তাল শিশুদের পড়ানো শুরু করেছে বিগত কয়েক বছর ধরে। এনজিও কর্তৃক বাস্তবায়িত এসব প্রকল্প বাংলাদেশের সান্তালদের আজ ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে দু'ভাবে বিভক্ত করেছে। রোমান হরফ বাংলাদেশে অবস্থানরত সান্তাল জনগণের কাছে সর্বজনীন হলেও কিছু সান্তাল এ হরফকে ধর্মবিদ্বেষের কারণে মনেপ্রাণে এখনও গ্রহণ করতে পারেনি। এটা তাদের মনস্তাত্তি্বক সমস্যা। রোমান হরফের সঙ্গে ইংরেজি হরফের মিল থাকায় এবং বিশ্বে ইংরেজি একটি প্রচলিত মাধ্যম হওয়ার কারণে আজ ইংরেজি শিক্ষার প্রসারতা ব্যপক। বিশ্বের প্রত্যেকটি অঞ্চলে ইংরেজি চর্চা বাধ্যতামূলক থাকায় এবং বাংলাদেশেও শিশু শিক্ষা থেকে এর প্রচলন থাকাই সান্তাল শিশুরা অল্প বয়সেই রোমান সান্তালি হরফ আয়ত্ত করতে পারে। সান্তাল শিশুরা এর ফলে সহজেই রোমান হরফে সান্তাল বর্ণমালা আয়ত্ত করে এবং লিখতেও শিখে। ইতিমধ্যে রোমান হরফে সান্তালি ভাষা ইন্টারন্যাশনাল ফনেটিকস অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক স্বীকৃতি পেয়েছে। সমর মাইকেল সরেনের সান্তালি ভাষার টাইপিং সফটওয়ারের কল্যাণে সারা পৃথিবীতে সান্তালরা খুব সহজেই রোমান হরফে সান্তালি ভাষা চর্চা করতে পারবে। সামাজিক মিডিয়া, টুইটার ও ইন্টারনেটের কল্যণে এক দেশের সান্তাল জনগণ বুঝতে পারবে অপর মহাদেশের সান্তালদের মনন, প্রজ্ঞা, কথাসাহিত্য, হারানো গীত, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ইত্যাদি। সান্তালি সাহিত্যের ভিত হয়ে উঠবে আরও শক্ত, পরিষ্কার, যুক্তিমূলক ও গ্রহণযোগ্য। সান্তালি সাহিত্য জগতে আমূল পরিবর্তিন ঘটাতে পারবে রোমান হরফই।

সান্তালি বর্ণমালা নিয়ে বির্তক আসলে নতুন নয়। বর্ণমালা নির্ণয়ে বির্তকের এই জের বহু পুরনো। উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসন আমল থেকেই শুরু হয় সান্তালি ভাষার জন্য উৎকৃষ্ট হরফের অনুসন্ধান। উপমহাদেশে রোমান, অলচিকি, বাংলা, দেবনাগরী, উড়িয়া বিভিন্ন বর্ণমালায় সান্তালি ইতিহাস, উপকথা, গান, ধর্মগ্রন্থ, সাময়িকী ও সাহিত্য ইত্যাদি বেশ কয়েক শতক আগে থেকেই প্রকাশিত হয়ে আসছে। উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশ বিতাড়িত আন্দোলনে সান্তালদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়েছে ঠিকই কিন্তু সহজ-সরল সান্তালদের জীবনে তেমন কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বহু জাতির মধ্যে সান্তালদের বসবাস। বাংলাদেশে সান্তালদের একটি বৃহৎ অংশ বসবাস করে। ভারতীয় রাজনীতির শিকার সান্তালরা আজকে বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন হরফে নিজ মাতৃভাষা সান্তলি চর্চা করেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সান্তালদের বসবাসের কারণে সান্তালি ভাষা চর্চায় হরফ রাজনীতির হাতিয়ার হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার কখনো সান্তালদের এ হরফের ইস্যুতে সঠিক ও মজবুত কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। আজ অবধি ভারতে নানা বর্ণমালায় এর ব্যবহার লক্ষণীয়। বাংলাদেশে সরকারের উচিত হবে, সান্তালদের এ হরফ সমস্যাকে যথেষ্ঠ গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করে সঠিক হরফে সান্তালি দোভাষী প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার উপকরণ প্রণয়ন করা।

বর্তমান সরকার কর্তৃক প্রণীত 'শিক্ষানীতি-২০১০' অনুচ্ছেদ নং- ১৮, ১৯ ও ২০-এ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিশুদের জন্য নিজস্ব মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার সুন্দর কৌশল অবলম্বন করার আশ্বাস প্রদান করা হয়েছে। একমাত্র সরকারের সুস্থ পরিকল্পনাই পারে দেশের কোন পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মূল স্্েরাতের মধ্যে নিয়ে আসতে কিন্তু এলক্ষ্যে সরকারকে যথেষ্ট যত্নবান হয়ে কাজ করতে হবে। সরকারের সঙ্গে সঙ্গে দাতাসংস্থা এবং এনজিওগুলোরও উচিত হবে সরকারের এ মহান উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে ভিশন-২০২১ স্বার্থক করে তোলা। সান্তাল শিশুদের শিক্ষা নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে এ রকম এনজিও উচিত এ জনগোষ্ঠী নিয়ে ভালোভাবে বিস্তারিত জেনে-বুঝে সরকারের সহায়তায় তাদের কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। সরকার এবং এনজিওগুলোর পারস্পরিক বোঝাপড়া এক্ষেত্রে সান্তাল জনগোষ্ঠীর ভাষার হরফ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অবদান রাখবে। পিছিয়ে পড়া জনগণের জন্য শিক্ষার এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। সেসঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন কৌশলপত্রের যেমন এমডিজি বা পোস্ট-এমডিজি ও পিআরএসপির মধ্যে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। বাংলাদেশ সরকার এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন শিশুমৃত্যুর হার কমানো, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার, মাতৃস্বাস্থ্য উন্নতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সফল হয়েছে ঠিকই। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জনগণের জীবনযাত্রায় কিন্তু এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আদৌ সফল হয়নি। পরিশেষে রাষ্ট্রের উচিত অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের 'বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন' বইয়ের (১৫৮)নং পৃষ্ঠার উদ্ধৃতিটুকুর সঠিক পরিচর্যা নেয়া। 'বাংলাদেশে আমাদের বাংলা ভাষার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য অবাঙালি জাতিত্তার যেসব ভাষা রয়েছে সেসব আদিবাসী ভাষা যেমন- চাকমা, মারমা, গারো, খাসি, সান্তাল, ত্রিপুরা, ওঁরাও প্রভৃতির প্রতি বাংলাভাষীদের শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, বাংলা ভাষীদের জাতীয় কর্তব্য প্রতিবেশী আদিবাসী ভাষাগুলোকে বিকাশে সহায়তা করা। বাংলাদেশে যুগ যুগ ধরে বাংলা ও অন্য যেসব ভাষা সহাবস্থান করেছে, বাংলা ভাষা এ দেশের যেসব আদিবাসী ভাষা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে তাদের অস্তিত্ব রক্ষায় অগ্রণী হওয়া বাংলাভাষীদের দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের শিক্ষা পৃথিবীর প্রতিটি মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া; আপন আপন মাতৃভাষার প্রতি যত্নবান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অপরাপর মাতৃভাষার প্রতি যত্নশীল হওয়া। অন্য কোন ভাষা যেন আমার ভাষাকে গ্রাস করতে না পারে। আমার ভাষাও যেন অপর কোন ভাষাকে গ্রাস না করে সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, আমরা আমাদের মাতৃভাষার প্রতি যেমন শ্রদ্ধাশীল হব তেমনি বাংলাদেশের তথা বিশ্বেও ছোটবড় প্রতিটি মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা ও যত্নশীল হব।' অবহেলা ও বিদ্বেষ নয়, দেশের প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীগুলোকে উন্নয়নের মূল ধারায় নিয়ে আসতে রাষ্ট্র এবং জনগণের সঠিক প্রচেষ্টাই পারে দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গল কিছু বয়ে আনতে।

[লেখক : সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, সান্তাল ষ্টুডেন্টস ইউনিয়ন]
 উৎসঃ http://www.thedailysangbad.com/index.php?ref=MjBfMDNfMThfMTNfMl8yM18xXzEyNjM0Ng==
******************************************************************
Share:

Friday, March 8, 2013

আদিবাসীদের ভাষা সমস্যা

মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
আমাদের দেশের আদিবাসীদের দু'ভাগে ভাগ করা যায়_ সমতলের আদিবাসী ও পার্বত্য এলাকার আদিবাসী। এদের সংখ্যা কেউ বলে ৪০, আবার কেউ বলে ৭০।
আদিবাসী ভাষার অনেকের বর্ণমালা রয়েছে, অনেকের নেই। কয়েক বছর আগে আমাকে এক সাঁওতাল মহিলা বলেছিলেন, বাংলা হরফে সাঁওতালি ভাষার মাধুর্য হারিয়ে যায়। সেই কথাটা আমার মনে বহুদিন ধরে পাক দেয়। সেই কথা ভেবে নিচের কবিতাটি লিখি_


হরফের জন্য প্রার্থনা

আমাদের ভাষার নাকি হরফ ছিল।
গ-ারের চামড়ায় লেখা ছিল সেই হরফ।
কর্তাবাবু কলকাতার জাদুঘরে তা জমা দিয়েছিলেন
তারপর তার আর কোনো হদিস নেই।
আমাদের নাকি হরফ ছিল
একটা ছাগল সেই হরফ খেয়ে ফেলেছিল
ছাগল বলি দিলে তার অ-কোষের
শিরা উপশিরায়
সেই হরফের রেখ দেখা যায়।
আমাদের নাকি এক হরফ ছিল।
এক গোরম্ন সেই হরফ খেয়ে ফেলেছিল।
এখনো সেজন্য আমরা গো বলি দিই।
আর মরার আগে গোরম্নর জিহ্বা
খুঁটিতে টাঙ্গিয়ে রাখি।
এখন আমাদের নিজেদের কোনো হরফ নেই।
বিলেতি সাহেবদের রোমান হরফ
দেশি সাহেবদের বাংলা হরফ
শুধুই ঘোল_
আমাদের ভাষার দুধের স্বাদ মেটায় না।
আমাদের জবানের ছিরি ছাঁদ
আমাদের মূর্দ্ধ, ওষ্ঠ কণ্ঠ_
জিহ্বার অধিষ্ঠান তালু-টাকরা মিলিয়ে
ছেনি কেটে হরফ বানাবে
সে কোন
চার্লস উইলকিন্স,
পঞ্চানন কর্মকার!

পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সব আদিবাসী বাস করে তাদের সামাজিক রীতি-নীতি, সংস্কৃতি, আচার-আচরণে মিল থাকলেও ভাষা এক নয়। চাকমা ও তঞ্চঙ্গা আদিবাসীরা মঙ্গোলীয় হলেও তাদের ভাষা ইন্দো-আর্য গোষ্ঠীর বাংলা ভাষার মতো একই ভাষার পরিবারভুক্ত। মারমাদের ভাষা তিব্বতী-বর্মন গোষ্ঠীর বর্মন-আরাকান দলভুক্ত, ত্রিপুরাদের ভাষা তিব্বতী-বর্মা গোষ্ঠীর ককবরক দলভুক্ত। লুসাই, পাংখোয়া, বম, খিয়াং, ম্রো, চাক এসব আদিবাসীর ভাষা তিব্বতী-বর্মন কুকি-চিন দলভুক্ত। চাকমা এবং তঞ্চঙ্গা আদিবাসীরা যে বর্ণমালা ব্যবহার করে তার নাম 'চাঙমা বা চাকমা'। মারমা আদিবাসীরা 'মারমা' বর্ণমালা ব্যবহার করে। ম্রো ও খুমী 'ম্রো চাহ চা' বর্ণমালা ব্যবহার করে। আবার ম্রো ও খুমী যারা খ্রিস্টান ধর্মানুসারী তারা রোমান বর্ণ ব্যবহার করে থাকে। বম, লুসাই ও পাংখো শিৰিত ব্যক্তিরা অনেকে রোমান হরফে চিঠিপত্র লিখে থাকে।

বাংলাদেশ ও ভারতে সাঁওতাল গোষ্ঠীর তিন রকম হরফের সঙ্গে বোঝাবুঝি করতে হয়_ রোমান, অলচিকি ও বাংলা। চাকমা ভাষার বর্ণমালা থাইল্যান্ডের ৰের, আন্নাম, লাওস, কম্বোডিয়া, শ্যাম ও দৰিণ মিয়ানমারের লিপির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। চাকমা ভাষায় লিখিত অনেক পা-ুলিপি থাকলেও চাকমা হরফের কোন ছাপাখানা না থাকায় এ হরফে মুদ্রিত কোন গ্রন্থ নেই। তঞ্চঙ্গারা চাকমা ভাষাতেই লেখাপড়া করে। মারমাদের নিজস্ব হরফ রয়েছে। ত্রিপুরাদের কক-বরক ভাষার নিজস্ব লিপি থাকলেও ভারতে রোমান হরফের অনুকরণে তাদের বর্ণমালা বিন্যসত্ম করা হয়েছে। প্রভাংশু ত্রিপুরা বাংলা হরফকে নিজস্ব ভাষার ধ্বনি-প্রতীকের সাযুজ্যে বিন্যসত্ম করে কক-বরক-আদি শিৰা নামক অৰরজ্ঞানের বই প্রণয়ন করেছেন। ক্রীমা ধর্মের প্রবর্তক মেনলে ম্রো বর্ণমালার প্রবর্তন করেন। সেই বর্ণমালা খুমীরাও ব্যবহার করে। বম, লুসাই ও পাংখোয়ারা ইংরেজি হরফে নিজস্ব ভাষার ধ্বনি-প্রতীকের সাযুয্যে, বিন্যসত্ম করেছে। চাকদের, এক ভাষ্যমতে, সম্প্রতি মিয়ানমারে তাদের প্রাচীন বর্ণমালার সন্ধান পাওয়া গেছে।
গারো ভাষায় খ্রিস্টান মিশনারীরা রোমান হরফ চালু করেন। গারো ভাষা বাংলা হরফেও লেখা যায়। মগ ভাষা আরাকানী ভাষার কথ্য রূপ এবং তিব্বতী-বর্মণ গোষ্ঠীভুক্ত। মগ বর্ণমালার নাম 'ঝা'। বর্মি-আরাকানী বর্ণমালার মতো মগ 'ঝা' ও মণিপুরীদেও মৈতি বর্ণমালা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নাম ও বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উচ্চারিত হয়। আঠারো শতকে মণিপুরের মহারাজা গরীব নেওয়াজ বৈষ্ণব ধর্ম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে গ্রহণ করায় মণিপুরী ভাষা বাংলা হরফে লেখা শুরম্ন হয়। ড. মুহম্মদ শহীদুলস্নাহর মতে মু-া ও ওঁরাও ভাষা একই। ওঁরাও বর্তমানে ইংরেজী বা বাংলা অৰরে তাদের ভাষা লিখে থাকে।
২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে এক শানত্মি চুক্তি স্বাৰরিত হয়। এই চুক্তির 'খ' খ-ে ৩৩ খ ২ অনুচ্ছেদে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের "মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিৰা" বিষয়টি উলেস্নখ করা হয়। চুক্তিকে ভিত্তি করে জাতীয় সংসদে চারটি আইন পাস হয় : রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮ ইং। এই চারটি আইনের প্রথম তিনটি আইনের ৩৩ (ঠ) ধারায় "মাতৃভাষার মাধ্যমে প্রাথমিক শিৰা"কে আইনগতভাবে স্বীকার করা হয়েছে। আইন তিনটির বাসত্মবায়নের দায়িত্ব জেলা পরিষদ এবং আঞ্চলিক পরিষদের।
মাতৃভাষা শিৰায় শিৰিত হওয়ার অধিকার একটি মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। জাতিসংঘের শ্রম সংস্থা ১৯৫৭ সালের ৫ জুন ৪০তম অধিবেশনের ১৭০ নং কনভেনশনে আদিবাসী ও উপজাতীয় ভাষায় শিৰাদানের বিষয়ে সিদ্ধানত্ম গৃহীত হয়। ওই কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ২১-এ উলেস্নখ করা হয়েছে_ "সংশিস্নষ্ট জনগোষ্ঠীর সদস্যদের জাতীয় জনসমষ্টির অবশিষ্ট অংশের সাথে সমতার ভিত্তিতে সকল সত্মরে শিৰা অর্জন করার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।" ২৩ (১) অনুচ্ছেদে উলেস্নখ করা আছে_ "সংশিস্নষ্ট জনগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েদেরকে তাদের মাতৃভাষায় পড়তে ও লিখতে শিৰাদান করতে হবে; কিংবা যেখানে এটা সম্ভব নয় সেৰেত্রে তাদের সমগোত্রীয়দের মধ্যে সাধারণভাবে বহুল প্রচলিত ভাষায় শিৰাদান করতে হবে।" ২৩ (২)-এ আরও লেখা আছে_ "মাতৃভাষা বা আদিবাসী ভাষা থেকে জাতীয় ভাষা কিংবা দেশের একটি সরকারী ভাষায় ক্রমান্বয়ে উত্তরণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।" বাংলাদেশ উক্ত কনভেনশনের একটি পৰ।
১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, রাজনৈতিক অন্যান্য মতাদর্শ, ধনী, গরিব ও জন্মসূত্র নির্বিশেষে সবাই এ ঘোষণাপত্রে বর্ণিত অধিকার এবং স্বাধীনতার সম-অংশীদার। যে-কোনো স্বাধীন কিংবা স্বায়ত্তশাসিত অথবা সীমিত সার্বভৌম দেশের রাজনৈতিক, আনত্মর্জাতিক বা আঞ্চলিক বিশেষত্বের কারণে ওই দেশের কোনো অধিবাসীর প্রতি কোনোপ্রকার ভিন্ন আচরণ করা যাবে না।"
১৯৬৯ সালের ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈড়াবহধহঃ ড়হ ঈরারষ ধহফ চড়ষরঃরপধষ জরমযঃং (ওঈঈচজ) অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অধিকারের আনত্মর্জাতিক চুক্তির ২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে :
১. সঠিক উপায়, বিশেষ করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দ্বারা এ চুক্তিতে বর্ণিত অধিকারসমূহের সম্পূর্ণ প্রগতিশীল বাসত্মবায়নের উদ্দেশ্যে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী দেশ নিজস্বভাবে এবং বিশেষ করে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ৰেত্রে আনত্মর্জাতিক সাহায্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে তার নিজস্ব সম্পদের পূর্ণ সদ্ব্যবহারের পদৰেপ নেবে।
২. অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রসমূহ জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, রাজনৈতিক ও অন্যান্য মতাদর্শ, ধনী, গরিব ও জন্মসূত্র নির্বিশেষে চুক্তিতে বর্ণিত অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা দেবে।
২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে_ 'যদি কোনো দেশে আঞ্চলিক, ভাষাভিত্তিক অথবা ধমর্ীয় এমন জনগোষ্ঠী থাকে, যারা ওই দেশে সংখ্যালঘিষ্ঠ, তাদের ৰেত্রে এই অধিকার অস্বীকার করা যাবে না, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তাদেরকেও নিজস্ব সংস্কৃতি উপভোগ, তাদের নিজস্ব ধর্ম অবলম্বন ও প্রচার এবং তাদের নিজস্ব ভাষা ব্যবহারের অধিকার দিতে হবে।'
১৯৯২ সালের জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও ভাষার কারণে সংখ্যালঘুদের অধিকারের ঘোষণায় ভাষাগত সংখ্যালঘুদের অধিকারের কথা বার বার এসেছে। প্রত্যেক রাষ্ট্রের প্রত্যেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য ও স্বারূপ্যের বিকাশের সহায়তাদানের কথা বলা হয়েছে। ওই ঘোষণায় ভাষাগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের সংগঠন ও সমিতি রৰা করতে পারবে বলে উলেস্নখ করা হয়। প্রতিটি রাষ্ট্র প্রত্যেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাতৃভাষার বিকাশ এবং সম্ভব হলে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিৰার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবে।
১৯৯৫ সালের আদিবাসীদের অধিকারের খসড়া ঘোষণায় আদিবাসীদের নিজেদের ভাষার পুনরম্নজ্জীবন, ব্যবহার, উন্নয়ন বা সম্প্রচারের অধিকার স্বীকৃত হয়। সম্ভব হলে আদিবাসীরা তাদের ভাষায় তাদের স্বকীয় মিডিয়া মাধ্যম পরিচালনা করতে পারবে। এ সব আদিবাসীর অধিকার রাষ্ট্রীয় আইন ও সংবিধানে প্রতিফলিত হতে হবে।
আদিবাসীদের দাবি_ তাদের জাতিসত্তা ও ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের কথা সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদে যে জাতীয় ভাষার কথা উলেস্নখ করা হয়েছে তা কেবল বাংলা ভাষার কথা বলে। সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলে তা কত সহায়ক হবে তা বলা মুশকিল।
বাংলা ভাষা প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বলে স্বীকৃত হলেও দেশে রাজনৈতিক অস্থিতি, সামরিক শাসন এবং নানা ধরনের বিভ্রানত্মির কারণে সেই রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা এখনো প্রতিষ্ঠিত হলো না।
সামিভাষী উপজাতির ইয়োহান গাফপ্পি নরওয়ে মূলস্রোতের সঙ্গে আত্মীকৃত হতে চাননি। আদিবাসী-উপজাতি গোষ্ঠীদের মধ্যে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি তাঁর ভাষা ও সংস্কৃতিতে দৰতা অর্জনে সুযোগ-সুবিধায় বঞ্চিত হওয়ায় খেসারতের মামলা করেন। দেশের তিনটির প্রত্যেক আদালতে এবং পরে ইউরোপিয়ান মানবাধিকার কমিশনে তামাদির কারণে তিনি হেরে যান। আদিবাসীরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে কি দুর্ভোগ পোহায় সে সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের টুলালুপ জনগোষ্ঠীর জেনেট ম্যাককাইউ একবার দুঃখ করে বলেন, 'একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমি সূর্যের নিচে একটা জায়গা পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছি, কিন্তু আমার গায়ে আমি কেবল গুচ্ছের ফোসকা উঠতে দেখেছি।'

মাতৃভাষার ব্যাপারে মানুষের মনে আবেগ থাকে। সুইডেনের সামিভাষী আদিবাসী কবি পলাশ উৎসির ছোট কবিতাটি তো বড়ই বাঙ্ময় :
কিছুই না
যে ভাষা আমরা উত্তরাধিকার হিসেবে পাই
তা ছাড়া কিছুই বেশি দিন থাকে না
আমাদের আত্মায়।
এ আমাদের চিনত্মামুক্ত করে,
উন্মুক্ত করে আমাদের মন
এবং কোমল করে আমাদের জীবন।

শিশির চাকমার কবিতা আমার প্রাণের বর্ণমালায় একুশের ফেব্রম্নয়ারির সঙ্গে এক একাত্মতার ইঙ্গিত দেয়।
ফুলে ফুলে শহীদ মিনার ভরে গেছে
সালাম রফিক জব্বার বরকতদের পাহাড়সম উঁচু আত্মাগুলো
নিপুণ পূর্ণর্িমার আলোর মতো আছে ফুলের বিছানায়
আমাদের পুষ্পার্ঘ অর্পণের সাথে সাথে
আমাদের বর্ণমালাগুলো সলাজে বেরিয়ে এল
তারা কি যেন বলতে চায়।

বর্ণমালাগুলো পুষ্পার্ঘ ঝলাটিকে চুমো দিচ্ছে
ভালোবাসার ছোঁয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রাণের একাগ্রতায়
হঠাৎ তারা কোথা থেকে এল?
এতদিন তারা ছিল শ্রীধাম বৈদ্য চন্দ্র হরি বৈদ্য
ভগবান বৈদ্য আর সূর্য সেন বৈদ্যদের
পুরনো তেল চিটচিটে ঝোলার ভিতরে।
শ্রীধাম বৈদ্য আর চন্দ্রহরি বৈদ্য হারিয়ে গেছে
তাদের ফেলে যাওয়া ঝোলায় কতদিন
আর পরে থাকবে অবহেলায় উপেৰায় বঞ্চনায়
আজ একটু সুযোগ পেয়ে তারা বেরিয়ে এসেছে
জব্বারদের আত্মার সাথে একাত্ম হতে।

আদিবাসীদেরকে স্বীয় প্রচেষ্টায় এবং দেশের সুশীল সমাজের সহায়তায় তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দু'শ' বছর আগে বাংলা ভাষার যে অবস্থা ছিল অনেক আদিবাসী ভাষার অবস্থা অনুরূপ। সম্মুখে গিরিলঙ্ঘনের পরীৰা। সে পরীৰায় আদিবাসী আবারাও ও আতারাও সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হোক।
আনত্মর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে একুশে ফেব্রম্নয়ারি যেন গলার মাদুলি না হয়ে দাঁড়ায়_ আদিবাসীদের এই আশঙ্কা দূর করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আনত্মর্জাতিক আইন-কনভেনশনের অংশীদার হিসেবে আজ জাতীয় ভাষা বলতে এক বচনে শুধু বাংলা ভাষা নয়, বহু বচনে দেশের সকল ভাষার কথা বিবেচনা করতে হবে।
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১০

Source: http://www.dailyjanakantha.com/news_view.php?nc=59&dd=2010-02-21&ni=9205
****************************************************************************
Share:

সাঁওতাল শিশুদের জন্য রোমান বর্ণমালার পাঠ্যপুস্তক দাবি

আদিবাসী মুক্তি মোর্চার সংবাদ সম্মেলন

রাজশাহী অফিস
সাঁওতাল শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার জন্য রোমান বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক রচনাসহ সাত দফা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে আদিবাসী মুক্তি মোর্চা নামের একটি সংগঠন। গতকাল বুধবার দুপুরে রাজশাহী প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে রাজশাহীসহ সকল জেলা শহরে সাঁওতালি ভাষা একাডেমি স্থাপন, সরকারি উদ্যোগে সাঁওতালি ভাষায় শব্দকোষ ও পুস্তক রচনার উদ্যোগ গ্রহণ,সাঁওতালি সংস্কৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ, ভাষা উন্নয়নে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের আওতায় আদিবাসী ভাষা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে ভাষা সংরক্ষণ আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদ গঠনের দাবি জানানো হয়। স্বাধীনতাসহ বাঙালির সকল মুক্তিসংগ্রামে সাঁওতালরা অংশগ্রহণ করেছেন উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, বর্তমানে রাষ্ট্রের এক ভয়াবহ রাজনীতির খেলা সমতলের সাঁওতালদের সমাজ বদলের স্বপ্ন ও দিন বদলের স্বপ্নকে ভূলণ্ঠিত করেছে।

সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আদিবাসী মুক্তি মোর্চা কেন্দ ীয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক যোগেন্দ নাথ সরেন। এ সময় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়াস ডুমরী, সাঁওতালি ল্যাঙ্গুয়েজ ডেভেলপমেন্ট কমিটির সভাপতি গাব্রিয়েল হাঁসদা, মাহালে ল্যাঙ্গুয়েজ ডেভেলপমেন্ট কমিটির সভাপতি মেরিনা হাঁসদা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
Source: http://www.ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDFfMTBfMTNfMV8yNV8xXzEwMjE0
***************************************************************************
Share:

সাঁওতালি ভাষা ও রোমান বর্ণমালা

রিপন হাঁসদা
কোন বর্ণমালায় লেখা হবে সাঁওতালি ভাষা— রোমান, বাংলা না অলচিকি? এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও ভার্চুয়াল জগতে তুমুল তর্ক-বিতর্ক চলছে। তথাকথিত গবেষকগণ ও কিছু বেসরকারি সংগঠন যাঁরা হয়তো সাঁওতালি ভাষার একটি বাক্য তো দূরের কথা একটি শব্দের সঠিক উচ্চারণ করতে পারেন কিনা সন্দেহ, তাঁরাই এই সাঁওতালি ভাষাকে বাংলা বর্ণমালায় লেখার পক্ষে কতিপয় খোঁড়া যুক্তিসহ দাবি ও অপপ্রচার চালাচ্ছেন। তাঁরা এটা বলতেও দ্বিধাবোধ করেননি যে, যাঁরা রোমান লিপিতে সাঁওতালি ভাষা লেখার পক্ষে তাঁরা নাকি বাংলা ভাষার শত্রু। কী নির্মম মিথ্যাচার! তাঁদের যুক্তির একমাত্র অবলম্বন বাংলা যেহেতু এ দেশের রাষ্ট্রভাষা, তাই শুধু সাঁওতালি কেন এ দেশে বসবাসকারী তাবত্ আদিবাসীদের ভাষা বাংলা বর্ণমালায় লেখা হোক; এতে ভাষাটির আসল উচ্চারণ আসুক অথবা না আসুক এতে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই। কিন্তু হাস্যকর ও অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় তাঁরা কেউই সাঁওতালি ভাষার উচ্চারণ সম্পর্কে মুখ খুলতে চাননি বা খুলতে গিয়েও পুনরায় বন্ধ করেছেন। তাঁরা হয়তো ভুলে গিয়ে থাকবেন যে, একটি ভাষা যে কোনো বর্ণমালায় লিখলেই হয় না বরং মুখ্য বিষয় হচ্ছে ঐ লিপিতে ভাষাটির শুদ্ধ ও আসল উচ্চারণ সম্ভব কিনা।

সাঁওতালি ভাষার জন্ম ঠিক কবে হয়েছিল তা প্রত্নতাত্ত্বিকদের ভাববার বিষয়; তবে সাঁওতালি যে সমৃদ্ধ ও প্রাচীনতম ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাঁওতালি ভাষা অনেক প্রাচীন ও সমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও এ ভাষার কোনো লিখিত রূপ ছিল না পরে পণ্ডিত রুঘুনাথ মুর্মু সাঁওতালি ভাষার বর্ণমালা 'অলচিকি' আবিস্কার করেন (১৯২৫)। এ ভাষায় রচিত গল্প, ছড়া, কবিতা, গান, রূপকথা ইত্যাদি সুদূর প্রাচীনকাল থেকে মুখে মুখেই প্রচলিত হয়ে আসছে। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় মুখে মুখে প্রচলিত হওয়া সত্ত্বেও এ ভাষার কোনো শব্দ বা বাক্য গঠনের চিরায়ত নিয়মের এবং উচ্চারণশৈলীর কোনো পরিবর্তন হয়নি। ব্রিটিশ শাসনামলে মিশনারিগণ সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের নিমিত্ত রোমান লিপিতে সাঁওতালি ভাষার লিখিত রূপ দেয়ার চেষ্টা করেন। প্রথম দিকে কিছু শব্দের উচ্চারণগত অসঙ্গতি দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে তা সংশোধনের মাধ্যমে উচ্চারণ জটিলতা পুরোপুরি দূর হয়। এবং সাঁওতালি ভাষা তার লিখিত রূপ লাভের ফলে যোগাযোগ ও সাহিত্যচর্চাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরো সমৃদ্ধ হতে থাকে যার প্রক্রিয়া আজও চলমান। এ থেকেই সাঁওতালি ভাষা বিকাশে মিশনারিদের অবদান সহজে অনুমেয়, যা সচেতন সাঁওতাল জনগোষ্ঠী কখনোই অস্বীকার করতে পারে না। যে লিপিতে সাঁওতাল ভাষা তার প্রথম লিখিত রূপ পেয়েছিল তা আজ বহু বছর পরে অস্বীকার করার বা বাদ দেয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। নির্দ্বিধায় বলা যায়, রোমান লিপিতে সাঁওতালি ভাষার উচ্চারণসহ অন্যান্য জটিলতা না থাকায় সাঁওতাল জনগণ তা সানন্দে গ্রহণ করেছিল এবং আজও তারা তা প্রাণে আঁকড়ে লালন করে। যাঁরা সাঁওতালি ভাষা সম্পর্কে কোনো খোঁজখবর রাখেন না বা এ ভাষার বিশালতা সম্পর্কে যাঁদের ন্যূনতম ধারণা নেই তাঁরা আজ রোমান লিপিতে সাঁওতালি ভাষা লেখার বিরোধী। যদিও সাঁওতালি ভাষার গৌরবময় ইতিহাস থেকে শুরু করে এ ভাষার গ্রামার, গল্প, গান, অভিধান ইত্যাদি সবই রোমান হরফে লিপিবদ্ধ। তাঁরা যদি আজ সাঁওতালদের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য বা শব্দ পুনরুদ্ধার করতে চান বা সাঁওতালদের সম্পর্কে স্টাডি করতে চান তাঁদের রোমান ভাষায় লিখিত বইসমূহ থেকে জ্ঞানার্জন ছাড়া কোনো উপায় নেই।

পাকিস্তানি আমলে তত্কালীন কিছু বাঙালির মতো এখনকার তথাকথিত নীতিনির্ধারকদের যদি সামান্যতম গোঁড়ামিও না থাকতো, তবে তাঁরা আজ এক বাক্যেই রোমান লিপিতে সাঁওতালি ভাষা লেখার পক্ষে মত না দিলেও অন্তত বিরোধিতা করার দুঃসাহস দেখাতেন না। কিন্তু হায়! তাঁরা আজ রোমান লিপির মধ্যে খ্রিস্টধর্মের গন্ধ পান। কিন্তু তাঁরা এ কথা হয়তো জানেন যে, কোনো লিপি বা বর্ণমালা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ঐতিহ্য বহন করলেও ধর্মের পরিচয় বহন করে না; করলে মুসলিম দেশসমূহে রোমান লিপি কোনোক্রমেই ঠাঁই পেতো না। অথচ এই খ্রিস্টান মিশনারিদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় যে সাঁওতালি ভাষা তার প্রথম লিখিত রূপ পেয়েছিল সে কথা তাঁরা বেমালুম ভুলে যান।

অথচ খ্রিস্টধর্ম সাঁওতাল সংস্কৃতির সঙ্গে কখনোই সাংঘর্ষিক ছিল না বরং অনেক ক্ষেত্রে তা সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার চাক্ষুষ প্রমাণ— সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান, সাহিত্যচর্চা, আচার-ব্যবহার, সমাজ কাঠামো, জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ সংক্রান্ত অনুষ্ঠানসহ যাবতীয় সামাজিক অনুষ্ঠানাদি সুদূর প্রাচীনকাল থেকে আজও অবিকৃতভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন জায়গায় যাঁরা বলেন যে, সাঁওতাল জনগোষ্ঠী তাদের ভাষা, সংস্কৃতি হারিয়েছে, তা সাঁওতালদের সম্পর্কে অপপ্রচার ও ডাহা মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর রোমান লিপির মধ্যে ধর্মের গন্ধ খোঁজা মূল্যবান সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। অবশ্য যাঁরা সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর প্রগতি,সভ্যতা ও পরিবর্তনকে ভালো চোখে দেখতে পারেন না তাঁরাই হয়তো এমন উদ্ভট কাজ করার প্রয়াস পান।

যাঁরা বাংলা বর্ণমালায় সাঁওতালি ভাষা লিখতে চান তাঁরা সাঁওতালি ভাষাকে গলা টিপে হত্যা করতে চান। উচ্চারণের অসঙ্গতি যে ভাষার মৃত্যু ঘটায় এ পাঠ তাঁরা হয়তো আজও পাননি। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যখন আন্দোলন চলছিল তখন তত্কালীন শাসকগোষ্ঠী ছাড়াও কিছু গোঁড়া বাঙালি বাংলাকে আরবি হরফে লেখার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবী কেউ এ কূপমণ্ডুক সিদ্ধান্ত মেনে নেননি। কেননা বাংলা ভাষার উচ্চারণ আরবি হরফে কখনোই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ঠিক একইরকমভাবে সাঁওতালি ভাষার উচ্চারণ বাংলা হরফে প্রকাশ করা অসম্ভব।

সচেতন সাঁওতাল সমাজ, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী কেউই নিজ মাতৃভাষার অপমৃত্যু দেখতে চান না। রোমান ও বাংলা লিপি নিয়ে সাঁওতালদের মধ্যে কিঞ্চিত মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এর মূল হোতারা কিন্তু অসাঁওতালরাই, যাঁরা সাঁওতালদের সম্পর্কে বারবার ভুল তথ্য দিয়ে গোটা জাতিকে বিভ্রান্ত ও সাঁওতালদের খাটো করে আসছেন। আসুন আমরা সকলে মিলে তাঁদের বয়কট করি। তাঁরা হয়তো ভুলে যান যে, সাঁওতালরা কখনোই কোনো অন্যায়, অবিচার, ষড়যন্ত্র বা চাপিয়ে দেয়া কোনো নীতি গ্রহণ করে না। আর গ্রহণ করেনি বলেই সাঁওতালদের গৌরবময় সংস্কৃতি আজও টিকে আছে। ইংরেজদের নানা অপরাধ-অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র সংগ্রাম সাঁওতালরাই শুরু করেছিল এবং তার বহু বছর পর অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর বোধোদয় হয় এবং ইংরেজদের বিতাড়িত করে। কিন্তু রোমান লিপি প্রতিষ্ঠার সময় এমন বিদ্রোহের খবর পাওয়া যায়নি।

আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম সরকারের অন্যতম মহত্ উদ্যোগ। কিন্তু মুখোশধারী কিছু ষড়যন্ত্রকারীর কারণে কোমলমতি শিশুরা মাতৃভাষায় সুখপাঠ লাভ করবে কিনা তাতে অনেকেই সন্দিহান। রোমান লিপি যেহেতু সাঁওতালি ভাষার সঠিক উচ্চারণ ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহন করে তাই রোমান হরফই হোক সাঁওতালি ভাষার একমাত্র বর্ণমালা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
Source: http://ittefaq.com.bd/index.php?ref=MjBfMDNfMDZfMTNfMV8xOF8xXzIzOTk1
**************************************************************************
Share:

দেশেই বিপন্ন অনেক ভাষা

তারিকুল ইসলাম
মাতৃভাষা চর্চার সুযোগ না থাকায় দেশেই বিপন্ন হচ্ছে অনেক ভাষা। এরই মধ্যে ওঁরাওদের 'কুরুখ' ও বর্মণদের 'নাগরি' ভাষা বিপন্ন হয়ে গেছে। কোচ ও রাজবংশীদের ভাষাও প্রায় বিপন্নের পথে।
ইউনেসকোর ইথোনোলগের এক জরিপে দেখা যায়, রাজশাহীর পুঠিয়ার কোডা, নেত্রকোনা কলমাকান্দার মিগাম, রাঙ্গামাটির মাঙ্খুয়া ও রিয়াং এবং সাক ভাষাও বিপন্নের পথে। ইথোনোলগ এসব ভাষাগুলোকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। এর চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন চাক, চাইন, খাশি, এমরু, পিনার, সাউরিয়া পাহারিয়া, ইউসোই ও ওয়ার-জাইনটিয়া ভাষাকে। এ ভাষাগুলো বর্তমানে খুব কমসংখ্যক মানুষ ব্যবহার করছে।

বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়াও প্রায় ৪৫টি নৃতাত্তি্বক জনগোষ্ঠী আছে। ভাষা আছে প্রায় ৪২টির মতো। আদিবাসী অধিকার কর্মীরা আশঙ্কা করছেন, সরকার উদ্যোগ না নিলে অনেক জনগোষ্ঠীর ভাষা চিরতরে হারিয়ে যাবে। যে দেশে ভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছে, সে দেশে এমন ঘটনা খুবই দুর্ভাগ্যজনক হবে।
আদিবাসীবিষয়ক জাতীয় কোয়ালিশনের মুখপাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, আদিবাসীদের ভাষা সংরক্ষণ ও চর্চার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এই দায়িত্ব পালন করবে বলে কখনো কখনো বলা হয়; কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত কোনো কর্মপরিকল্পনা করেনি। তবে আদিবাসীদের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ আছে।
এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলী বলেন, একটি দেশে কতগুলো ভাষা আছে এবং এদের পরিচয়ের নির্দেশনা দেওয়ার জন্য ভাষাতাত্তি্বক সমীক্ষা করতে হবে, যেটা এখন পর্যন্ত হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো_ বিশ্বের সব মাতৃভাষা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করা। বিপন্ন ভাষাগুলোকে রক্ষা করা। এ সম্পর্কিত একটি 'আর্কাইভ' করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যেখানে এসব সংরক্ষিত থাকবে।
ভাষা সংরক্ষণে উদ্যোগ নেই : ১৯৯১ সালের আদম শুমারি প্রতিবেদনে দেশে ২৯টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর তথ্য উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের মতে, বাংলাদেশে প্রায় ৪৫টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী আছে। আর ইথোনোলগ ল্যাঙ্গুয়েজ অব ওয়াল্ডের মতে, এসব জনগোষ্ঠীর ভাষা আছে প্রায় ৪২টি।
গবেষক রাজীব চাকমা বলেন, আদিবাসীদের ভাষা সংরক্ষণের কাজটি সরকার সহজেই করতে পারে। কারণ অনেক ভাষায় লিখিত রচনা আছে। ২০০৫ সালে একুশে গ্রন্থমেলায় চাকমা ভাষার উপন্যাস বেরিয়েছে। মণিপুরিদের ভাষা 'মৈথয়ী'র ইতিহাস শতবর্ষের পুরনো। সাঁওতালি ভাষায় সাহিত্যচর্চার ইতিহাস ১৪০ বছরের। সাঁওতালি ভাষায় সাহিত্য ও অভিধান রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অসংখ্য সাঁওতালি বিদ্যালয় রয়েছে। ঝাড়খ-ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ালেখা হয় এই ভাষায়। বান্দরবানে ২০০৯ সালে জিরকুন সাহু নামে একজন 'বম' ভাষায় অভিধান করেছেন। ভারতে হাজং থেকে ইংরেজি, সাঁওতাল থেকে ইংরেজি, খাসিয়া থেকে ইংরেজি ভাষায় অভিধান আছে।
ভারতের ত্রিপুরায় ত্রিপুরী (ককবরক) ভাষায় মাধ্যমিক স্কুল পর্যন্ত পড়ালেখার ব্যবস্থা রয়েছে। মিজোরাম ও ত্রিপুরায়ও গারোদের আচিক ভাষায়, মিয়ানমারে মারমা ভাষায় উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে; কিন্তু '৪৭ সালের আগে পার্বত্য অঞ্চলে চাকমাদের বিদ্যালয় থাকলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সরকার সেগুলো বন্ধ করে দেয়।
মাতৃভাষায় শিক্ষা উপেক্ষিত : জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী, বিশ্বের প্রতিটি জনগোষ্ঠী নিজ ভাষায় শিক্ষা লাভের অধিকারী। এই সনদে বাংলাদেশও সই করেছে। এ সংক্রান্ত আইন সংসদেও পাস হয়েছিল ১৯৯৭ সালে। ২০০৪ সালে 'আদিবাসীদের শিক্ষা ও ভাষার চাহিদা' বিষয়ে অধ্যাপক মেসবাহ কামালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ৯৪ শতাংশ আদিবাসী শিশু বাড়িতে নিজ ভাষায় কথা বলে। এরা বিদ্যালয়ে গিয়ে বাংলা ভাষা বুঝতে পারে না। মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা না থাকায় তারা ঝরে যায়।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের নেতা বাহাদুর চাকমা বলেন, চাকমা, মারমা, রাখাইন, ম্রো, সাঁওতাল, ত্রিপুরা, বম, গারো, খাসিয়া, হাজং, মণিপুরি, ওঁরাও, মুন্ডা, তঞ্চঙ্গ্যাসহ অন্তত ১৫টি ভাষায় এখনই শিক্ষার ব্যবস্থা করা যায়। কারণ এসব ভাষাভাষির সংখ্যা অনেক এবং এসব ভাষায় লিখিত রচনা পাওয়া যাবে।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশকিছু জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ব্যবহার করে শিক্ষাদান করছে কিছু বেসরকারি সংগঠন। ইনডিজিনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারে খাসিয়াদের জন্য আটটি মাতৃভাষায় শিক্ষাদান স্কুল চালু করে। অবশ্য তহবিল-সংকটে পাঁচটি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। এই স্কুলগুলোতে তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়ানো হয়। সিলেটে এথনিক কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এডকো) ২০১০ সালে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে পড়ানোর জন্য বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করে মণিপুরি ভাষায় একটি বই করেছে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ১৯৯৯ সালে রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে সাঁওতাল শিশুদের জন্য দুটি স্কুল করেছে। তারা সাঁওতাল ভাষায় তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত কয়েকটি বই করেছেন। রাজশাহী ও সিরাজগঞ্জে 'আশ্রয়' নামে একটি সংগঠন ওঁরাও ভাষায় দুটি স্কুল করেছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলী বলেন, মাতৃভাষার মাধ্যমে নৃতাত্তি্বক জনগোষ্ঠীর শিশুরা যাতে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করতে পারে সরকার সে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিছু ভাষায় পাঠ্যপুস্তকও ইতিমধ্যে তৈরি করা হয়েছে।
Source: http://www.dainikdestiny.com/index.php?view=details&type=main&cat_id=1&menu_id=1&pub_no=80&news_type_id=1&index=0&archiev=yes&arch_date=21-02-2012
*****************************************************************************
Share:

আমাদের সব মাতৃভাষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে

সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী
অমর একুশে, আমাদের গর্ব, আমাদের স্বাধীনতার প্রথম সোপান। একুশের চেতনার পথ ধরে আমরা অসত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। আমাদের ভাষা শহীদদের চরম আত্মত্যাগ সমকালীন ইতিহাসে একটা বিরল ঘটনা। তাঁরা রক্ত দিয়ে আমাদের মাতৃভাষা বাংলা রক্ষা করে গেছেন। আজকের এই দিনে তাঁদের জানাই শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। আমাদের গর্ব, আজকের এই দিনটি সারা বিশ্বে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। আমাদের ভাষা শহীদদের মতো আজ সারা পৃথিবীর সব দেশের নাগরিকরা তাঁদের নিজ নিজ মাতৃভাষা রক্ষার্থে নতুন করে অঙ্গীকার করছেন। সারা জাতির জন্য এটা একটি বিশাল অর্জন।


আজ গৌরবের দিন। একই সঙ্গে আজ আত্মবিশ্লেষণের দিন। আমরা কি আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও চেতনা সারা বিশ্বে তুলে ধরতে পেরেছি? আমরা কি আমাদের মাতৃভাষার সমৃদ্ধকরণ ও পরিবর্ধন করতে পেরেছি? আজ থেকে ১৪ বছর আগে অর্থাৎ ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে বহু দেন-দরবার ও কূটনৈতিক কলা-কৌশল খাটিয়ে আমাদের প্রস্তাবটি অনুমোদন করিয়ে নিয়েছিলাম। ফলে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে প্রথম আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০০ দিনটি উদযাপিত হয়েছিল। তদানীন্তন মহাপরিচালক কাইচুরা মাৎসুরা দিনটির শুভ উদ্বোধন বা লঞ্চিং করেছিলেন।
প্রস্তাবের প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে বাংলাদেশ সারা বিশ্বের সব মাতৃভাষা রক্ষার্থে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার অঙ্গীকারও করেছিল। কতটুকু পালন করতে পারলাম সেই অঙ্গীকার? অনেক টানাপড়েনের পর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আজ থেকে তিন বছর আগে স্থাপিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভাষা রক্ষা করার জন্য তাদের যে পরিমাণ সামর্থ্য ও পারদর্শিতা দরকার তা অর্জন করতে তাদের আরো অনেক সময় লাগবে। তবে এই প্রাথমিক পর্যায়ে তারা আমাদের দেশের মাতৃভাষাগুলো সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে পারে।
বাংলা আমাদের প্রধান মাতৃভাষা। কিন্তু এ ছাড়া প্রায় ৩০টিরও বেশি আঞ্চলিক ও উপজাতীয় ভাষা আছে। তাদের সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। এদের মধ্যে চাকমা একটি প্রধান ভাষা। প্রায় দুই লাখ উপজাতি এই ভাষায় কথা বলে। ইন্দো-ইউরোপীয় সমৃদ্ধ এই চাকমা ভাষার বর্ণে ১৮৬০ সালে প্রথম বাইবেল প্রকাশিত হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনকালে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের যে এলাকায় চাকমারা ও মারমারা বাস করত, সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই ভাষাগুলো শেখানো হতো। পরে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটা চালু করা আবার প্রয়োজন। তঞ্চঘ্যা আরেকটা ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারভুক্ত উপজাতীয় ভাষা। এ ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে, আছে তাদের নিজেদের সাহিত্য। রাঙামাটি ও বান্দরবান অঞ্চলে ব্যবহৃত খিয়াং আরেকটি উপজাতীয় ভাষা। তাদের নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই, তবে সিনে-টিবেটান ভাষাটি মিয়ানমারেও প্রচলিত আছে। এ ছাড়া খিয়াং, মারমা, বম, খুমি, চাক, কোচ, খাড়িয়া, হাজং, গারো, সাঁওতাল ও অন্যান্য উপজাতীয় ভাষা আছে।
গবেষকরা মনে করেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বাংলাসহ প্রায় ৪২টি ভাষা আছে। এদের বেশির ভাগই দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের সংরক্ষণার্থে এসব অঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে ভাষাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। উপজাতীয় ভাষায় প্রকাশিত বইগুলো যত্নসহকারে সংরক্ষণ ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রবর্তন করা যেতে পারে। মনে রাখা প্রয়োজন, একটি ভাষার মৃত্যু একটি মানবগোষ্ঠীর সঞ্চিত জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিলুপ্তি।
শুধু উপজাতীয়দের ভাষা নয়, আমাদের বিভিন্ন জেলায় ব্যবহৃত Dialect বা কথিত ভাষা আজ অনেকটা বিপদাপন্ন। হারিয়ে যাবে আমাদের পালাগান, জারিগান, বারোমাসিগান, পই-প্রবাদ, ডাক ও ডিঠান। বর্তমান ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দাপটে তারা সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আজ দেশের প্রায় দুই ডজন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে আমাদের অন্যান্য ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রায় অনুপস্থিত। এ ব্যাপারে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই, সিলেট বিভাগে বর্তমানে অবলুপ্ত 'সিলেট নাগরী' নামে একটি ভাষা ছিল। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রয়েছে। দেবনাগরী থেকে সম্পন্ন ভিন্ন এ ভাষা শুধু মুসলমানদের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। হজরত শাহজালালের সঙ্গে ৩৬০ জন আউলিয়া সিলেটে আসেন। তাঁরা মূলত বিভিন্ন দেশ ও এই উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসেন। তাঁদের ভাষা বাংলা ছিল না। তাঁরা সম্ভবত তখন আরবি অক্ষরে তাঁদের নিজ নিজ ভাষায় চর্চা করতেন দেবনাগরী অক্ষরে। তার ভিত্তিতেই সিলেট নাগরী ভাষা গড়ে ওঠে। পরে ফারসি, আরবি, হিন্দি ও উর্দু ভাষা রূপান্তরিত হয়ে সিলেটে আসে। কিন্তু গরিব মুসলমানরা হিন্দি, ফারসি ও আরবির দাপট থেকে দূরে থাকার জন্য তাদের নাগরী ভাষা চালাতে লাগলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এই নগরী শুধু গরিব মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে এই নাগরী অক্ষরে লেখা পুঁথিসাহিত্য সংরক্ষণে বেসরকারিভাবে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমাদের মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পারে। আমাদের মূল মাতৃভাষা বাংলার সমৃদ্ধিকরণ ও আন্তর্জাতিকীকরণ প্রক্রিয়া আরো জোরদার করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে আমরা ইংরেজি ভাষার সমৃদ্ধিকরণ প্রক্রিয়ার দিকে নজর দিতে পারি। পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ফরাসির তুলনায় ইংরেজি ভাষীরা অনেক উদার মনোভাব দেখিয়েছিল ও বিভিন্ন সাহিত্য থেকে সব ধরনের বইপত্র অনুবাদ করে ও নতুন নতুন শব্দ আহরণ করেছিল। তবে তারা কাজটা অত্যন্ত সুচারুভাবে করেছিল। তাদের মূলনীতি ছিল যে শব্দ ইংরেজি ভাষায় নেই সেই বিদেশি শব্দ ইংরেজিতে বসানো যেতে পারে।
বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজির বিকল্প নেই। কাজেই আমাদের বাংলা ও ইংরেজিতে সমান পারদর্শিতা অর্জন করতে হবে। মানবসম্পদ আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের ইংরেজি ভাষা শেখাতে হবে, যেন তারা বিশ্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। আমি মধ্যপ্রাচ্যে শুধু ইংরেজি না জানার কারণে আমাদের শ্রমিকদের পিছিয়ে পড়তে দেখেছি। ভারত, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইনের নাগরিকরা শুধু ইংরেজি জানার কারণে বেশি উপার্জন করছেন। ইংরেজি না জানার কারণে আমাদের আন্তর্জাতিক কল সেন্টারগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমরা বছরে পাঁচ বিলিয়ন ডলার হারাচ্ছি। এখানে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিরাট দাপট। তারা পৃথিবীর শীর্ষে আছে। অতীতে আমরা দুটি ভাষাই শিখতাম, বাংলা ও ইংরেজি। নিশ্চয়ই চেষ্টা করলে আবার পারব। আজকের এই দিনে আমাদের ব্রত হওয়া উচিত : মাতৃভাষা বাংলাকে সুদৃঢ়, সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক করব; অন্য সব মাতৃভাষা সংরক্ষণ করব ও একই সঙ্গে ইংরেজি ও বিদেশি ভাষা শিখব। প্রথমে বাংলা ভাষাকে উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী করব, তাহলে পৃথিবী আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির দিকে আরো আগ্রহ দেখাবে। মহান একুশে অমর হোক।
 
লেখক : সাবেক পররাষ্ট্রসচিব, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা প্রস্তাবটি তিনি ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের পক্ষে উত্থাপন করেন এবং তার অনুমোদন প্রাপ্তিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।Source: http://www.kalerkantho.com/?view=details&type=gold&data=news&pub_no=1160&cat_id=3&menu_id=211&news_type_id=1&index=5&archiev=yes&arch_date=21-02-2013*******************************************************************************************
Share:

সাঁওতালি

20 Feb 2013 12:00,
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান | তারিখ: ২০-০২-২০১৩ সাঁওতালি ভাষা অস্ট্রো-এশীয় ভাষাগোষ্ঠীর প্রাচ্য শাখার অন্তর্ভুক্ত। ভারত, বাংলাদেশ ও নেপাল মিলিয়ে পৃথিবীতে ৫০ লাখ মানুষ সাঁওতালি ভাষায় কথা বলে। বাংলাদেশের রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, বগুড়া, রংপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলায় দুই লাখের বেশি সাঁওতাল রয়েছে। সাঁওতালি ভাষার উপভাষা দুটি- নাহিলি ও করকু। সাঁওতালি ভাষার ইতিহাস অতি প্রাচীন হলেও দীর্ঘদিন এই ভাষার কোনো বর্ণমালা ছিল না। এর প্রথম লিখিত রূপ পাওয়া যায় খ্রিষ্টান মিশনারিদের উদ্যোগে, রোমান হরফে। ১৮৬৯ সালে ভারতের সাঁওতাল পরগনার লুথারিয়ান মিশনে স্থাপিত একটি ছাপাখানা থেকে সাঁওতাল ভাষার প্রথম ব্যাকরণ প্রকাশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে রঘুনাথ মুর্মু 'অলচিকি' বা 'ওলচিকি' নামে সাঁওতালি লিপি উদ্ভাবন করেন। তাঁর সে লিপি সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে। ভারতে এখন সাঁওতালি ভাষা দেবনাগরী লিপিতে লেখা হচ্ছে এবং তাতে বহু হিন্দি উপাদানের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। বাংলাদেশে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের উদ্যোগে ১৯৯৯ সালে রাজশাহী জেলার বর্ষাপাড়া গ্রামে বাংলা হরফে সাঁওতালি ভাষা শিক্ষাদানের জন্য একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। 
বাংলা ও সাঁওতালি ভাষা স্বতন্ত্র ভাষা-পরিবারভুক্ত হলেও এই দুই ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। সাঁওতালি ভাষা অলচিকি, বাংলা না রোমান লিপিতে লেখা হবে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। এ বিতর্কের রেশ অতি সম্প্রতি প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয় পাতায়ও লক্ষ করা গেছে। বাংলার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে অনেকে বাংলা লিপিতে সাঁওতালি লেখার পক্ষে। অনেকে আবার মনে করেন, বাংলায় সাঁওতালি ভাষা উচ্চারণের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রোমান হরফে দীর্ঘদিন ধরে সাঁওতালি চর্চা হচ্ছে বলে রোমান লিপিই সংগত। প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের উপস্থিতিতে একবার এক সাঁওতালি ভদ্রমহিলা আমাকে বলেছিলেন, 'বাংলা লিপিতে যখন সাঁওতালি ভাষা লেখা হয়, তখন আমাদের ভাষার মাধুর্য হারিয়ে যায়।' সাঁওতালি ভাষায় মননশীল-সৃজনশীল দুই ধারাতেই বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। এ রকম কয়েকটি বইয়ের মধ্যে আছে: হাড়মাওয়াক আতো (উপন্যাস), মারে হাপড়ামকোয়াক কাথা (সমাজবিজ্ঞান), কাথা পাড়িয়ান (সাঁওতালি অভিধান)। সাঁওতাল ভাষার কবি সারদাপ্রসাদ কিসকু তাঁর 'হুল সেরেঞ' বা 'সাঁওতাল বিদ্রোহ' কবিতায় নিজেদের লড়াকু চরিত্রের কথা তুলে ধরেছেন। কবিতার কয়েকটি লাইন, 'নুসৗসাবোনে, নওয়ারাবোন চেলে হঁ বাকো তেঙ্গোন/ খাঁটি গে বেন হুল গেয়া হো,/ খঁঅটি গে বোন হুল গেয়া হো/ দিশম দিশম দেশ মৗঞ্জহি পারগাণা/ নাতো নাতো মাপাঞ্জিকো/ দঃক বোন দানাংবোন বাংগো কো তেঙ্গোন,/ তবে দোবোন হুলগেয়া হো।' এর বাংলা অনুবাদ, 'আমরা নিজেরাই বাঁচব, কেউ আমাদের পাশে দাঁড়াবে না,/ আমরা সত্যিই বিদ্রোহ করব,/ আমরা সত্যিই বিদ্রোহ করব/ দেশের মাঝি ও পরগণার/ গ্রামের মোড়লরা,/ আমাদের সর্বপ্রকারে সাহায্য করবে, কেউ পাশে দাঁড়াবে না,/ তবে আমরা নিশ্চয়ই বিদ্রোহ করব।'
Source: http://m.newshunt.com/Prothom-alo/Prothom+Pata/19789427
*************************************************************************
Share:

সাঁওতাল শিশুদের জন্য রোমান বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক দাবি

বুধবার, জানুয়ারী 9, 2013

রাজশাহী প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন

Share:

রোমান বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক রচনার দাবি সাঁওতালদের


09 January 2013, Wednesday
রাজশাহী, ০৯ জানুয়ারি (জাস্ট নিউজ) : সাঁওতাল শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার জন্য রোমান বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক রচনাসহ সাত দফা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে আদিবাসী মুক্তি মোর্চা। বুধবার দুপুরে রাজশাহী প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়।

তাদের অন্যান্য দাবিগুলো হলো বিভাগীয় শহর রাজশাহীসহ সব জেলা শহরে সাঁওতালি ভাষা একাডেমি স্থাপন, সরকারি উদ্যোগে সাঁওতালি ভাষায় শব্দকোষ ও পুস্তক রচনার উদ্যোগ গ্রহণ, সাঁওতালি সংস্কৃতি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ, ভাষা উন্নয়নে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে বিশেষজ্ঞ নিয়োগ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের আওতায় আদিবাসী ভাষা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে ভাষা সংরক্ষণ, ব্যবহার ও বিকাশে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ ও সমতলের আদিবাসীদের জন্য আদিবাসী  উন্নয়ন পরিষদ গঠন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে কোনো ভূঁইফোড় জনগোষ্ঠী নয়। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শক্ত শিকড়। এই শিকড়ের ধারাবাহিকতায় সমতল ভূমিতে বসবাসরত সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু দুঃখের বিষয়, কালের পরিক্রমায় শাসক ও শোষকগোষ্ঠী সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয় মুছে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয় নিয়ে নানান মিথ্যাচার করে আসছে শাসক ও সুবিধাবাদি গোষ্ঠী।

স্বাধীনতাসহ বাঙালির সকল মুক্তিসংগ্রামে সাঁওতালরা অংশগ্রহণ করেছেন উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, বর্তমানে রাষ্ট্রের এক ভয়াবহ রাজনীতির খেলা সমতলের সাঁওতালদের সমাজ বদলের স্বপ্ন ও দিন বদলের স্বপ্নকে ভূলন্ঠিত করেছে।

জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী আাদিবাসীদের নিজস্ব মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার যে উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করেছে, তাকে সাদুবাদ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন থেকে সাঁওতাল আদিবাসীদের প্রাথমিক পাঠ্য পুস্তক রচনায় রোমাণ বর্ণমালা ব্যবহারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।

সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন আদিবাসী মুক্তি মোর্চা কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক যোগেন্দ্রনাথ সরেন। এ সময় সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়াস ডুমরী, সাঁওতালি ল্যাঙ্গুয়েজ ডেভেলেপমেন্ট কমিটির সভাপতি গাব্রিয়েল হাঁসদা, মাহালে ল্যাঙ্গুয়েজ ডেভেলেপমেন্ট কমিটির সভাপতি মেরিনা হাঁসদা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
Source: http://www.justnewsbd.com/details.php?jnewsbd=MjIwMTY=
***********************************************************************
Share:

আন্তর্জাতিক মহান ভাষা দিবসে আদিবাসী ভাষার প্রশ্নে আমার অবস্থান


গতপরশু অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারের একটা সাক্ষাৎকারভিত্তিক প্রতিবেদন পড়লাম। সেখানে তিনি একটা ঘটনার কথা বল্লেন - "....লন্ডনপ্রবাসী এক বাঙালি একবার আমাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘আপনি মাতৃভাষার শিক্ষার কথা বলছেন। আমাদের মাতৃভাষা সিলেটি। আমরা কেন সিলেটি ভাষায় শিক্ষা নিতে পারব না?’"


প্রতিবেদনটি অনেক বেশী তথ্যবহুল। তাই সেটার প্রিন্ট নিয়ে আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে রেখে দিয়েছি। তবে এই পর্যন্ত পড়ার পর কিছু তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া লেখা প্রয়োজন বলে মনে করলামঃ



মাতৃভাষা বলতে একটা দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষাকেই বুঝায়, কোন জেলা বা প্রদেশের আঞ্চলিক ভাষাকে নয়। এবং সেই ভাষা একটি স্বাধীন এবং নির্দিষ্ট জাতিসত্ত্বা কর্তৃক চর্চা করা হয়। সুতরাং, মাতৃভাষায় শিক্ষা মানে মোটা দাগে রাষ্ট্রীয় ভাষায় শিক্ষাকেই বোঝানো হয়ে থাকে। এখন, সিলেটীরা যদি 'মাতৃভাষায় শিক্ষা' বলতে তাদের জন্য সিলেটী ভাষায় শিক্ষা অধিকার নিশ্চিত করার দাবী তুলবার চেষ্টা করে, তাহলে হয় তারা রাষ্ট্র আর আঞ্চলিক ভাষার মধ্যকার পার্থক্য বুঝে না (এবং ঐ সাক্ষাৎকারেই স্যার বল্লেন, "...আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আঞ্চলিক ও প্রমিত বাংলার পার্থক্য করতে না পারব, ততক্ষণ এ সমস্যা থাকবে....!") নয়তো তারা সিলেটী ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা বলে মনে করে।



অপরদিকে, কোন একটি দেশের স্বাতন্ত্র আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃত্বাত্তিক জনগোষ্ঠির জন্য (বাংলাদেশে যেমন: চাকমা, মারমা, মুরং, গারো, সাওঁতাল, অষ্ট্রেলিয়ায় যেমন এবোরেজিনাল, নিউ জিল্যান্ডে যেমন মাওরিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠি), তাদের জাতীয় বা উপজাতীয় ভাষাই হলো তাদের মাতৃভাষা। বাংলাভাষার সাথে সেসব ভাষার গঠনগত যেমন পার্থক্য রয়েছে, তেমনি পার্থক্য রয়েছে রাজনৈতিকভাবেও। কেননা, সংখ্যালঘু আদিবাসী কোন ভাষাকে রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়না, দেয়ার কথাও নয়। অথার্ৎ, রাষ্ট্রভাষা সর্বদা সব জাগাতেই রাষ্ট্রযন্ত্র কর্তৃক স্বীকৃত এবং পৃষ্ঠপোষকপ্রাপ্ত। কিন্তু রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি না পাক, (অবশ্য সেটার প্রয়োজনও নেই), নিজেদের মাতৃভাষায় শিক্ষিত হবার অধিকার আদিবাসীদের অবশ্যই রয়েছে। এটা রাষ্ট্রীয় অধিকার যেমন তেমনি মানবিক অধিকারও বটে। এই অধিকার রক্ষায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন "হিউম্যান রাইটস ওয়াচ'" থেকে শুরু করে আমেরিকার রেড ক্রস, ইংল্যান্ডের এ্যামনেস্টি ইন্টারনেশনালসহ পৃথিবীর বাঘা বাঘা মানবাধিকার সংস্থাগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আদিবাসীদের জন্য তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রচলনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, সরকারের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করে যাচ্ছে। (বাংলাদেশে এ কাজের তৎপরতা কেমন, মিডিয়ায় কখনো সেই খবর আসেনি)।


অধিকারের ব্যাপার না হয় বাদই দিলাম, একটা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র রক্ষার তাগিদে হলেও সরকারের উচিত, আদিবাসীদের নিজেদের ভাষায় শিক্ষাগ্রহনের ব্যবস্থা করে এই নৃত্বাত্তিক ভাষাগুলোকে সুষমভাবে সংরক্ষনের ব্যবস্থা করা। আশার কথা, রাজশাহী আর খাগড়াছড়ির আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবীর মুখে সম্প্রতী সাঁওতাল ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে।


ভাষা রক্ষার ব্যাপারে শুধু শিক্ষা কার্যক্রম চালু করলেই হবে না। একবিংশ শতাব্দির এই চরম উৎকর্ষের যুগে ভাষাকে সবার কাছে গ্রহনযোগ্য এবং সুষমভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে, একে প্রযুক্তি বান্ধবও করতে হবে। এ প্রসঙ্গে মুনীর কি-বোর্ডের আবিস্কারক প্রযুক্তিবিদ জনাব মুনির হাসানের বক্তব্যের কিয়দংশ উল্লেখ না করলেই নয় - "আমরা জানি, শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে টিকে থাকবে সেই ভাষাগুলো, যা কিনা প্রযুক্তিবান্ধব! সাধারণ একটা উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, যেসব ভাষার লিখিত রূপ নেই, সেই ভাষাগুলোর অধিকাংশই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। তারপর যখন গুটেনবার্গ মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করলেন, তখন ভাষার একটি সিসা-রূপ আমরা দেখলাম। তারপর শুরু হলো সিসাবিহীন ভাষার বিলোপ। আর এখন এসেছে তথ্যপ্রযুক্তি। এখন কোনো ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে হলে ভাষাবিদদের পাশাপাশি প্রযুক্তিবিদদেরও সক্রিয় হতে হবে।"

শুনেছি, কম্পিউটারে বাংলাদেশের আদিবাসীদের ভাষা লিখন পদ্ধতি নিয়েও গবেষনা চলছে, বেশ কিছু সাফল্যও দেখা গেছে। এটা একটা খুবই আশাব্যঞ্জক তথ্য। এ ব্যাপারে বিশিষ্ট আদিবাসী প্রযুক্তিবিদ মানচুমাহারার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। প্রমিত বাংলা ভাষার প্রযুক্তিকরনেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।


বলতে গেলে, বাংলাদেশে এখন বাক স্বাধীনতা আর অসাম্প্রদায়িক উদারপন্থী চেতনার মেলবন্ধনের চমৎকার একটা স্বর্ণযুগ চলছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এত অসাম্প্রদায়িক এবং উদার রাজনৈতিক চেতনা ধারনে করা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মেইনস্ট্রিম (মূলধারা) সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক অঙ্গন সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই বিপুলসংখ্যক আদিবাসীদের ভাষা- শিল্প- সাহিত্য- সংস্কৃতিকে আজ পর্যন্তও নিজেদের অংশ বলে মনে করতে পারার ব্যাপারে যথেষ্ঠ আন্তরিকতা দেখাতে পারেনি। ভাষাসহ আদিবাসী সংস্কৃতি এখনও আামদের সমাজের মূলধারায় অনেকটা 'অবাঞ্ছিত'। অথচ এর উল্টো হওয়াই উচিত ছিলো।

বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষার আন্তজার্তিক-সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও রয়েছে। বাংলাদেশে বসবাসকারী আদিবাসীদের ভাষা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে পৃথিবীর অন্যতম ৪টি ভাষা পরিবারের প্রায় ৩০টি ভাষা রয়েছে। সুতরাং, বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষা খুব একটা হেলা খেলার জিনিস নয়। সরকার এবং সমাজকে এ বিষয়ে অবশ্যই এ বিষয়টা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

আর তাইতো, সিলেটীদের পরিবর্তে যদি পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, আর বান্দরবানের চাকমা, মারমা, খাগড়াছড়ির সাওঁতাল এবং ময়মনসিংহের গারোসহ - সারা বাংলাদেশের বিশাল উপজাতী গোষ্ঠি যদি তাদের মাতৃভাষায় (যেটা দেশের রাষ্ট্রভাষা নয়) শিক্ষালাভের দাবী জানায়, সেটা আমার কাছে অনেক বেশী যুক্তিগ্রাহ্য।

[সিলেটী ভাষাকে যারা আদিবাসী ভাষার অংশ বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করে, তাদেরকে বলছি, সিলেটে বসবাসকারী অতি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা "পাত্র"-দের আলাদা সমাজ সংস্কৃতি ও ভাষা থাকলেও সে ভাষার কোন লিখিতরূপ বা বর্ণমালা নেই। জাতিগত ভাবে পাত্ররা “বোড়া” জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত বলে পণ্ডিতরা অনুমান করে থাকেন। গ্রিয়ারসন সিলেট অঞ্চলে প্রচলিত মনিপুরী, খাসি প্রভৃতি ভাষা ছাড়াও বৃহত্তর সিলেট তথা তৎকালীন আসাম অঞ্চলের কয়েকটি ক্ষুদ্র জাতি উপভাষা সম্পর্কে যে আলোচনা করেছেন সেখানে পাত্রদের ভাষার উল্লেখ নেই। পাত্রদের ভাষার কোনো লিপি নেই। এমনকী লিখিত কোন নিদর্শনও নেই তাদের ভাষায়। নিজেদেরকে তারা লালং জাতি হিসেবেই গণ্য করে।
(সূত্রঃ বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষা পরিচিতি, বাংলা একাডেমী।)

কাজেই, যে আদিবাসীদের নিজস্ব কোন বর্ণমালাই নেই, সে আদিবাসীরা মাতৃভাষায় কি করে শিক্ষালাভের দাবী করতে পারে?
এমনকি সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষায় চালু হওয়া সাওঁতালদেরও নিজস্ব ভাষা নেই। তাহলে তারা কিভাবে শিক্ষাপদ্ধতি চালু করলো?

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অর্থাৎ রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, বগুড়া, রংপুর, ঠাকুরগাঁ প্রভৃতি অঞ্চলে দুই লক্ষাধিক সাঁওতাল বসবাস করে। তবে ভারত, বাংলাদেশ এবং নেপাল মিলিয়ে পৃথিবীতে ৫২ লক্ষ লোক সাঁওতালি ভাষায় কথা বলে। হাজার হাজার বছর ধরে বংশ পরম্পরায় মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসা এই সাঁওতালি ভাষারও কোন নিজস্ব বর্ণমালা নেই। তবে খ্রিস্টান মিশনারিদের হাতে সর্বপ্রথম সাঁওতালি ভাষার লিখিত রূপ দেওয়া হয় রোমান হরফে। ১৮৬৯ সালে ভারতের সাঁওতাল পরগনার লুথারিয়ান মিশনে স্থাপিত একটি ছাপাখানা থেকে প্রথম সাঁওতাল ভাষার ব্যাকরণ ও অন্যান্য বই প্রকাশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গে রঘুনাথ মুর্মু ‘অলচিকি’ নামে সাঁওতালি বর্ণমালা তৈরি করে এবং তার সরকারি স্বীকৃতিও লাভ করে। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত দেশী শব্দগুলো প্রধানত সাঁওতালি ও মুন্ডা ভাষা থেকে আগত। (সূত্রঃ বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষা পরিচিতি, বাংলা একাডেমী। )]

কিন্তু সিলেটীদের যে অতি ক্ষুদ্র আদিভাষা রয়েছে, সেটার বর্ণমালা প্রণয়েনে সাওঁতালদের মত কেউ কখনো এগিয়ে এসেছে বলে শোনা যায়নি।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমি জানতে পারি, যেটা আমি আগে জানতাম না। সেটা হলো, "বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত দেশী শব্দগুলো প্রধানত সাঁওতালি ও মুন্ডা ভাষা থেকে আগত।" তার মানে, রাষ্ট্রীয় ভাষার পরিগঠনেও আদিবাসী ভাষা তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, এবং আমাদের দেশের আদিবাসী ভাষা এ ভূমিকা ইতিমধ্যেই রেখেছে!

(প্রাসঙ্গিক আরো তথ্য যোগ করার ইচ্ছে ছিলো, কিন্তু লেখার বাহুল্য কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় সে কাজ থেকে বিরত থাকলাম)


সারকথা হলো, আমি সেইসব উপজাতীদের পক্ষে, যাদের হাজারটা মৌলিক অধিকারের মত নিজের মায়ের ভাষায় শিক্ষার জন্যও দাবী জানাতে হয়, দেশের জনগন এবং সরকারের কাছে হাত পাততে হয়!

আজ মহান একুশে ফেব্রুয়ারি, তথা ৮ই ফাল্গুন, আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস। রাষ্ট্রীয় মূলধারার সুবিধা বঞ্চিত এইসব আদিবাসীদের প্রতি সন্মানার্থে, আমি আমার আজকের মহান ভাষা দিবসটি পৃথিবীর সকল আদিবাসী ভাষার প্রতি উৎসর্গ করলাম। 

Share:
Copyright © The Santal Resources Page | Powered by Blogger Theme by Ronangelo